পদ দুটির সঙ্গে বহু পুরনো ‘মিষ্টি’ সম্পর্ক রয়েছে দুই বাংলার
‘ইচার মুড়া’, ‘গঙ্গাজলি’। কোনও খাবারের এমন ‘ইউনিক’ নাম শুনলেই খাদ্যরসিকদের মন আনচান করে ওঠে। আমার দশাও তাই হয়েছিল, কিন্তু এ খাবার পাবো কোথায়! অতঃপর শুরু হল চিরুনি-তল্লাশি। শেষপর্যন্ত পাওয়াও গেল। তবে খাবার নয়, খাবার দু'টির ইতিবৃত্ত। না, এঁচোড় ও গঙ্গাজলের সঙ্গে ‘ইচার মুড়া’ ও ‘গঙ্গাজলী’র কোনও সম্পর্ক নেই। তবে, পদ দুটির সঙ্গে বহু পুরনো ‘মিষ্টি’ সম্পর্ক রয়েছে দুই বাংলার; যদিও সেই সম্পর্কে আজ ভাটা পড়েছে। আর, সেই ভাটায় নতুন জোয়ার আনতেই এই প্রবন্ধ।
আরও পড়ুন: বাংলার নিজস্ব খাঁটি মধু

(বরিশালের ‘ইচার মুড়া’)
‘ইচার মুড়া’ হলো পূর্ব বাংলার উৎসবের মিষ্টি। বাংলাদেশের বরিশালের বিভিন্ন অঞ্চলে বিজয়া দশমীর মিষ্টি হিসেবে ইচার মুড়া তৈরির চল ছিল। বাঙাল ভাষায়, ‘ইচা’ হইল গিয়া চিংড়ি মাছ। আর চিংড়ি মাছের মাথার আদলে হয় বলে এর নাম ইচার মুড়া। এই মিষ্টির মূল উপাদান নারকেল আর চিনি। নারকেলের শাঁস খুব পাতলা এবং ছোট ছোট করে কুচিয়ে কিংবা কুরে নিয়ে তা চিনির সঙ্গে জ্বাল দেওয়া হয়। কিছুটা শক্ত হলে সেই মণ্ড মুঠো করে চেপে লম্বাটে আকার করা হয়। সেটি পাতলা আটা গোলার মধ্যে ডুবিয়ে ডুবো তেলে ভাজতে হয়। এর পরে সেটি চিনির রসে ফেলে তুলে নিলেই তৈরি ইচার মুড়া। বহু বছর পরেও কিছু কিছু পরিবারে বহুকাল ইচার মুড়া তৈরির চল বজায় ছিল। এখন নেই।

(গঙ্গাজলি)
উৎসবে, নানা অনুষ্ঠানে গঙ্গাজলি নাড়ু বানানো হত, এখন আর তার চল নেই। এমনকি, বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে নাকি এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে বিজয়গুপ্ত সনকাকে দিয়ে যে বিপুল খাদ্যদ্রব্য পরিবেশন করিয়েছেন তার মধ্যে আছে ‘উত্তম ক্ষীরসা দিয়ে গঙ্গাজলী লাড়ু’। কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর ‘চৈতন্যচরিতামৃতে’ পাওয়া যায়, বর্ষান্তরে গৌরভক্তরা প্রভুর ভোগের জন্য শ্রীক্ষেত্রে যা যা নিয়ে যাচ্ছেন তার মধ্যে ‘নারিকেল খণ্ড আর নাড়ু গঙ্গাজল’ থাকছে। পরবর্তীকালে কোনো এক সময় একে ‘গঙ্গাজলি সন্দেশ’ বলা হত। এককালে কৃষ্ণনগরের গঙ্গাজলি সন্দেশের খ্যাতি ছিল। মূলত পশ্চিমবাংলাতেই এই মিষ্টির উল্লেখ পাওয়া যায়। এই হলো মোটামুটি গঙ্গাজলির ইতিহাস। গঙ্গাজলি বাংলার লুপ্ত হয়ে যাওয়া এক ধরনের নাড়ু। যাবতীয় পুরনো রান্নার মতোই এই নাড়ু তৈরির পদ্ধতিও বেশ জটিল। প্রথমে নারকেল খুব মিহি করে কুরে চিপে দুধ বের করে নিতে হয়। তারপর সেই নারকেল কোরা শুকনো খোলায় এমন করে ভাজতে হবে যেন তা লালচে না হয়ে যায়। মুচমুচে ভাজা হলে মিহি করে বেটে নিতে হবে। তার সঙ্গে গুঁড়ো করা চিনি মেশাতে হবে, কর্পূর দিতে হবে। এর পরে গোল গোল ছাঁচ তোলা কাঠের পাটায়(এখন সিলিকন এবং স্টিলের তৈরি এই ধরনের পাত্র বাজারে মেলে) পাতলা কাপড় বিছিয়ে এক একটা ছাঁচে চেপে চেপে নারকেল কোরা ভরতে হবে। শক্ত হয়ে গেলে কাপড়ে টান দিলেই নাড়ু গুলো উঠে আসবে।
আরও পড়ুন: শীতের পাতে গরম ভর্তা
বাঙালি মিষ্টি অন্তঃপ্রাণ। তাই পরিশেষে বলাই যায় হারিয়েও ফিরে আসতে পারে বরিশালের ‘ইচার মুড়া’ কিংবা মঙ্গলকাব্যের ‘গঙ্গাজলী’ : দুই বাংলার হারানো স্বাদ।
