দার্জিলিংয়ে পাহাড়ি জীবনের সাথী হয়ে আজও টিকে রয়েছে সিংহ মুখের কল

দার্জিলিংয়ের এই কলের বয়স ৯২ বছর

দার্জিলিং। আধো মেঘ আধো কুয়াশা ঢাকা পাহাড়ি রাস্তা। রাস্তা লাগোয়া পাহাড়ের ঢালে জনবসতি, সঙ্গে গাড়ি আর ট্যাক্সির স্ট্যান্ড। তারই এক কোণে সকলের অগোচরে, লোকচক্ষুর আড়ালে সিংহের মুখ থেকে পড়ছে পাহাড়ি ঝরনার জল। কেউ কলের নিচে রেখে যায় জল ধরার বড়ো জার, কেউ বা আবার নিজেই কল থেকে জল তুলে রওনা দেয় বাড়ির দিকে। আসলে সিংহ মুখের এমন কল চেহারায় চরিত্রে ঠিক যেন এককালের অতীত কলকাতার সিংহ মুখের কলের মতোই দেখতে লাগে। তবে কলকাতার সিংহ মুখের কলগুলো ইংরেজ সাহেবদের বদান্যতায় তৈরি হয়েছিল। ইংরেজ আমলে যেহেতু তাদের পছন্দের শৈল শহর ছিল দার্জিলিং, তাই মনে হয়েছিল উত্তর কলকাতার মতো এখানেও পথের ধারে সিংহের মুখ থেকে জলবণ্টনের ব্যবস্থা করেছে ইংরেজ।

কিন্তু না, আরও একটু কাছে যেতেই সেই ধারণায় বদল এল। এখানে কলের উপর একটি ফলকে ঝাপসাভাবে তিব্বতীয় ভাষায় ও হিন্দিতে লেখা আছে কিছু কথা। এই ফলক থেকেই জানা যায় ১৯৩২ সালের জানুয়ারি মাসের ১৬ তারিখে বৌদ্ধ গোকুল লামা এই কলটি পাহাড়ের গায়ে ঝরনার সঙ্গে যুক্ত করে লাগিয়েছিলেন পথচলতি মানুষের তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে।

গোকুল লামা জানতেন ধর্মের পাঠ। বৌদ্ধ ধর্মের সেই পাঠ মোতাবেক জল হল অন্তর আর বাহিরের শুদ্ধির একমাত্র উপাদান। সেই পথেই বুদ্ধের সঙ্গীরা আজও জলকে চারটি পবিত্র প্রকৃতি জাত উপাদান হিসেবেই মানেন। পথ চলতি এক বৌদ্ধ লামাকে কী লেখা আছে জানতে চাইলে তিনিই সেই লেখা খানিকটা উদ্ধার করে জানালেন এইসব তথ্য। বললেন, “এই কল একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী তৈরি করেছিলেন। তিনি জানতেন মাটি, আগুন আর বাতাসের মতো জল অন্যতম পবিত্র উপাদান। তাকে অপচয় করতে নেই।” এই চার উপাদান দিয়ে মানুষের শরীর তৈরি হয় বলেই বৌদ্ধ লামারা বিশ্বাস করেন। তাই মানুষের শরীর আর মন এই চার উপাদানের সঙ্গ ত্যাগ করতে পারে না। সবই শরীরের প্রয়োজন আমৃত্যু। স্বভাবতই জলেরও দরকার শরীরের। মাটি অবস্থান দেয়, বাতাস প্রাণের স্পন্দন দেয়, আগুন জীবনের উষ্ণতা জিইয়ে রাখে আর জল জীবনকে ধারণ করে। তারপর আবার আগুন জল বাতাস গায়ে মেখে মাটিতেই মিশে যাওয়া। তাই জলের তৃষ্ণা মানুষের ও তাবৎ প্রাণীর সর্ব সময়ের সঙ্গী।

আমাদের সঙ্গের ড্রাইভার রাজু তামাং বলেন আরেক কথা। আসলে পাহাড়ের মানুষের ঢাল ভেঙে ওপর নীচ করাই কর্ম জীবনের একমাত্র উপায়। জল তেষ্টা পায়, কিন্তু জল মেলা ভার পাহাড়ে। তাই এই জল। লামা সন্ন্যাসী সঙ্গে যোগ দিয়ে বললেন কলের সিংহ মুখের কথা। জানালেন এর তাৎপর্য। তিনি বললেন, বুদ্ধ ভগবানের নাম শাক্য সিংহ হিসেবে সিংহের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত। তাই সিংহ হল বুদ্ধ ভগবানের নাম। সেই নামের মুখ নিঃসৃত পবিত্র জল পাহাড়ি জীবনের সাথী হয়ে টিকে রয়েছে এই পাহাড়ের কোলে আরও নানা দেবতার ছবি সঙ্গে নিয়ে।

Developed by DXDasia