
সাক্ষাৎকারে অকপট প্রোডাকশন ডিজাইনার সুব্রত চক্রবর্তী
বলিউডের খ্যাতনামা প্রোডাকশন ডিজাইনার সুব্রত চক্রবর্তী। তাঁর নাম জড়িয়ে আছে ‘পদ্মাবত, হায়দার’, ‘ছপাক’, ‘তলবার’-র মতো প্রচুর ছবির সঙ্গে। কোনো গডফাদার ছাড়াই সিনেমার জগতে প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজেকে। অস্কার জুরিতে ডাক পেয়েছেন। একান্ত আলাপচারিতায় তিনি জানালেন ঝাড়গ্রাম থেকে মুম্বাই অবধি লড়াইয়ের কাহিনি। সহেলি মিত্রের নেওয়া সাক্ষাৎকারের আজ প্রথম পর্ব।
• প্রোডাকশান ডিজাইন নিয়ে কথা বলার আগে অতীতের দিকে তাকানো যাক। । আপনার ব্যাকগ্রাউন্ডে শিল্পীসত্তা রয়েছে। তা কীভাবে এখনকার কেরিয়ারে প্রভাব ফেলল?
শিল্পী এবং আর্ট গ্র্যাজুয়েট হিসেবে যা শিখেছি, এখনকার কাজে তা প্রকাশ করি নানাভাবে। ২০০০ সালে মুম্বাইয়ে আসি। আমি সৌভাগ্যবান যে সমীর চন্দের মতো প্রোডাকশন ডিজাইনারের সঙ্গে কাজের সুযোগ পেয়েছি। তিনি নিজেও বিখ্যাত শিল্পী। প্রোডাকশন ডিজাইনের মতো সম্পূর্ণ আলাদা শিল্পমাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ আমাকে দিয়েছেন। তিনি সব সময়ে বলতেন, সেরা ডিজাইনের জন্য ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় খুব জরুরি।
সুব্রত চক্রবর্তী
• ঝাড়গ্রাম থেকে মুম্বাই গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অভিজ্ঞতা কি সিনেমার মতোই রোমাঞ্চকর?
ঝাড়গ্রাম হোক বা কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মুম্বাই – আমি সব সময়েই শিকড়ের কাছে থাকি। শিল্পীদের পরিবারেই আমার বেড়ে ওঠা। মায়ের দিকের কয়েকজন আত্মীয় টলিউডে ছিলেন। কিন্তু আমি পরিশ্রম করে উঠতে চেয়েছিলাম। তাই মুম্বাইতে কোনো রেফারেন্স ব্যবহার করিনি। এই শহরে এসে থাকতাম এক আত্মীয়ের কাছে। বাপ্পা চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তিনি সুভাষ ঘাইয়ের হয়ে কাজ করতেন তখন। ওই সময়ে কাজ শিখতাম, স্টুডিওতে ঘুরে বেড়াতাম। বছরে মাত্র দু’টো কাজ পেয়েছি। সংগ্রাম করতে হয়েছে প্রচণ্ড।
সুব্রত চক্রবর্তীর বানানো সেট
• সংগ্রাম করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন কীভাবে? অনেকেই মুম্বাইতে গিয়ে ব্যর্থ হন। আপনি কীভাবে সফল হলেন?
আমার আত্মীয় যখন মুম্বাই থেকে বদলি হলেন আর আমাকে সান্তা ক্রুজের এক বাঙালি বস্তিতে থাকতে হল, তখন থেকে আমার সত্যিকারের লড়াই শুরু। ১০ ফুটের ঘরে ৭ জন থাকতাম একসঙ্গে। অন্য কোথাও গিয়ে ওঠার মতো টাকা ছিল না। সেটের ছবি এঁকে রোজগার করতাম তখন। ২০০১ সালে যোগাযোগ হয় সমীর চন্দের সঙ্গে। বলা ভালো, বাপ্পাদার নির্দেশে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি। সমীরদা কোনো রেফারেন্স পছন্দ করতেন না। আমারও সেরকম কিছু ছিল না। প্রথমে তিনি আমাকে নিতে চাননি। তবে, ২০০১-এর শেষের দিকে পরিস্থিতি বদলায়। আমাকে বলা হয়েছিল নরকের ছবি আঁকতে। আমি বস্তির আদলে ছবি এঁকে দিলাম। বস্তিতে থাকতাম বলে আমার কাছে তা সাবলীল হয়ে গিয়েছিল। রাকেশ মেহরার ‘অকস’ ছবির জন্য ব্যবহার করা হয় সেটি। ছবি এত বাস্তবসম্মত ছিল যে আমাকে ডাকা হল ফিল্ম সিটিতে। প্রথম অমিতাভ বচ্চন, মনোজ বাজপেয়ী এবং বাকিদের সামনে থেকে দেখলাম। খুব প্রশংসা পেল আমার কাজ। সমীর স্যার জানতে পারলেন যে আমি বস্তিতে থাকি, তিনি নিজেই ডিপোজিট মানি দিয়ে গোরেগাঁওতে আমার থাকার ব্যবস্থা করলেন। প্রথম দিকের লড়াই খুব একটা সহজ ছিল না।
‘সড়ক ২’ ছবির সেট
‘পদ্মাবত’ ছবির সেট
• আপনি কি ক্যামেরার ভিউপয়েন্ট থেকে ছবি আঁকেন? ২০০০ সালে কী ইন্টারনেটের ওপর এতটা নির্ভর করতেন? তখন রিসার্চ মেটিরিয়াল পেতেন কোথা থেকে?
প্রোডাকশন সেটের পরিকল্পনা করার আগে প্রচুর রিসার্চ করতে হয় আমাদের। ইন্টারনেটের ওপর খুব বেশি নির্ভর করি না। নিজেরা গিয়ে লোকেশন ঘুরে দেখি। খুঁটিনাটি তথ্য, ঐতিহাসিক বিবরণ সংগ্রহ করি। শ্যাম বেনেগালের ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস’ ছবির কথাই ধরা যাক। নেতাজির অন্তর্ধানের জন্য সেট তৈরি হচ্ছিল। তাঁর বাড়িতে রেকি করতে গেলাম। বুঝে পারি, সামনের ফটক দিয়ে পালানো কারো পক্ষে সম্ভব নয়। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে, পিছনের কোনো সিঁড়ি দিয়ে বেরিয়ে তিনি প্রহরীদের চোখে ধুলো দেন। ১৫-২০ দিন খোঁজার পর বাগানের মধ্যে এমন সিঁড়ি পাওয়া গেল। পাশে একটা সরু রাস্তাও আছে।
কাজের মাঝখানে
• আপনার সেট ডিজাইনে ছোটোখাটো ডিটেলিং কতটা জরুরি?
খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পিরিয়ড ড্রামায়। চন্দ্রপ্রকাশ দ্বিবেদীর ‘পৃথ্বীরাজ চৌহান’ ছবির সময়কাল ১১ শতক। দু’বছর ধরে আমরা রিসার্চ করেছি। ডঃ দ্বিবেদীও যথেষ্ঠ পণ্ডিত। পৃথ্বীরাজের আমলের সূক্ষ্ম বিষয়গুলি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। কীভাবে পৃথ্বীরাজ দাঁড়ি কামাতেন, মন্দির এবং প্রাসাদের স্থাপত্য কেমন ছিল তখন – এইসব খুঁটিনাটি। শেখার ব্যাপারটা উপভোগ্য হয়েছিল বেশ। ইন্টারনেট নয়, স্থানীয় মানুষ, গাইড, লোককথা, পুঁথি, বইয়ের ওপর নির্ভর করেছি।
‘সড়ক ২’-এর টিম
ডিজাইনের কাজ চলছে
• এপিক ড্রামা ‘পদ্মাবত’-এ কি একই ভাবে কাজ হয়েছে?
হ্যাঁ, ‘পদ্মাবত’-ও বড়োসড়ো রিসার্চের প্রোজেক্ট ছিল। আমি সাধারণত স্ক্রিপ্ট অনুসরণ করি। তখনকার মানুষেরা কীভাবে চলাফেরা করতেন, আচরণ করতেন, কোন পোশাক পড়তেন বা খাবার খেতেন – স্ক্রিপ্ট পড়তে গিয়ে সেগুলো মনে ভেসে ওঠে। স্ক্রিপ থেকে সেটের প্রাথমিক কাজ হয়। যতটা সম্ভব বাস্তবসম্মত করার চেষ্টা করি। এখানে চিতোরের কথা ছিল। যদিও সেই জায়গায় গিয়ে খুব কমই জানা যায়। বেশির ভাগ অংশই আক্রমণের ফলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আমরা দিন-রাত কাজ করেছি। স্থাপত্য যেখানে যেখানে ছিল, স্কলারদের সাহায্যে তার ম্যাপ বানিয়েছি। গাইডেরা সেসব জায়গা দেখায় না। আমরা ৭ বার গিয়েছি চিতোরে। মিউজিয়াম ঘুরেছি। আমি আর অমিত গবেষণা এবং চিন্তাভাবনা করে অবশেষে চিতোরের এমন রূপ দিয়েছি, যা গাইডেরা আপনাকে দেখাবে না। জহর কুণ্ড, সেখানে মহিলারা শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পেতে আগুনে ঝাঁপ দিতেন, তাকে ফুটিয়ে তুলতে অনেক রিসার্চ করতে হয়েছে। ডিটেলিংয়ে জোর দিতে হয়েছে।
(চলবে…)

