একশো বছরের ইতিহাসের স্বাদ লক্ষ্মীনারায়ণ এন্ড সন্সের তেলেভাজায়

সুভাষচন্দ্রের স্মৃতি, জহর রায়ের ছড়া আর তেলেভাজার স্বাদ

১৯১৮ সাল। ঠিক একশো বছর আগে বিহারের গয়া থেকে কলকাতায় এসে একচিলতে দোকান দিলেন খেঁদু সাউ। তেলেভাজার দোকান। বেগুনি, পেঁয়াজি, কাশ্মীরি চপ। তাছাড়া, প্রতিদিন সকালে নিজের হাতেই ফুলুরি ভাজতেন খেঁদু। হাতে জাদু ছিল তাঁর। রাতারাতি সেই তেলেভাজার স্বাদে বুঁদ হয়ে গেল উত্তর কলকাতার লোকজন। সকাল, সন্ধে দোকানে ভিড় লেগেই থাকে। কত রকমের লোকজন। বাবু, কেরানি থেকে দারোগা। তখন উত্তাল স্বদেশী আন্দোলনের যুগ। খেতে খেতেই চালাচালি হয় নানা কথা, খবর। শালপাতায় মুড়ি-তেলেভাজা সাজিয়ে দেওয়ার ব্যস্ততার ফাঁকেই খেঁদু সেই সব কথা শোনেন মন দিয়ে। ততদিনে তিনিও যুক্ত হয়ে পড়েছেন স্বদেশী আন্দোলনে। এইসব খবর থেকেই মণি-মুক্তো বাছাই করে পৌঁছে দেন বিপ্লবীদের কাছে। হইহই করা জনপ্রিয়তার মাঝেই খেঁদুর তেলেভাজার দোকান তখন হয়ে উঠেছে স্বদেশীদের ইনফরমেশন সেন্টারও।

দুই প্রজন্ম– কেষ্টকুমার গুপ্তা (সাউ) এবং তাঁর ছেলে

ছেলের নামে দোকানের নাম রেখেছিলেন খেঁদু সাউ। লক্ষ্মীনারায়ণ সাউ এন্ড সন্স। একশো বছর পার করেও এখনো স্বমহিমায় রমরম করে চলছে দোকান। খেঁদু সাউয়ের পরে দোকানের হাল ধরেছেন ছেলে লক্ষীনারায়ণ এবং তারপরে তৃতীয় প্রজন্ম কেষ্টকুমার গুপ্তা (সাউ)। তেলেভাজার স্বাদে কোনো ভেজাল মেশেনি। টাল পড়েনি জনপ্রিয়তাতেও। সময়ের সঙ্গে বরং বেড়েছে পদের বাহার। হেদুয়া থেকে বিধান সরণি বরাবর হাতিবাগানের দিকে হাঁটলে বাঁ হাতে এই দোকানের সামনে দুদণ্ড থমকে দাঁড়াতে ইচ্ছে করবেই। তেলেভাজার নেশা ধরানো গন্ধের প্রলোভন সামলানো কঠিন। প্রতিদিন সকাল থেকেই শুরু হয় ভিড়। রাত ৯টাতেও ঝুড়ি, কাঁচের বাক্স-ভর্তি নানা ধরনের চপ। ফুটপাথ উথলে ভিড় মাঝেমাঝেই নেমে আসে রাস্তায়। লক্ষ্মীনারায়ণ সাউয়ের তেলেভাজা যে চেখেছে, সেই জানে এ জিনিস অন্য কোথাও চাইলেও মিলবে না। কেষ্টকুমার গুপ্তা বলছিলেন, “আমাদের প্রতিটা আইটেমই স্পেশাল। যাঁরা এই দোকানের তেলেভাজা খেয়েছেন, চোখ বুজে তেলেভাজায় কামড় দিলেও তাঁরা বলে দেবেন এটা লক্ষ্মীনারায়ণের তেলেভাজা।” রীতিমতো সিগনেচার স্বাদ যাকে বলে।

একসময় লক্ষ্মীনারায়ণের পেঁয়াজি চাখতে দূর-দূরান্ত থেকেও লোকজন উজিয়ে আসত দোকানে। সেই পেঁয়াজি আজো বেস্ট সেলার। খেঁদু সাউ নিজের হাতে বানাতেন ফুলুরি। এখন অবশ্য তা তৈরি হয় মেশিনে। কেষ্টকুমারের আমলে দোকানে শুরু হয়েছে নানা নতুন আইটেম—আমের চম, পনিরের চপ, চাউমিনের চপ। এগুলির আবিষ্কর্তা লক্ষ্মীনারায়ণ সাউ এন্ড সন্স-ই। তাছাড়া, চিরাচরিত আলুর চপ, ধোকার বরফি, ভেজিটেবল চপ, ভেজিটেবল কাটলেট তো রয়েছেই। দেদার বিকোয় সোয়াবিনের চপ, ফুলকপির চপও। কিছুদিন আগেও নারকেল চপের একমাত্র ঠিকানা ছিল এই দোকানই।

লক্ষীনারায়ণ সাউ এন্ড সন্স-এর তেলেভাজা কিন্তু নিছক স্বাদের গুণেই এত জনমোহিনী নয়। এই দোকানকে ঘিরে থাকা গপ্পেরা তেলেভাজার স্বাদকে যেন আরো খোলতাই করেছে। খেঁদু সাউয়ের আমলে যে এই দোকান স্বদেশীদের গোপন আখড়ায় পরিণত হয়েছিল, সে কথা তো আগেই হল। স্বদেশী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার অপরাধে তিনি জেলেও গেছেন দু-একবার। তবে, খেঁদু সাউয়ের জীবন বদলে দিয়েছিল নেতাজির সঙ্গে সাক্ষাৎ। 

রাত ৯টাতেও বিকিকিনি থামেনি

দোকানের আশেপাশেই নানা ডেরায় গোপন মিটিং বসত স্বদেশীদের। সেখানে মুড়ি-তেলেভাজা দেওয়ার নিয়মিত বরাত পেতেন খেঁদু সাউ। তেমনি কোনো এক মিটিঙে এসেছিলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র বসু। খেঁদুর হাতের তেলেভাজা খেয়ে তো তিনি মুগ্ধ। নেতাজির সাক্ষাৎ পেয়ে মুগ্ধ খেঁদুও। সেই মুগ্ধতাবোধ এমন পর্যায়েই পৌঁছায় যে, ১৯৪২ সাল থেকে প্রতি বছর নেতাজির জন্মদিনে, ২৩ জানুয়ারি, বিনামূল্যে তেলেভাজা বিতরণ শুরু করেন খেঁদু সাউ। তখন ব্রিটিশ আমল, তাই প্রকাশ্যে দোকানের ভিতর থেকে এমন কিছু করা বিপজ্জনক। খেঁদু তাই এক ধামাভর্তি তেলেভাজা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন ২৩ জানুয়ারি সকালে। বন্ধুবান্ধব-পরিচিত-অপরিচিতদের মধ্যে বিলোতেন চপ, ফুলুরি, পেঁয়াজি। সঙ্গে নেতাজির গুণগান। স্বাধীনতার পর থেকে এই সামান্য আড়ালের বালাইটুকুও আর রইল না। নেতাজির জন্মদিনে দোকান থেকেই কচি-কাচাদের মাথাপিছু দুটো আর বড়োদের চারটে করে তেলেভাজা বিনামূল্যে খাওয়ানো শুরু হল। সেই ট্র্যাডিশন এখনো চলছে। সকাল সাতটা থেকে বেলা তিনটে অবধি চলে এই বিনামূল্যে তেলেভাজা বিতরণ। নেতাজিকে ঘিরে এই মুগ্ধতাকেই বহন করছে দোকানের সাইনবোর্ড। সেখানেও মধ্যমণি হয়ে উজ্জ্বল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

আরও কত বিখ্যাত মানুষদের পায়ের ধুলো যে পড়েছে দোকানের চত্বরে, তা গুনে শেষ করা যাবে না। রামকুমার চট্টোপাধ্যায় নাকি এই দোকানের তেলেভাজা ছাড়া মুখেই তুলতে চাইতেন না কিছু। কিছুদিন আগে সৌরভ গাঙ্গুলীকেও তেলেভাজা খাইয়ে এসেছেন কেষ্টকুমার গুপ্তা। তবে, জহর রায়ের গল্প বলতে গিয়ে আজো চকচক করে ওঠে তাঁর মুখচোখ। তখন, রঙমহলে থিয়েটার করতে আসতেন জহর রায়। শোয়ের পর ঢুঁ মারতেন লক্ষ্মীনারায়ণে। কেষ্টকুমারের বাবা লক্ষ্মীনারায়ণ সাউ একদিন তাঁকে বললেন, ‘জহরদা, আপনার হাস্যকৌতুক তো বিখ্যাত। তা আমাদের দোকান সম্পর্কেও কিছু বলুন না।’ জহর বললেন—‘জলদি খাতা-পেন বের কর।’ পেন, খাতা সবই বেরল। জহর রায় মুখে মুখেই ছড়া কাটলেন—“চপ খাব আস্ত/ তৈরি করব স্বাস্থ্য/ বেগুনি খাব গোটা/ আমরা সবাই হব মোটা/ চানাচুর খাব অল্প/ শোনাব সবাইকে গল্প।” আর সবশেষে ‘ইতি জহর রায়’। ছড়ায় ছন্দপতন হয়েছে কিঞ্চিত, কিন্তু রসের কোনো খামতি হয়নি। আজো লক্ষ্মীনারায়ণ সাউ এন্ড সন্স-এর দোকানে গেলে দেখা মিলবে এই ছড়ার।

লক্ষ্মীনারায়ণ সাউ এন্ড সন্সের তেলেভাজার বাহার

কেষ্টকুমার গুপ্তা বলছিলেন, দাদুর-বাবার আমলের তেলেভাজার স্বাদবদল হতে দেননি তাঁরা। শুধু চেষ্টা করেছেন, সেই স্বাদভাণ্ডারকেই আরো সমৃদ্ধ করতে। কেষ্টকুমারের ছেলেও এখন ব্যবসায় সঙ্গ দেন তাঁকে। লক্ষ্মীনারায়ণের পরে ‘এন্ড সন্স’-এর পরম্পরা এরপর বয়ে নিয়ে যাবেন তিনিই। ইতিহাস আরো ঘন হবে। স্বদেশী যুগ, সুভাষচন্দ্র, পঞ্চাশ-ষাটের রঙিন থিয়েটার রজনীর স্মৃতিদের কিছুতেই মুছতে দেবেন না কেষ্টকুমাররা। লক্ষ্মীনারায়ণ এন্ড সন্সের তেলেভাজার স্বাদ সেই ইতিহাসকে ছাড়া সম্ভবই না। অবশ্য, একশো বছর পার করে এই দোকান নিজেই এখন আস্ত একটা ইতিহাস।

Developed by DXDasia