
সাক্ষাৎকারে অকপট প্রোডাকশন ডিজাইনার সুব্রত চক্রবর্তী, আজ শেষ পর্ব
মেঘনা গুলজারের সঙ্গে সুব্রত চক্রবর্তী
বলিউডের খ্যাতনামা প্রোডাকশন ডিজাইনার সুব্রত চক্রবর্তী। তাঁর নাম জড়িয়ে আছে ‘পদ্মাবত, হায়দার’, ‘ছপাক’, ‘তলবার’-র মতো প্রচুর ছবির সঙ্গে। কোনো গডফাদার ছাড়াই সিনেমার জগতে প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজেকে। অস্কার জুরিতে ডাক পেয়েছেন। একান্ত আলাপচারিতায় তিনি জানালেন ঝাড়গ্রাম থেকে মুম্বাই অবধি লড়াইয়ের কাহিনি। সহেলি মিত্রের নেওয়া সাক্ষাৎকারের আজ শেষ পর্ব।
• গত পর্বে ডিটেলিং নিয়ে কথা হল। বাংলার সত্যজিৎ রায়, ঋতুপর্ণ ঘোষের মতো পরিচালকরা ডিটেলিং-এর ব্যাপারে ভীষণ খুঁতখুঁতে ছিলেন জানি। বলিউডের পরিচালকরাও কি সেরকম?
বলিউডেও ডিটেলিং যথেষ্ট গুরুত্ব পায়। সঞ্জয় লীলা ভনসালি, মেঘনা গুলজার ডিটেলিংয়ে জোর দেন। এমনকি অল্প বয়সী পরিচালকরা আমাদের ওপর ছেড়ে দেন, যাতে আমরা তাঁদের গাইড করতে পারি। মুকেশ ছাবরার ‘দিল বেচারা’ ছবির এক সাধারণ দৃশ্যের জন্য বিবিডি ট্যাগ-ওয়ালা বাস বানানে হয়েছিল। গল্পে ছিল এমন একটা বাস সারাইয়ের জন্য জামশেদপুরে গিয়েছে। কিন্তু আর ফেরেনি। বাণিজ্যিক ছবিতে মজার উপদান যোগ করতে ডিটেলিং লাগে। পিরিয়ড ড্রামায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে হয় সময়কে।
‘হাওয়াইজাদা’ (২০১৫) ছবির দৃশ্য
• ‘দঙ্গল’ ছবিতে কাজ করতে না পারা নিয়ে আপনার কোনো আফসোস নেই?
সে তো আছেই। খুব বড়ো মিস ছিল সেটা। তখন অন্য কয়েকটা সিনেমায় কাজ করছিলাম। ডেটের সমস্যা হল। আমির খানের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছে বহুদিনের।
ক্যামেরার পিছনে
• বাংলা থেকে বেশ কয়েকজন শিল্প নির্দেশক মুম্বাই গিয়ে নতুন ধরনের কাজ করে দেখিয়েছেন। বাংলা থেকে যাওয়ার অনুভূতি কেমন আপনার?
বাংলা আর শিল্পকে আলাদা করা যায় না। অন্য রাজ্য থেকে আসা শিল্প নির্দেশকদের থেকে বাঙালিদের চিন্তাভাবনা একেবারেই পৃথক। কাজের সঙ্গে আমাদের আবেগ জড়িয়ে থাকে। বলিউডে যা বিরলই বলা চলে। প্রশংসা মেলে এর জন্য।
শিল্প নির্দেশক এবং প্রোডাকশন ডিজাইনার অমিত রায়ের সঙ্গে স্টার স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড নিয়ে সুব্রত চক্রবর্তী
• ‘পথের পাঁচালী’ ছবির সেট ডিজাইন নিয়ে আপনার কী মত? বলিউডের মতো জাঁকজমক তো নেই তাতে।
এই ধরনের ছবি আমি খুবই ভালোবাসি। বাঙালিদের সঙ্গে কাজ করেছি। সমীর চন্দ আমাকে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কাছে পাঠিয়েছিলেন। টাকার চেয়ে আমাকে প্যাশন টানে বেশি। কলকাতায় গিয়ে কাজ করার সুযোগ পেলে অবশ্যই যাব।
কাজে মগ্ন
• বলিউডের কোন কোন পরিচালকের সঙ্গে আপনার অন্তরঙ্গতা বেশি?
অনেকই রয়েছেন। বিশাল ভরদ্বাজ, সঞ্জয় লীলা ভনসালি, মেঘনা গুলজার এবং আরো বেশ কয়েকজন। বিশালজি আমার মেন্টরের মতো। ‘হায়দার’ থেকে ‘রেঙ্গুন’ – তাঁর ছবিতে বৈচিত্র্য এত বেশি যে ডিজাইনের কাজ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কাশ্মীরে মাসের পর মাস থেকে বোঝার চেষ্টা করেছি, কীভাবে সেখানে বাড়িঘর তৈরি হয়। অবিকল সেরকমই বানিয়েছি। মেঘনা গুলজার আমাকে প্রথম ধর্ম প্রোডাকশনে পাঠান। এলিটদের জায়গা সেটা। ‘রাজি’ ছবির জন্য করন জোহরের সঙ্গে দেখা করি। কোট-টাই পড়িনি বলে তাঁর পছন্দ হয়নি আমায়। এই দম্ভের কারণে সমীর চন্দ ধর্ম প্রোডাকশনে কাজ করতে চাননি। তবে সেট ডেলিভারির সময়ে গুলজার সাব হাজির ছিলেন। আমাদের ডিজাইন দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেন, পাকিস্তানে ফেলে আসা বাড়িতে আমরা তাঁকে যেন নিয়ে গিয়েছি। সেটা আমাদের বড়ো পাওনা।
‘রাজি’ (২০১৮) ছবির সেট
• পরিবেশের দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি, সেট ডিজাইনের পর বাতিল জিনিসগুলোর কী করেন?
সেটের জিনিসগুলো একটা কাজের পর আবার ব্যবহার করি। যেগুলো পুর্নব্যবহার করা যায় না, ধ্বংস করতে হয়। আমি সাধারণত অ্যাকচুয়াল বেসিসে কাজ করি। কন্ট্রাক্টে নয়। অতিরিক্ত কিছু থাকলে ফেরত পাঠিয়ে দিই পরিচালক অথিবা প্রযোজকের কাছে।
টিমের সঙ্গে সুব্রত চক্রবর্তী
• প্রোডাকশন ডিজাইনের জন্য আপনাকে অস্কার জুরিতে মনোনীত করা হয়েছে। কী ধরনের অনুভূতি হচ্ছে আপনার?
সত্যি বলতে, আনন্দে সপ্তম স্বর্গে পৌঁছে গিয়েছি আমি। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনার পরই আমাকে নিয়েছেন তাঁরা। আমার কাছে তা দারুণ সম্মানের।
(সমাপ্ত)

