বড়োদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জৈবচাষে স্কুলের ছাত্ররাও!

নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত শিলিগুড়ির সীমান্তবর্তী দেবীগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের

স্কুলের এক কিলোমিটারের মধ্যে নেপাল সীমান্ত, আরেক দিকে ৩০০ মিটারের মধ্যে বিহার সীমান্ত। একদিকে সীমান্ত অঞ্চল, অন্যদিকে স্কুলের মধ্যে প্রায়ই গোখরো সাপের উৎপাত। এর মধ্যেই চলছে রাজ্যের সীমান্তবর্তী দেবীগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিলিগুড়ি মহকুমার খড়িবাড়ি থানার অন্তর্গত এই সীমান্ত সরকারি স্কুল স্থাপিত হয় আজ থেকে ৬১ বছর আগে, ১৯৫৮ সালে। এই স্কুলের মধ্যে এমন কিছু ব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছে যা নজিরবিহীন।

প্রি-প্রাইমারি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত এই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ৫৫ জন। সেখানকার টিচার ইনচার্জ বিশ্বম্ভর প্রসাদ। বিশ্বম্ভরবাবু জানান, একটা সময় স্কুলের চারপাশে ছিল গভীর জঙ্গল, গা ছমছম করা ভুতুড়ে পরিবেশ। ভূতের ভয়ে অনেক ছাত্রছাত্রীই স্কুলে আসত না। এখন স্কুলে  আর সে ভয় নেই। এই স্কুলে বিভিন্ন রকম জৈব পদ্ধতিতে চাষবাস হয়। বড়োরা নন,  ছাত্রছাত্রীরাই পড়াশোনার পাশাপাশি জৈব পদ্ধতির চাষবাসে অংশ নেয়, যা প্রায় নজিরবিহীন।

সম্প্রতি স্কুলের জমিতে চাষ করা হয়েছে পেঁপে, স্কোয়াশ, বেগুন, পুঁইশাক, কুমড়ো, লাউ-সহ আরও অনেক কিছু। এর পাশাপাশি বিভিন্নরকম ফুল  এবং ফলের গাছ তো আছেই। আছে আম ও কাঁঠালের গাছ। আরও উল্লেখ করার মতো বিষয়, এইসব চাষবাসের পুরো খরচ বহন করেন টিচার ইনচার্জ বিশ্বম্ভরবাবু স্বয়ং। সরকারি স্কুল হলেও স্কুলের পরিবেশ ফেরানোর উদ্দেশে কয়েক বছর ধরে  চাষ-বাসের জন্য নিজের পকেট থেকে তিনি দেড় লক্ষ টাকা খরচ করে ফেলেছেন।  এজন্য অবশ্য তাঁর আফসোস নেই। তাঁর কথায়, পড়াশোনা শুধুমাত্র সিলেবাসে আটকে রাখলে চলবে না। জীবনের গভীর বাস্তবটা বুঝতে হলে মাটির সঙ্গে বসবাস করাটা জরুরি। আর নিজের হাতে সবজি-ফল-ফুল উৎপাদনের চেয়ে আনন্দের আর কিছুই হতে পারে না। বিশ্বম্ভরবাবু বলেন, স্কুলের পরিবেশ আরও ভালো হোক। এখন যখন অভিভাবকরা ছেলে-মেয়েদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে চাইছেন বেশি। কিন্তু এই গ্রামের মানুষেরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ছেলে-মেয়েকে না পাঠিয়ে তাদের সরকারি স্কুলে পাঠাচ্ছেন, এটাই সবচেয়ে আনন্দের বিষয়।

এই স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের চাষ করা জৈব পদ্ধতির শাক-সবজি দিয়ে মিড ডে মিলের সবজি তৈরি হয়। স্কুলে সরকারিভাবে হাত ধোয়ার বিশেষ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে স্কুলে অন্তত সীমান্তে একটা দেওয়ালের ব্যবস্থা হলে ছাত্র-ছাত্রীরা সাপের উৎপাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। অনেক সময় স্কুলে ক্লাস চলাকালীন ক্লাস রুমে ঢুকে পড়ে বিষাক্ত গোখরো। ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের খুব সমস্যা হয়। বিশ্বম্ভরবাবু আরও জানান, স্কুলের পরিবেশ অন্যরকম। বিহারের গলগলিয়া  থেকেও এখানে অনেকে পড়তে আসে। রাজ্যের আন্তর্জাতিক সীমান্তবর্তী এই স্কুলে আগামীদিনে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে মাছ চাষ শুরু করারও পরিকল্পনা নিচ্ছেন বলে তিনি জানান। তবে যেহেতু একেবারে সীমান্ত অঞ্চল, তাই বহু ক্ষেত্রেই সরকারি নজরদারি থেকে অনেকটা দূরে থাকেন। ফলে এই স্কুলের আরও উন্নতির জন্য সরকারি নজরদারি চান। স্কুল ছুটির পরও স্কুলের গাছগাছালির কোনও ক্ষতি হয় না। বিএসএফ বা এসএসবি কিন্তু এই স্কুল পাহারা দেন না, পাহারা দেন গ্রামবাসীরা। ভালোবেসেই।

Developed by DXDasia