কালীপুজোর দিনে উদ্বোধন বলে নাম ‘কালিকা’, যার চপে মজে আছে কলকাতা
চায়ের সঙ্গে তেলেভাজা মাস্ট। আর সেই তেলেভাজা যদি হয় ঐতিহ্যবাহী পুরোনো কলকাতার, তাহলে তো কথাই নেই। বাঙালির তেলেভাজা প্রীতির কথা কে না জানে! আর এই তেলেভাজাকে যিনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, সেই প্রতিষ্ঠানের নাম কালিকা। ডানদিকে মেডিকেল কলেজ, আর বাঁদিকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, এইভাবে যদি আপনি শিয়ালদার দিকে হাঁটা দেন, তাহলে কলেজস্ট্রিট ক্রস করে সূর্য সেন স্ট্রিটের দিকে সামান্য হাঁটা লাগালেই পড়বে কালিকার ছোট্ট দোকান। কালিকার ঠিক বিপরীতে কলেজ স্কোয়ার। ১৯৬৫ সালে কালীপুজোর দিন এই দোকানের যাত্রা শুরু হয়। নয় নয় করে প্রায় ৫৪ বছর অতিক্রান্ত হল। কালীপুজোর দিনে উদ্বোধন বলে নাম কালিকা। আজও যার সুনাম অক্ষুণ্ণ। আজও কলকাতার রসিকজনের মুখে মুখে ফেরে কালিকার তেলেভাজার সুনাম।


দোকানে গেলে দেখা যাবে সাইনবোর্ডে বড়ো বড়ো করে লেখা “রসনার তৃপ্তিতে কালিকা। বাংলার সুপ্রসিদ্ধ মুখরোচক তেলেভাজার দোকান”। এই দোকান সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ পালন করেছে ২০১৪ সালে। শ্রদ্ধেয় সুকুমার দত্ত কালিকার প্রতিষ্ঠাতা। শুরুতে গুটি কয়েক তেলেভাজা পাওয়া যেত। আলুর চপ, বেগুনি, ফুলুরি, মোচার চপ এই দিয়েই সূত্রপাত। এখন এই দোকানে কী না নেই! ডিমের চপ (১০/-), চিংড়ি চপ (১০/-), ফিশ রোল (৪০/-), মাংস চপ (১০/-), ভেজিটেবল চপ (১০/-), ডিমের ডেভিল (২০/-), ফিশ ফিঙ্গার (১০/-), ফিশ ফ্রাই (সি ফিশ) (৩০/-), ভেটকি মাছের চপ (১০/-), আমের চপ (১০/-), টম্যাটোর চপ (১০/-), ডায়মন্ড চিকেন (৫০/-), মটন কাটলেট (৩০/-), আরও কত কি। বাবা সুকুমার দত্ত মারা যাবার পর যুক্ত হয়েছেন তিন ভাই। তবে এই দোকান দাঁড় করানোর মূলে ছিলেন গৌর দত্ত এবং নিতাই দত্ত। বর্তমান মালিক বাবলু দত্তের দুই দাদা। বড় ভাই মারা গেছেন এবং মেজো ভাই বয়সের ভারে দোকানে আর আসতে পারেন না। দোকান সামলান এই বাবলুবাবু-ই। বাবলু দত্ত বারবার তাঁর বাবার কথা স্বীকার করেন। কথাবার্তায় বলে ওঠেন, বাবা বলতেন অল্প লাভে ভালো খাবার দিতে। এই রীতিই এখনও অব্যাহত আছে। কারণ এখনকার দিনে চিংড়ি চপ থেকে ভেটকি চপ কিংবা আমের সিজনে আমের চপ- ১০ টাকায় কোথাও পাবেন না। এমনকি কালিকার বেগুনির সাইজ দেখলে আপনি চমকে যাবেন। আরেকটি জিনিস বিশেষভাবে উল্লেখ্য। আজকের ভেজালের দিনে এঁরা বছরের পর বছর ফ্রেশ তেলে চপ ভেজে প্রতিদিন খুশি করে যাচ্ছেন আপামর ভোজন রসিকদের। আজ যে তেলে চপ ভাজা হচ্ছে, আগামীকাল সেই তেল আর ব্যবহার করা হবে না। প্যাকেট খুলে সম্পূর্ণ নতুন তেল ব্যবহার করার রীতি তাঁরা পালনীয় কর্তব্য বলে মনে করেন। এই দোকানের চপ খেলে অম্বল হবে না। বেশ গর্ব নিয়েই একথা জানিয়ে দেন বাবলুবাবু।

বাবলু দত্তের বয়স এখন প্রায় ৬৫ বছর। ভয় পান পরবর্তী জেনারেশন দোকান কীভাবে সামলাবে। নাহলে কর্মচারীদের হাতেই সব দায়িত্ব তুলে দেবেন। বাঙালি সবসময় তেলেভাজা প্রিয়। কলেজস্ট্রিট চত্বরে দোকান হওয়ার ফলে প্রতিদিন বিকেল-সন্ধেতে বইপোকারা ভিড় জমান। বিশেষ করে শীতকালে এখানে তিলধারণের জায়গা থাকে না। কলকাতার যে-কটি পুরোনো তেলেভাজার দোকান আছে তাদের সামনের সারিতে রয়েছে কালিকার নাম। শুধুমাত্র কলকাতা নয়, কলকাতায় আসা প্রচুর প্রবাসী বাঙালি কালিকার খোঁজ পেয়ে চলে আসেন। বারোমাস এইভাবে বাবলু দত্তের মতো কিছু বাঙালি ভোজন প্রিয়দের রসনাতৃপ্ত করে চলেছেন যুগ যুগ ধরে। তাদের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব কিন্তু আমাদেরই।
