শেষ যাত্রায় মাত্র তিনটে লোক! অথচ জহর রায় আজীবন লোক হাসিয়েছেন

‘গুপিগাইন বাঘাবাইন’-এ কী অসাধারণ অভিনয়টাই না করলেন!

রিশালের মহিলারায় একটি বাঙালি বৈদ্য পরিবারের ছেলে জহর। অভিনেতা জহর রায় (Jahar Roy) দর্শকদের আবিষ্কার। কারণ ছোটো ছোটো চরিত্র করেও কীভাবে তাক লাগানো যায়, তার কৌশল জানতেন জহর। আর ছিল সততা এবং কাজ করে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা। 

জহর রায়ের মৃত্যুর পর অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় (Bhanu Bandopadhyay) আক্ষেপ করে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, অন্যদেশ হলে ওঁর মতো অভিনেতার শেষ যাত্রার সময়ে মাত্র তিনটে লোক দাঁড়িয়ে থাকত না৷ জহর রায় এমনই একা৷ আজীবন। কিন্তু নিজে চুটিয়ে হেসেছেন আর হাসিয়ে গিয়েছেন৷ ভাবতে অবাক লাগে, বিশ্বের অন্যতম সেরা এই অভিনেতা শেষ জীবনে কাজ পাননি৷ ঋত্বিক ঘটকের যুক্তি তক্কো আর গল্পতে অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শুধু। অভাবের সংসারে কোনওরকম টেনেটুনে চলে যেত।

সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩) ছবিতে জহর রায়

জহর রায়ের মৃত্যুর পর অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় আক্ষেপ করে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, অন্যদেশ হলে ওঁর মতো অভিনেতার শেষ যাত্রার সময়ে মাত্র তিনটে লোক দাঁড়িয়ে থাকত না৷ জহর রায় এমনই একা৷ আজীবন।

জহর রায় বরাবরই রসিকজন। সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) একবার শ্যুটিংয়ে জহর রায়ের জন্মের সাল শুনে বললেন, “এ কী জহর বাবু, তাহলে তো আপনি আমার থেকে দু-বছরের বড়ো! তাহলে আমাকে মানিকদা বলে ডাকেন কেন?” জহর রায়ের চটপট উত্তর, “আমি আপনার থেকে এজে বড়ো, কিন্তু আপনি আমার থেকে ইমেজে বড়ো”। হার্ডকোর কমার্শিয়াল বা গ্যাদগেদে ছবিই করেননি, সত্যজিৎ রায় থেকে ঋত্বিক ঘটক — এঁদের ছবিতেই সবচেয়ে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন।

এই যেমন ঋত্বিক ঘটকের (Ritwik Ghatak) ‘সুবর্ণরেখা’ ছবিতে তাঁর চরিত্র ছিল একটি ওয়ার্কশপের ম্যানেজারের। কী জীবন্ত ছিল ওঁর অভিনয়! সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশপাথর’-এ তুলসী চক্রবর্তীর প্রধান কর্মচারী হয়েছিলেন। তিনিই আবার প্রায় দশ বছর পর ‘গুপিগাইন বাঘাবাইন’-এ কী অসাধারণ অভিনয়টাই না করলেন! আহা! সকলে মুগ্ধ হয়ে দেখল সেই অভিনয়।

কাজের ক্ষেত্রে সমর্পিত এই মানুষটি জীবন থেকে মজার রসদ শুষে নিয়েই বাঁচতে ভালোবাসতেন। ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে শ্যুটিং চলছে। পরিচালক নরেশ মিত্র (Naresh Mitra)। হঠাৎ শটের মাঝখানেই পরিচালক বলে উঠলেন ‘কাট’। ক্যামেরা থেমে গেল সঙ্গে সঙ্গে, সেটের আলো জ্বলে উঠল। এদিকে নরেশ মিত্র তো ‘কাট’ বলেননি। তাহলে নরেশ মিত্রর কিঞ্চিৎ অনুনাসিক গলা হুবহু নকল করে কাট বলল কে? যিনি বলেছেন, তিনি ততক্ষণে চম্পট দিয়েছেন সেট থেকে। সবটা বুঝতে পেরে জহরের ওপর খুবই রেগে গেলেন নরেশ মিত্র। পরেরদিন কাকভোরে জহর তাঁর বাড়ি গিয়ে হাজির। নরেশ ঘুম থেকে উঠেই দেখেন, তাঁর সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে জহর। রাগ গলে জল হতে সময় লাগল না। যাওয়ার আগে জহর তাঁকে বললেন, “শুনেছি আপনি দানীবাবুকে স্টেজে এরকম করে জ্বালাতন করতেন! তা সেই পদ্ধতিটাই আপনার ওপর প্রয়োগ করে একটু দেখছিলাম।”

গুপী গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৮) ছবিতে জহর রায়

বাবা সত্য (সতু) রায় নিজেও ছিলেন সাইলেন্ট যুগের চলচ্চিত্র-অভিনেতা। ছোটো থেকেই সাইলেন্ট-মুভির প্রবাদপুরুষ চার্লি চ্যাপলিনকে দেখেছেন খুঁটিয়ে। অভিনয় তাঁর রক্তমজ্জায়। পাটনায় প্রুফ রিডার, মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরির পরে দর্জির দোকানও দিয়েছিলেন। তারপর অভিনয়ের পোকা নড়ে উঠল মাথায়।

আজ অভিনেতা জহর রায়ের জন্মদিন। তাঁকে কি ভোলা সম্ভব?

___________

তথ্যসূত্রঃ 
সাতরঙ: স্মৃতির সরণিতে বাংলা চলচ্চিত্রের অর্ধ শতাব্দী’, রবি বসু
‘একেই বলে শুটিং’, সত্যজিৎ রায়

 

Developed by DXDasia