
নবদ্বীপের ভক্তি আন্দোলনের ধারা এসে পড়ে পার্শ্ববর্তী শ্রীধাম শান্তিপুরে
শান্তিপুর শুধু মাত্র অদ্বৈতাচার্যের পুণ্যভূমি আর তাঁতবস্ত্রের জন্য বিখ্যাত নয় – শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতে অনেক বিখ্যাত মানুষের যেমন জন্ম ও কর্মভূমি। তেমনি পুরোনো এই শহরে আমরা দেশীয় রীতি আর ইসলামীয় স্থাপত্যের অনেক নিদর্শন ইতিউতি দেখতে পাই। এই পুরাকীর্তিগুলির কোনোটি সুরক্ষিত রয়েছে আবার কোনোটি বা প্রাচীন ইতিহাসকে সাক্ষী করে অন্তিম প্রহর গুনছে।

চালা মন্দির, দালান থেকে শুরু করে মিনার স্থাপত্যের সূচনার ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখি, তুর্কি বিজয়ের প্রায় দুই শতাব্দীর পর যখন ১৪৯৩-৯৪ খ্রিস্টাব্দে হুসেন শাহ বাংলার সর্বধিকর্তা হন, সেই সময় থেকে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটতে থাকে নতুন উদ্যমে। তার কিছু সময় পর নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যদেব যে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মান্দোলন সংঘটিত করেছিলেন, সেটাকে কেন্দ্র করে বাংলার সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্প, স্থাপত্যের অগ্রগতির বহর বাড়তে লাগলো। বৈষ্ণব ধর্মান্দোলন শুরু হলে বাংলার প্রচুর বিত্তবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিও তার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারলেন না। সমাজের সেই সম্ভ্রান্ত মানুষেরা তখন গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করলেন এবং মহাপ্রভুর তিরোধানের পর বাংলার অনেক স্থানে রাধাকৃষ্ণ ও গৌড়নিতাইয়ের মন্দির স্থাপন করলেন। সেগুলি প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্য যথা ‘রেখ’, ‘বেশর’, ‘দ্রাবিড়’ এই সমস্ত রীতি থেকে দূরে সরে গিয়ে বাংলার নিজস্ব স্থাপত্য রীতিতে গড়ে উঠতে লাগল। ফলস্বরূপ বাংলায় গঠিত মন্দিরগুলি বাংলাদেশের চির পরিচিত কুটির বা কুঁড়ে ঘরের আদর্শে দোচালা, চারচালা খড়ের ঘরের গঠনপ্রণালী অনুসরণ করে পাথরের ব্যবহারের পরিবর্তে চুন সুরকির দেশজ গাঁথনি-মশলায় ইটের উপর ইট তুলে নির্মিত করা হল দুচালা, চারচালা, রত্ন, দালান, নাটমন্দির প্রভৃতি। এই রীতিতে তৈরি মন্দিরগুলির ‘বাংলারীতি’ অভিধায় ভূষিত করা হল।

নবদ্বীপের ভক্তি আন্দোলনের ধারা এসে পড়ল পার্শ্ববর্তী অঞ্চল শ্রীধাম শান্তিপুরে। চৈতন্যদেব প্রবর্তিত এই বৈষ্ণবধর্ম শান্তিপুরে প্রভু শ্রীঅদ্বৈত আচার্যকে সামনে রেখে প্রভাব বিস্তার করেছিল। অদ্বৈত পরবর্তী সময়ে শান্তিপুরের গোস্বামীরা ব্রাহ্মণ্য কর্মকান্ডের সমর্থক হয়েও কৃষ্ণমন্ত্রেই গৌরাঙ্গকে সেবা করতেন। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যকে সেবা করবার উদ্দেশ্যে গোস্বামী, খাঁ-চৌধুরী প্রমুখেরা উপাসনার জন্য শান্তিপুরের নানা স্থানে মন্দির, মঠ, নাট মন্দির, দালান নির্মাণ করতে লাগলেন। যেগুলি বর্তমানকালেও অতীত ঐতিহ্যের ধারাকে বহন করে নিয়ে দণ্ডায়মান রয়েছে। সুদীর্ঘ সাড়ে তিনশো বছরের বেশি সময় ধরে বাংলার স্থাপত্যশৈলীর পুরানো রীতির ঐতিহ্য বহন করা সত্ত্বেও আজও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলি অবহেলিত ও লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে গেছে।

শান্তিপুরে বাংলার পুরাকীর্তির রীতি অনুসারে নির্মিত প্রচুর মন্দির রয়েছে। তার মধ্যে প্রাচীনতম আটচালা রীতিতে তৈরি মন্দিরের খোঁজ পাওয়া যায় শান্তিপুরের অনতিদূরে বাগআঁচড়ায়। ১৬৬৫ সালে আটচালা রীতিতে গঠিত মন্দিরটি তৈরি করেন বাগআঁচড়ার প্রতাপান্বিত জমিদার চাঁদ রায়। চাঁদ রায়ের নির্মিত মুখোমুখি চারটি আটচালা শিবমন্দিরের মধ্যে বর্তমানকালে একটি মন্দির অতীতের গৌরবের ক্ষীণ স্মৃতি বহন করে চলেছে। বর্তমানে মন্দিরটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের দিকে যদিও তার দীর্ঘ বঙ্গাক্ষরের প্রতিষ্ঠালিপি ফলকটি বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ প্রদর্শশালায় রক্ষিত আছে।

পশ্চিমবঙ্গের আটচালা রীতির যে সমস্ত বৃহৎ মন্দির রয়েছে সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বড়োবাজার সংলগ্ন শ্যামচাঁদ মোড়ের শ্যামচাঁদ মন্দির। পাঁচ-খিলান বিশিষ্ট, অলিন্দযুক্ত, দক্ষিণমুখী, ইটগাঁথা আটচালা এই মন্দিরটি অখণ্ড বাংলার মধ্যে বৃহত্তম। আনুমানিক ১৬৪৬ শকে খাঁ বংশের উত্তর পুরুষ রামগোপাল খাঁ শ্যামচাঁদ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। শ্যামচাঁদ বিগ্রহকে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের নামে এবং রাধিকা মূর্তিকে গুরু রাধাবল্লভ গোস্বামী বিদ্যাবাচষ্পতির নামে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। একটি বৃহৎ পুকুর খনন করে তার জল সেচন করে নিচের দিকে বড়ো আকারের চকোর কাঠ স্থাপন করে মন্দিরটির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পাদপীঠ উঁচু মন্দিরটির সামনের বাঁদিকে নাগালের উচ্চতার মধ্যে প্রথম খিলানের ঠিক নিচে মন্দিরফলকে পাথরে খোদাই করা সংস্কৃত অনুষ্টুপ ছন্দে লেখা –
“শ্রীমতঃ শ্যামচন্দ্রস্য মন্দিরঃ পূর্ণ তামিয়াৎ
বসুবেদর্তু শুভ্রাংশু সংখ্যায়া গণিতে শকে ১৬৪৮”
অর্থাৎ অঙ্কের বাঁ দিক থেকে গণনা করলে পায় বসু- ৮, বেদ-৪, ঋতু-৬ শুভ্রাংশু (চন্দ্র) – ১ অর্থাৎ ১৬৪৮ শকে, ১৭২৬ খ্রিস্টাব্দে শ্রীশ্রী শ্যামচাঁদ মন্দির নির্মিত হয়। কালীকৃষ্ণ ভট্টাচর্যের গ্রন্থ থেকে জানা যায়, মন্দির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে খাঁ-রা একটি বিরাট অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। যেখানে কাশী-কাঞ্চী-দ্রাবিড়-মথুরা, অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ প্রভৃতি স্থান থেকে পণ্ডিতরা এবং নদীয়ারাজ রঘুরামও শান্তিপুরে আগমন করেন। রঘুরাম খাঁ বাড়ির বিশাল সভায় মন্দির প্রতিষ্ঠার শীর্ষ স্থান অলংকৃত করেন এবং মহারাজের অভ্যর্থনায় সম্মান দক্ষিণা হিসাবে লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দান করেন। রাধা শ্যামচাঁদের বিগ্রহের চরণতলে শুধু রামগোপাল নয়, তাঁর তিন ভাই রামজীবন, রামভদ্র এবং রামচরণ তাদেরও নাম রয়েছে। বাংলার স্থাপত্যের গৌরব শ্যামচাঁদ মন্দিরটি বাইরের ভাগে দ্বিতল সমান্বিত, সামনের ভাগ সূচালো, কারুকার্যময়। মন্দিরটির উচ্চতা ১১০ ফুট, দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ৬৮ ফুট। সুউচ্চ চূড়া পাঁচটি, কলসি ও চক্রের চূড়া, সেখানে ত্রিশূল ও ধাতুনির্মিত পতাকা শোভামান। মন্দিরটিতে টেরাকোটার কাজ যৎসামান্য। খিলানের উপরের চারিদিকে বাংলা আটচালা শ্রেণির প্রতীক শিবালয় এবং তার মধ্যে শিবলিঙ্গ। উপরের কার্নিসের নিচে দুই প্রান্তে পোড়ামাটির পদ্মফুল এবং দু'পাশের উপরে নিচে সেই পদ্মফুল মন্দিরটির সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করেছে। খিলানের উপরের প্রস্থে পঙ্খের কারুকার্য দেখা যায়।
শান্তিপুরেরই হাটখোলাপাড়ায় শ্রী অদ্বৈতাচার্য্যের প্রপৌত্র ঘনশ্যাম গোস্বামী থেকে মধ্যম গোস্বামী বাড়ির উৎপত্তি এবং এখানে গোকুলচাঁদ মন্দির নামে দুইটি প্রতিষ্ঠালিপিহীন প্রাচীন পোড়ামাটির ভাস্কর্যযুক্ত ভিত্তিবেদীর উপর নির্মিত পূর্বমুখী আটচালা মন্দির আছে। গর্ভগৃহের সামনে তিনটি পত্রাকৃতি খিলানযুক্ত আবৃত অলিন্দ রয়েছে এবং থামগুলি বত্রিশ স্তর ইটের সমবায়ে তৈরি। মন্দিরের সামনের দেওয়ালে টেরাকোটার পৌরাণিক ও সামাজিক মূর্তি দেখা যায় যথা। পালকি, শিকার দৃশ্য, তিরন্দাজ ব্যাধ, পলায়নরত হরিণ, দশাবতার, কৃষ্ণলীলার বিভিন্ন দৃশ্য প্রভৃতি। মন্দিরটি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে ১৫ ফুট ও উচ্চতায় প্রায় ২৫ ফুট। মন্দিরের পূর্বমুখী আটচালা টেরাকোটা কারুকার্য সমৃদ্ধ এই দেবালয়টি শ্রীঅদ্বৈত চন্দ্রের মন্দির বলে খ্যাত। গর্ভগৃহের সামনে ত্রিখিলান যুক্ত আবৃত অলিন্দ। অনুমান করা হয়, মন্দিরটি ১৬৬২ শকাব্দে (১৭৪০ খ্রিঃ) স্থাপিত। বর্ধমান জেলার জামগ্রামের নন্দীদের পৃষ্ঠপোষকতায় মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল।

কাঁসারীপাড়ার রাম যদুনাথ ১৭৮৭ শকাব্দের ২০ আষাঢ় (১৮৬৫ খ্রিঃ) পূর্বমুখী মন্দির প্রাঙ্গনে পাদপীঠের উপর নির্মিত অলিন্দবিহীন, একদুয়ারি উত্তর ও দক্ষিণমুখী দুটি আটচালার শিবমন্দির এবং মাঝখানে একটি দালান মন্দির গঠন করেন। মন্দিরগর্ভে উত্তর দিকে যাদবেশ্বর ও দক্ষিণে কেশবেশ্বর নামের কষ্ঠিপাথরের দুটি বংশীধারী ও রাধিকার আকর্ষণীয় যুগলমূর্তি রয়েছে বৃহৎ শিবলিঙ্গর দুইটির মাঝখানে। মন্দিরের দেওয়ালের পোড়া মাটির মূর্তি ও প্রবেশপথের দুধারে ২২টি এবং উপরে ১২টি কুলঙ্গিত নিবন্ধ। দালান মন্দিরটি তিনটি প্রকোষ্ঠ রয়েছে আর মন্দিরটিতে পঙ্খের সুন্দর অলংকরণ দেখা যায়। এছাড়া চাঁদুনি পাড়ায় ক্ষুদ্র আকারের উত্তরমুখী একটি এবং সূত্রাগড়ের সেনপাড়ায় তিনটি আটচালা নির্মিত পোড়ামাটির অলংকরণে গ্রথিত ত্রিশিব মন্দিরও উল্লেখযোগ্য।

বাংলা রীতির মন্দিরের মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য রীতি হল চারচালা। জলেশ্বর শিবের মন্দির হল শান্তিপুরের চারচালা মন্দিরের মধ্যে সর্ববৃহৎ। বর্তমানে শান্তিপুরের পুরাণ পরিষদের দক্ষিণ দিকে (বেজ পাড়ায়) অবস্থিত মন্দিরটি পাদপীঠের উপর স্থাপিত দক্ষিণমুখী, অলিন্দবিহীন চারচালা মন্দির যার পূর্ব দিকেও একটি প্রবেশ পথ আছে। নদিয়ারাজ রুদ্ররায়ের কনিষ্ঠ পুত্র রামকৃষ্ণের জননী আঠারো শতকের প্রথম দিকে অথবা সপ্তদশ শতকের শেষভাগে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন বলে অনুমান করা হয়। এক সময় শিবলিঙ্গের নাম ছিল রুদ্রকান্ত, মতান্তরে রাঘবেশ্বর। কথিত আছে এক সময় কোনো এক অনাবৃষ্টির সময় সাধক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী বৃষ্টির জন্য শিবের মাথায় প্রচুর গঙ্গাজল ঢালার পর বেশ বৃষ্টি হয় তখন থেকে এই শিবের নাম হয় ‘জলেশ্বর’। জলেশ্বর মন্দিরটি আয়তনে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর ২১ ফুট ১০ ইঞ্চি উত্তর দক্ষিণে ২৪ ফুট ১০ ইঞ্চি, উচ্চতায় প্রায় ৪৫ ফুট এবং কালো পাথরের শিবলিঙ্গটির উচ্চতা প্রায় ৩ ফুট। মন্দিরটির দক্ষিণ ও পূর্ব দিকের প্রবেশদ্বার ঘিরে নানা রকমের পৌরাণিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে পোড়ামাটির মূর্তি ও সূক্ষ্ম নক্সা অলংকরণে যুক্ত, যথা কৃষ্ণলীলার বিভিন্ন দৃশ্য, ভীষ্মের শরশয্যা, রামায়ণের কাহিনি, বিষ্ণু, হরগৌরী, নারদ, তিরন্দাজ ব্যাধ, বর্ম পরিহিত যোদ্ধা, বণিক প্রভৃতি। বর্তমানে মন্দিরে নিত্যদিনের পূজা এবং চড়ক, গাজন, শিবরাত্রি, নীল – এই সমস্ত বাৎসরিক পূজাগুলিও মহাসমারোহে পালন করা হয়। শান্তিপুরের উত্তর দিকে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের কাছে দিগনগরে প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের চারচালা নির্মিত প্রাচীন রাঘবেশ্বর মন্দির (এখন রাজ্য সরকার রক্ষিত ও পুরাতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত) রয়েছে। মন্দিরের গায়ে অপূর্ব টেরাকোটার কাজ ক্রমশ নষ্ট হচ্ছে। মন্দির গায়ে খোদাই করা লেখা থেকে বোঝা যায় মন্দিরটি ১৫৯১ শকাব্দে প্রতিষ্ঠিত। কৃষ্ণনগরের রাজা রাঘবচন্দ্র রায় ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। চারচালা এই মন্দিরটির ভেতরে আছে বড়ো একটা কষ্ঠিপাথরের শিবলিঙ্গ। মন্দিরে বাইরের গায়ে দেখতে পাওয়া যায় পোড়ামাটি তৈরি টেরাকোটার অসামান্য কাজ। টেরাকোটার কাজগুলি প্রধানত পশ্চিম ও দক্ষিণ দেওয়ালে উৎকীর্ণ। পূর্বের দেওয়ালে কিছু পোড়ামাটির পদ্ম ছাড়া কিছুই বিশেষ নেই। ভিত্তিবেদীর সংলগ্ন দুটি অনুভূমিক সারিতে পালকিবাহিত বাবু, অশ্বরোহী শিকারি, হাতি ও উটের পিঠে সওয়ার, মিথুনদৃশ্য প্রভৃতি সামাজিক চিত্র রয়েছে। তার উপরের সারিতে একটানা হংসপংক্তি রয়েছে। মন্দিরটির প্রবেশ পথের উপরে ও দুপাশে কুলঙ্গিতে নিবদ্ধ দুই সারি মূর্তির মধ্যে দশাবতার, কৃষ্ণলীলার বিভিন্ন দৃশ্য প্রভৃতি রয়েছে এবং তাঁদের দুই পাশে দেওয়ালের প্রান্ত অবধি বিন্যস্ত রাম, বলরাম, বৃষবাহন, শিব, প্রহরী, সন্ন্যাসী প্রভৃতি নানারকম মূর্তি। রাঘবেশ্বর মন্দিরটি পশ্চিমমুখী এবং দৈঘ্যে প্রস্থে ১৯ ফুট ১০ ইঞ্চি ও উচ্চতায় প্রায় ৩০ ফুট। মন্দিরটি দীর্ঘদিন কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির অধীনে ছিলো। বর্তমানে রাজবাড়ি থেকে নিযুক্ত পুরোহিতরা বংশ পরম্পরায় এই মন্দিরের শিবলিঙ্গের নিত্যদিন পূজা পাঠ করেন। শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দিগনগরের বেশিরভাগ মানুষ শান্তিপুরের গঙ্গায় পায়ে হেটে এসে গঙ্গাজল নিয়ে শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢালে এবং সেই সময় স্থানটি মেলার আকার ধারণ করে।

মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ধর্মপরায়ণ ফৌজদার গাজি মহম্মদ ইয়ার খাঁ শান্তিপুরে তোপখানা মসজিদ স্থাপন করেন। পূর্বমুখী এই ইমারতের সামনের দিকে ত্রি-খিলান প্রবেশপথের আরবি ও ফারসি হরফে পাশাপাশি তিনটি প্রস্তরফলকে খোদিত আছে –
(আরবি)
হু আল্লাহ বাদা বিস্মিল্লা আর্রহমান আর্রহিম হু আল্লহ কব্লা
কুল্লাশাইন লা ইলাহা ইল্লালাহো মহম্মদ রসুল আল্লা কুল্লাশাইন
(ফারসি)
চেরাগ ও মসজেদ ও মেহরাব ও মিম্বর
আবিবকর ও উমর ও উসমান ও হায়দার
বেহাদ্দে শাহানশাহে আওরঙ্গজিব
বেনা করদাহ্ মসজেদ ও সদকে ও হাসিব
সজ্ ও পাঞ্চদা সাল বেশ আজ হাজার
উপরের লেখা থেকে জানা যায় আওরাঙ্গজেবের রাজত্বকালে ১১১৫ হিজরি অর্থাৎ ১৭০৩-০৪ খ্রিস্টাব্দে ভিত্তিবেদীর উপর স্থাপিত একটি বড়ো গম্বুজ ও মোট আটটি ছোটো বড়ো মিনার সমম্বয়ে মসজিদ তৈরি হয়। সেই সময় বাংলার সুবাদার ছিলেন আওরঙ্গজেবের পৌত্র সুলতান আজিম-উস-শান। আকবরের আমলে শান্তিপুরের সূত্রাগড়ে এক সেনানিবাস স্থাপিত হয়। আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে সৈয়দ মহবুব আলম (মতান্তরে সৈয়দ হজরত শাহ) বাগদাদ থেকে শান্তিপুরে আসেন। তিনি স্থানীয় সৈয়দ (খোন্দকার) বংশের আদি পুরুষ এবং তিনি বাদশাহের গুরু ছিলেন। স্থানীয় সৈন্যনিবাসে ১৩০০ পাঠান ও ৯০০ রাজপুত সৈন্য থাকত। তাদের ব্যয়নির্বহের জন্য সৈয়দ আলমকে বাদশাহ প্রচুর ভূসম্পত্তি দান করেন এবং তাঁরই আদেশে সেনা নিবাসের ফৌজদার ইয়ার খাঁ এই মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটির কাছে মোবারক গাজি সাহেবের আস্তানার জন্য জায়গাটার নাম হয় পিরের হাট যা এখনও বর্তমান।
এছাড়াও শান্তিপুরে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে রজনীকান্ত মৈত্র প্রতিষ্ঠিত পঞ্চরত্নের শিব মন্দির, সূত্রাগড় অঞ্চলে কার্ত্তিকচন্দ্র দাসের ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত সামনে নাটমন্দির সমম্বিত চারচালার উপরে একরত্ন গনেশ মন্দির, কে সি দাস রোডে একটি চারচালা ও দুটি আটচালা মন্দির, সূত্রাগড়ের সেন পাড়ায় ভগ্নপ্রায় আটচালার ত্রিশিব মন্দির, কাশ্যপাড়ায় ডাকঘরের পাশে দুটি আটচালা শিবমন্দির, শান্তমুনি প্রতিষ্ঠিত বুড়ো শিবমন্দির, সুদৃশ্য শরিফ মসজিদ, নতুন মসজিদ, ডাকঘর মসজিদ, মণ্ডল মসজিদ, পঞ্চরত্ন রোডে পাঁচ রত্ন বিশিষ্ট মন্দির, অদ্বৈত পাট, ব্রাহ্ম সমাজের দালান, এছাড়াও প্রায় ৩৫টি বিগ্রহবাড়ি ছাড়াও নানা স্থানে প্রাচীন স্থাপত্যরীতি নিয়ে এক ঐতিহ্যময় তীর্থক্ষেত্র এবং পূণ্যভূমিরূপে দন্ডায়মান রয়েছে। প্রাচীন জনপদ শান্তিপুরে পুরাকীর্তির এত প্রাচুর্য এবং বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও শহরটি পর্যটন মানচিত্রে অনেকটা ব্রাত্য থেকে গেছে।
________________
ছবি: বিশ্বনাথ মুখার্জি। ঋণ: নদীয়া জেলার পুরাকীর্তি/ মোহিত রায়
