
অমিত রায়ের একান্ত সাক্ষাৎকার
বলিউডে শিল্প নির্দেশনা ও প্রোডাকশন ডিজাইনের জগতে এখন খ্যাতির শীর্ষে রয়েছেন দুই বাঙালি। অমিত রায় এবং সুব্রত চক্রবর্তী। আরেক বাঙালি সমীর চন্দ নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন এই দু’জনকে। ‘সড়ক ২’ (২০২০), ‘ছপাক’ (২০২০), ‘রাজি’ (২০১৮), ‘পদ্মাবত’ (২০১৮), ‘রঙ্গুন’ (২০১৭), ‘উড়তা পাঞ্জাব’ (২০১৬), ‘তলবার’ (২০১৫)-র মতো প্রচুর ব্লকবাস্টার ছবিতে কাজ করেছেন অমিত এবং সুব্রত। টলিউডেও অপরিচিত নন। বঙ্গদর্শনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ইন্দ্রজিত সেনের সঙ্গে কথোপকথনে অমিত রায় অকপটে তুলে ধরলেন নিজের জার্নির গল্প। আজ প্রথম পর্ব।
অমিত রায়
• ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজ থেকেই শুরু করা যাক। কলকাতা থেকে আপনার মুম্বাই পাড়ি দেওয়া, তারপর অ্যাড এজেন্সির দিনগুলো নিয়েও জানতে চাই।
ছোটোবেলা থেকেই কিছুটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল আমার মধ্যে। কাজের সূত্রে বাইরে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছে ছিল। বাবা আমাকে প্রভাবিত করতেন খুব বেশি। তিনিই আমাকে আর্ট কলেজে ভর্তি করেন। সেই সময়ে তা সহজ ছিল না মোটেও। স্নাতক হওয়ার পর আমি মুম্বাই চলে যাই। দিদি এবং জামাইবাবু সেখানে থাকতেন। সংগ্রামের জীবন শুরু হল। অবশেষে ফ্রিলান্সার হিসেবে সাচি অ্যান্ড সাচি-তে যোগ দিলাম। ওখানে দু’বছর কেটে যায়। সম্মানজনক পদেই ছিলাম, আর বেতনও পেতাম যথেষ্ট। কিন্তু আমি চাইছিলাম আরও কিছু। এরই মধ্যে বিয়ে করি। মুম্বাইয়ের মতো শহরে আমার কেরিয়ারে ভীষণ ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। তবে যে কোনো সমস্যাতেই আমার স্ত্রী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।
অমিত রায় এবং সুব্রত চক্রবর্তী
আর্ট কলেজে পড়ার সময় থেকেই আমি বোহেমিয়ান। তবে সব সময়ে বড়ো কিছু করতে চাই। ভাবতে থাকি, কেন আমি কলকাতা থেকে এতদূর এলাম। আমার বন্ধুরা সবাই ডাক্তার এবং ইঞ্জিনিয়ার। বাড়ির লোক চাইতেন, আমিও সেরকম কিছু হই। এদিকে অ্যাড এজেন্সির মাধ্যমে তখন ঢুকে পড়েছি বলিউডে। শিল্প নির্দেশনার কিছুই জানতাম না। শিল্প-সাহিত্যের গভীর চর্চা থাকলেও ইংরেজি ঠিকঠাক বলতে পারতাম না। মনের ভাব প্রকাশ করতে অসুবিধে হত। তারপর আর্ট কলেজের কয়েকজন বন্ধুর সাহায্যে সমীর চন্দের সঙ্গে দেখা করি। শিল্প নির্দেশক হিসেবে সমীরদা তখন খ্যাতির শীর্ষে। সত্যি বলতে, আমার স্ত্রী এবং পরিবারের সহায়তা ছাড়া তাঁর সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতেই পারতাম না।

সমীর চন্দ আমাকে তিন বছর ধরে অদ্ভুত সব কাজ করাতেন। কাজ পাওয়া সহজ ছিল না। অনেক সিনিয়ারের পেছনে আমাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেন। আমার কাজে খুশি হয়ে তিনি নিজের একটি সিনেমায় আমাকে নিলেন ডিজাইনার হিসেবে। তবে সেট তৈরি নয়, পোস্টার এবং ওইরকম নানা জিনিসে অলংকরণ করতে হত। আমি তো এজন্য অ্যাড এজেন্সির কাজ ছাড়িনি! আমার সঞ্চয়ের প্রায় সব ব্যয় হয়ে গেল। সাহায্যের জন্য বাবার কাছে হাত পাততে হল।
অমিত রায় এবং সঞ্জয় লীলা ভনসালি
• এই তিন বছরে নিশ্চয়ই অনেক কিছু শিখেছেন?
যা শিখতাম, তা দেখানোর সুযোগ কোথায় ছিল? রোজগারই বা কী করতাম? সুব্রত আর আমি বড়া-পাউ খেয়ে থাকতাম। কখনও বা সামোসা জুটত। দাদা বলতেন, সৃজনের জন্য ‘ভুখা পেট’-ই সর্বশ্রেষ্ঠ। আমাদের পরীক্ষা নিতেন প্রতিনিয়ত। সবাইকেই নিতেন। কতটা অর্জন করেছি, বোঝার চেষ্টা করতেন। এখনকার দিনে তরুণ কর্মীরা প্রথমেই বেতন জানতে চায়। তেমন প্রশ্ন আমরা কখনও করতে পারিনি। তিন বছর ধরে সমীরদা প্রচুর শিখিয়েছেন। যত রকমের কাজ পেরেছি, আমরা করেছি। ফিল্ম সেটে যাইনি ঠিকই, কিন্তু এমন কিছু শিখেছি, যা আর্ট কলেজে পাওয়া যাবে না। যেমন প্রেজেন্টেশন এবং ডিজাইন।

সুব্রত যোগ দিয়েছিল আমার ৬ মাস আগে। একসঙ্গে কাজ করতে করতে একটা বন্ধন গড়ে উঠেছিল দু’জনের। প্রায় একই বয়স, একসঙ্গে সংগ্রাম করতাম। একই বেতন ছিল, তখন কাঠের মিস্ত্রিরা যেমন পেতেন! হঠাৎ একটা বিগ ব্রেক আসে। শ্যাম বেনেগালের ছবি ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস: দ্য ফরগটেন হিরো’ (২০০৪)-এর জন্য রিসার্চ করতে আমাদের দু’জনকে কলকাতা পাঠালেন দাদা। সেই প্রথম স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেলাম। প্রথম আমাদের নাম সিনেমার স্ক্রিনে দেখা গেল। পরিচালক শ্যাম বেনেগাল এবং চিত্রনাট্য লেখক শামা জাইদির মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হল। দু’জনেই আমাদের কাজের প্রশংসা করলেন।
দাদা আমাদের একসঙ্গে ‘চাঙ্গু মাঙ্গু’ নামে ডাকতেন। উনি আমাদের দেওয়াল থেকে ঝাঁপ দিতে বললে আমরা সেটাই করতাম। এতটাই অনুগত ছিলাম।
কাজের মাঝখানে
• ‘সুভাষ চন্দ্র বোস’-এর পর কোনো স্বাধীন অ্যাসাইনমেন্ট পেয়েছেন?
না, না একেবারেই নয়। দাদা আমাদের পরীক্ষা করছিলেন মাত্র। আমরা বছরের পর বছর তাঁর সহকারী হয়েই ছিলাম, যতদিন না আমরা হয়ে যাই ‘সিনিয়র’। তার আগে দাদা আমাকে সুব্রতর থেকে আলাদা করে দেন। বলেন, আমরা যথেষ্ঠ শিখেছি, এবং তাঁর অধীনেই একা কাজ করার সময় এসেছে। সম্ভবত ‘রং দে বাসন্তী’ (২০০৬) ছবিতে শেষবার একসঙ্গে কাজ করেছি সুব্রতর সঙ্গে। আমি যা কিছু অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞান অর্জন করেছি, সবই সমীর চন্দের থেকে পাওয়া। ২০১১ সালে দাদা প্রয়াত হওয়া পর্যন্ত আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম। তারপর শুরু হয় নতুন জার্নি।
যৌথ কাজ
• জনপ্রিয় পরিচালকদের সঙ্গে প্রচুর ব্লকবাস্টার ছবিতে আপনি কাজ করেছেন। এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছেন, আপনাকে না পেলে পরিচালকরা এখন কাজ শুরু করতে চান না। দু’দশকের বেশি সময় ধরে আপনি কলকাতার বাইরে। বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছে কখনও হয়নি?
মাঝেমাঝে বলিউডের ব্লকবাস্টার ছবির কাজ শেষ করার পর দাদা আমাকে বাংলা সিনেমায় কাজ করতে পাঠাতেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এবং গৌতম ঘোষের সঙ্গে কাজ করেছি। বাংলার বাইরে থাকলেও টের পাই, বাংলা আমার মধ্যে রয়ে গিয়েছে। গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষ’ (২০১০) ছবির সেট পুরোটাই আমার তৈরি। ‘চিটাগং’ (বেদব্রত পাইন, ২০১২) ছবির জন্য কমিট করতে পারেননি বলে দাদা আমাকে পাঠিয়েছিলেন।
অমিত রায় এবং আমির খান
মুম্বাইয়ে বাজেট প্রচুর, বাংলা সিনেমায় অনেক কম। দাদা বলতেন, এটা নিয়ে ভাবো, অল্প বাজেটেই কীভাবে সেরা কাজ করা সম্ভব। সেকথা আমি সব সময়ে মনে রাখি, টাকা যতই কম হোক। বাংলায় আমি হৃদয় দিয়ে কাজ করি। ‘মনের মানুষ’-এর সেট বানানো হয়েছিল লাটাগুড়িতে। অনেক বাধাবিপত্তি এসেছিল। বুঝতেই পারছিলাম না যে কীভাবে কাজ শেষ করব। মুম্বাইতে যখনই প্রয়োজন, ১০০ জন সাপ্লায়ার প্রস্তুত থাকে। কিন্তু লাটাগুড়ি তো মুম্বাই নয়! এদিকে গৌতমদা চান, আমি সেখানে একটা গোটা গ্রাম তৈরি করি!
অমিত রায়, সুব্রত চক্রবর্তী এবং মহেশ ভাট
আরও বেশি করে আমরা বাংলা ছবিতে কাজ করতে চাই। একটা বড়ো ‘কিন্তু’ রয়েছে। দাদা প্রয়াত হওয়ার পর সুব্রত আর আমি কলকাতা চলে যাই। নিউ ব্যারাকপুরে আমার বাড়িতে গিয়ে উঠি। টাকার অভাব এত ছিল যে বুঝতে পারছিলাম না, পরের মাসের ইএমআই জমা দেব কীভাবে। কলকাতার প্রায় সব পরিচালকের কাছেই গিয়েছিলাম তখন। সবাই বলেছিলেন, আমাদের কাজ তাঁর খুব ভালোবাসেন এবং দাদাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন। শেষ পর্যন্ত রাজ চক্রবর্তীর দুই ধারাবাহিক ‘জোশ’, এবং ‘নায়িকা’-তে কাজ শুরু করি। তারপর আরও কাজ আসতে থাকে। এদিকে, নানা রাজনৈতিক জটিলতা সত্ত্বেও বলিউড আমাদের টানতে থাকে। বিশাল ভরদ্বাজের ছবিতে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয় সুব্রতকে। আমার জন্য দক্ষিণ ভারতে থেকে কাজ আসে। আগেও সেখানে বহুবার কাজ করেছি। নিজেদের মধ্যে কথা বলে আমরা বিশাল ভরদ্বাজের ছবি ‘মটরু কি বিজলি কা মন্ডোলা’ (২০১৩) ছবিতে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
সেট ডিজাইন
• আপনার কাজ যে ধরনের রিসার্চ ওরিয়েন্টেড, তার প্রেক্ষিতে কোন পরিচালকের সঙ্গে আপনি সবথেকে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন? বিশেষ করে পিরিয়ড ফিল্মের জন্য কার নাম করবেন?
রিসার্চের কথা বলতে গেলে প্রথমেই ডঃ চন্দ্রপ্রকাশ দ্বিবেদীর নাম করতে হয়। তাঁকে আমরা ‘জ্ঞান ভাণ্ডার’ বলে ডাকতাম। তাঁর কোনো তুলনা হয় না। ‘পৃথ্বীরাজ’ (২০২০) দেখলেই আপনি বুঝতে পারবেন। দৃশ্যপটের কথা বিবেচনা করলে সঞ্জয় লীলা ভনসালির নাম করব। মায়াবী তাঁর প্রতিভা। স্বপ্ন সৃষ্টি করতে পারেন। তাঁর ‘গাঙ্গুবাই কাথিয়াবাড়ি’ (২০২০) ছবি প্রথমে আমরা নাকচ করি। শেষে তাঁর জোরাজুরিতে রাজি হই।”
(চলবে…)

