
‘মন আমার হরি হরি বল’ গানটি রেকর্ড হল আকস্মিকভাবেই
সিনেমায় গানের প্রয়োগ-ভাবনায় সত্যজিৎ রায় ছিলেন বরাবরই অন্য ধাঁচের এক রূপকার। ছবির চরিত্রদের কণ্ঠে গানের ব্যবহারই হোক কিংবা প্রয়োজনে ছবিতে স্থানীয় গানকে ঢুকিয়ে দেওয়াই হোক, দু’টি বিষয়েই তাঁর ভাবনা ও প্রয়োগবোধ থাকত সজাগ। ‘সোনার কেল্লা’তে রামদেওরা স্টেশনে রাজস্থানি শিল্পীদের লোকগান সেই প্রয়োগ বোধেরই পরিচায়ক। আমাদের মনে পড়তে পারে, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবিটির কথাও। সেখানে ‘ওরে হাল্লা রাজার সেনা’ গানটির শুটিঙের সময় তিনি খোঁজ পেয়েছিলেন দুই স্থানীয় বংশীবাদক শওকত আলি আর কর্ণর। দুজনের বাঁশিই সিনেমায় ব্যবহার করেছিলেন সত্যজিৎ। সত্যজিতের ছবিতে গানের প্রয়োগ নিয়ে গল্প লিখতে বসলে একটা আস্ত মহাভারত রচনা হয়ে যাবে।
আজ একটাই গল্প থাক। আর সেই গল্পও সত্যজিতের প্রথম চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’ থেকে। যদিও পণ্ডিত রবিশঙ্করের হাতে ছবির সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব সঁপে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ, তবুও নিজের চিন্তার প্রয়োগ তিনি বারবার বুনেছেন এই ছবির সঙ্গীতে। বুনেছেন ছবির স্বার্থেই। সেটাই বোঝা যায় চুনিবালা দেবীকে দিয়ে গান করানোর ঘটনায়। আলাপচারিতায় প্রখ্যাত সংগীত-বিশেষজ্ঞ ও লেখক সুধীর চক্রবর্তী মশাইকে সত্যজিৎ বলেছিলেন, “চুনিবালা দেবীকে যে দিন প্রথম তাঁর পাইকপাড়ার বাড়িতে দেখতে যাই, সে দিনকার মনের অবস্থা ভোলবার নয়। ছবির কাজ শুরু হয়ে গেছে। অপু, দুর্গা, হরিহর, সর্বজয়ার ভূমিকা নির্বাচন হয়ে গেছে।… বাকি আছে কেবল ইন্দির ঠাকরুন। চুনিবালা আমাদের হতাশ করলেন না। ‘পঁচাত্তর বৎসরের বৃদ্ধা, গাল তোবড়াইয়া গিয়াছে, মাজা ইষৎ ভাঙিয়া শরীর সামনে দিকে ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে’…. বর্ণনার সঙ্গে অমিল হলো না।”
“জিজ্ঞেস করলাম- আপনি ছড়া জানেন কোন? আবৃত্তি করতে পারেন? ‘ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসি’ ছড়ার দশ-বারো লাইনের বেশী আমি কখনও শুনিনি। চুনিবালার মুখে এর পরিসর বৃদ্ধি হল আশ্চর্য ভাবে।…. শ্রদ্ধা হল প্রবীণার স্মরণশক্তি দেখে।”
“চুনিবালা’র অনেক গুণের মধ্যে তাঁর গলাটি আবিষ্কার হয় বেশ পরের দিকে। একদিন সুটিং-এর শেষে হরিহরের দাওয়ার বসে বৈকালিক চা-পানের সময় তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি গান জানেন? উপন্যাসে বা চিত্রনাট্যে ইন্দিরের গানের উল্লেখ ছিল না, তবে ক’দিন থেকেই মনে হচ্ছিল, ইন্দিরের কোন অলস মুহূর্তে একটি গান দিতে পারলে মন্দ হয় না।”
এই দীর্ঘ উদ্ধৃতি টানতেই হল, সত্যজিতের ভাবনার জগৎটিকে ধরার জন্য। হঠাৎ করেই চুনিবালা দেবীর গানের গলা আবিষ্কার করছেন সত্যজিৎ। কারণ তাঁর মনে হচ্ছে, ছবিতে সেই গলা ব্যবহার করলে ‘মন্দ হয় না’। চুনিবালা তখন বলেছিলেন- “ধর্মমূলক চলবে কি?” সত্যজিৎ বলেছিলেন, চলবে। চুনিবালা দেবী ওরফে কাহিনির ইন্দির ঠাকরুন তখন গাইলেন- ‘মন আমার হরি হরি বল/ হরি হরি হরি বল/ ভবসিন্ধু পার চল’। গানটি রেকর্ড হল। কিন্তু সিনেমার কোথাও গানটি শোনা যায় না। তার বদলে আমরা ইন্দিরা ঠাকরুনকে অন্য গান গাইতে শুনি।
এর আড়ালেও একটি ইতিহাস আছে। সেটা চাঁদনি রাত। দাওয়ার পশ্চিম দিকে মুখ করে হাতে তাল রেখে ইন্দির ঠাকরুন গান করছেন। এমন দৃশ্য যখন ওপরের গানটি সহ তোলা হবে তখন শট নেওয়ার কিছুক্ষণ আগে চুনিবালা দেবী হঠাৎ বললেন, তাঁর আরেকটা গান মনে পড়েছে। সেটা নাকি আরও ভালো। চুনিবালা সত্যজিৎবাবুকে প্রশ্ন করলেন, “শুনবেন?” সত্যজিৎ সম্মতি দিতেই শুরু হল তাঁর গান। ‘হরি দিন তো গেল সন্ধা হল/ পার কর আমারে।’ সুধীর চক্রবর্তীর বয়ানে ‘ফকিরচাঁদী পর্যায়ের চমকপ্রদ গানখানি চুনিবালা দেবীর স্মৃতির সরণি বেয়ে অবিনশ্বর হয়ে গেল বিশ্ব শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রে।’
এই হল ‘পথের পাঁচালী’-তে ইন্দির ঠাকরুনের আকস্মিক গান গাওয়ার গল্প। ‘পথের পাঁচালী’-র শুটিং যখন অর্থাভাবে আটকে আছে, তখন ছবির সম্পাদক দুলাল দত্ত নিয়ে এসেছিলেন নারায়ণ সাধুখাঁ নামের এক প্রযোজককে। তিনি বললেন, ছবিতে গান নেই কেন? দুর্গার মুখে গান দিতে হবে। শুনে সত্যজিৎ গেলেন রেগে। “পাগল নাকি! বিভূতিভূষণ পড়েননি?” প্রযোজক চলে গেলেন। সেই সত্যজিতই চলচ্চিত্রের স্বার্থে গান গাওয়াচ্ছেন চুনিবালা দেবীকে দিয়ে। ভাবলে অবাক লাগে বৈকি। আসলে, ধরা-বাঁধা গতে নয়, স্বাভাবিকতার স্রোত বেয়েই তৈরি হয়েছিল ভারতীয় সিনেমায় গানের ভেতর দিয়ে নিও-রিয়ালিটিক যাত্রাপথের এই সূচনা।
