দেশের অন্যতম সেরা গবেষণা কেন্দ্র স্যার যদুনাথ সরকারের কলকাতার বাসভবন

যদুনাথ সরকার রিসোর্স সেন্টার ফর হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ

প্রখ্যাত বাঙালি ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার ১৯৩৮ সালে ল্যান্স ডাউন রোডের কাছে একটি বাড়ি তৈরি করেন। পরে, ১৯৪৩-এ সেই রাস্তার নাম বদলে হয়- লেক টেরেস এবং সেই থেকে যদুনাথবাবুর বাড়ির ঠিকানা হয় ‘১০ লেক টেরেস’। এই বাড়িতেই তাঁর জীবনের শেষ দু’দশক কাটিয়েছেন। এই বাড়িরই নিচের তলার একটি ঘরে, ১৯৫৮ সালে ১৯ মে বই পড়তে পড়তে চিরনিদ্রায় চলে যান আচার্য যদুনাথ সরকার। ১৯৬০ অবধি তাঁর পরিবার সেখানেই থাকতো। তাঁর স্ত্রী, লেডি কাদম্বিনী একটি উইল করে বলে যান, তাঁর মৃত্যুর পরই এই বাড়ি বিক্রি সম্ভব হবে এবং বিক্রির অর্থ কোনও না কোনও হাসপাতালে দান করা বাঞ্ছনীয়।

১৯৭৩ সালে ভারত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রকের অধীনে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ (ICSSR) স্থাপিত হলে,  সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক জে পি নায়েক লেডি কাদম্বিনীর উইলের ট্রাস্টিদের সঙ্গে আলোচনা করে আইসিএসএসআর, নয়াদিল্লির জন্য সম্পত্তি অধিগ্রহণ করেন। সম্পত্তি বিক্রির অর্থ যাদবপুরের টিবি হাসপাতালে দান করা হয়। ‘৭৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ICSSR প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই এর তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রাথমিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি কলকাতার ‘সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্স’ (CSSSC) যদুনাথ সরকারের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভাড়া নেয় এবং পরবর্তীতে কিনে নেয়।

প্রদর্শশালা ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ

যদুনাথ সরকারের বাসভবনটিকে প্রদর্শশালা ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে উপযুক্ত করে তোলার জন্য ‘সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্স’ প্রায় ২৭ বছর ধরে সেখানেই ছিল। ১৯৭৩-এর জুলাই মাসে ‘সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্স’  যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন অধ্যাপক বরুন দে (এটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক), সুশান্ত ঘোষ (রেজিস্ট্রার), অরুণ ঘোষ (গ্রন্থাগারিক) অনুষদের ১৭ জন সদস্য সহ ৩০ জন প্রশাসনিক কর্মী এখানে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আরও কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা ও আন্তঃ-শৃঙ্খলা অধ্যয়নের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এর লাইব্রেরিটি শহরের অন্যতম সেরা কিছু বই এবং সামাজিক বিজ্ঞানের সাময়িক সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল। ‘সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্স’ আয়োজিত বিভিন্ন সেমিনার এবং বক্তৃতাগুলি আলোচনা ও সমালোচনার মাধ্যমে সমানভাবে সুপরিচিত হয়েছে। এবং এই বাড়িতেই, ১৯৭৮ সাল থেকে কেন্দ্রটি অ্যাডভান্সড গবেষণা প্রশিক্ষণ কর্মসূচী তৈরি করে, যা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান এম.ফিল-এর অগ্রদূত হয়ে ওঠে। এই সময়ই এই প্রতিষ্ঠান থেকে জাভেদ আলম, অমিয় কুমার বাগচী, নির্মলা ব্যানার্জি, গৌতম ভদ্র, দীপেশ চক্রবর্তী, পার্থ চ্যাটার্জি, অমিতাভ ঘোষ, অমলেন্দু গুহ, রামচন্দ্র গুহ, তপতী গুহ ঠাকুরতা, এন. কৃষ্ণজি, নীতা কুমার, সুগত মার্জিত, রুদ্রাংশু মুখার্জি, জ্ঞানেন্দ্র পান্ডে, এম.এস.এস. পান্ডিয়ান, মাধব প্রসাদ, রণবীর সমাদ্দার, হিতেসরঞ্জন সান্যাল, অশোক সেন এবং সুরজিৎ সিনহা -এঁদের মতো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনকারী পণ্ডিত ব্যক্তিদের জন্ম দিয়েছে। অনুষদ, ছাত্র এবং প্রশাসনিক কর্মীদের যৌথবদ্ধ প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটি তাত্ত্বিক এবং অভিজ্ঞতামূলক বৃত্তির সমালোচনামূলক ক্ষেত্র উন্মুক্ত করেছে।

যদুনাথ সরকারের বাসভবনের একটি স্কেচ

যদুনাথ সরকার রিসোর্স সেন্টার ফর হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ (JSRC)

২০০০ সালে ‘সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্স’ (CSSS) যদুনাথ সরকারের বাড়িটি ছেড়ে পাটুলিতে নতুন ক্যাম্পাসে চলে আসে। ১০ লেক টেরেস-এর বাড়িটি ঐতিহাসিক গবেষণার জন্য একটি রিসোর্স সেন্টার বা সম্পদ কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার জন্য কিছু বদল আনা হয়েছিল। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে ভার্নাকুলার ইতিহাসের উপর তিন দিনের আন্তর্জাতিক সেমিনারের মাধ্যমে উদ্বোধন করা হয় ‘যদুনাথ সরকার রিসোর্স সেন্টার ফর হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ’ (JSRC)।  

যদুনাথ সরকারের বাসভবন

JSRC-এর গ্রন্থাগারে বহু পণ্ডিত ব্যক্তিও তাঁদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ দান করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, এডওয়ার্ড ডিমক, হিতেশরঞ্জন সান্যাল, অরুণ কুমার দাশগুপ্ত, সুকুমার মিত্র, অমলেস ত্রিপাঠী, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বুদ্ধদেব বসু, নরেশ গুহ, তপন রায়চৌধুরী, সুমন্ত ব্যানার্জি প্রমুখ।

পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাস সংরক্ষণাগার নির্মাণের কেন্দ্র হিসেবে ফোর্ড ফাউন্ডেশন প্রকল্পের একটি অংশ ছিল এটি। ‘সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্স’-এর লাইব্রেরি থেকে বাংলা, অসমীয়া, ওড়িয়া, হিন্দি এবং উর্দু বই ও সংবাদপত্র সংগ্রহ করে বাড়িটির দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তলা জুড়ে গড়ে ওঠে ‘যদুনাথ সরকার রিসোর্স সেন্টার ফর হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ’-এর পাঠাগার-আর্কাইভ। JSRC-এর গ্রন্থাগারে বহু পণ্ডিত ব্যক্তিও তাঁদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ দান করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, এডওয়ার্ড ডিমক, হিতেশরঞ্জন সান্যাল, অরুণ কুমার দাশগুপ্ত, সুকুমার মিত্র, অমলেস ত্রিপাঠী, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বুদ্ধদেব বসু, নরেশ গুহ, তপন রায়চৌধুরী, সুমন্ত ব্যানার্জি প্রমুখ। তাঁদের দান করা বই, ফটোগ্রাফ এবং অন্যান্য মুদ্রণ সামগ্রী এই গবেষণা কেন্দ্রটিকে ঋদ্ধ করেছে। অশোক মিত্রের যাবতীয় বইও এই লাইব্রেরির অংশ।

লাইব্রেরি

প্রদর্শশালা

২০০৪ থেকে ২০১২-এর মধ্যের সময়কালে ভবনটি সংস্কারের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল। ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পুনরায় উদ্বোধন করা হয় ‘যদুনাথ সরকার রিসোর্স সেন্টার ফর হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ’ (JSRC)। এই গবেষণা কেন্দ্রের আর্কাইভগুলি ১৯ শতকের মাঝামাঝি থেকে ২০ শতকের শেষার্ধ পর্যন্ত পাঠ্য ও ভিজ্যুয়ালগুলির ডিজিটাল এবং অ্যানালগ উপাদান নিয়ে গঠিত, যা বেশিরভাগই বাংলা এবং পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদুনাথ সরকার এবং রাধাপ্রসাদ গুপ্ত গ্যালারি রয়েছে এখানে। আর্কাইভ করা রয়েছে সিদ্ধার্থ ঘোষ, দেবলীনা মজুমদার, পরিমল রায়, চিত্রবাণীর অমূল্য সব নথি।  

যদুনাথ সরকার গ্যালারি ১

যদুনাথ সরকার গ্যালারি ২

এখানকার পুরোনো সাময়িকী, সংবাদপত্র, ফটোগ্রাফ, পেন্টিং, প্রিন্ট, পোস্টার, বিজ্ঞাপন এবং বাণিজ্যিক শিল্পের বিশাল সংগ্রহ ধরাছোঁয়ায় আনার জন্য সবসময়ই পড়ুয়া, গবেষকদের উত্সাহিত করেছে। অমৃত বাজার পত্রিকা (১৮৭০-১৯৪৯) এবং যুগান্তর (১৯৩৭-১৯৮০) Jadunath Bhavan Museum and Resource Centre-এর ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত যে কোনো গবেষক এই সংরক্ষণাগার অ্যাক্সেস করতে পারেন। আর্কাইভের নীতি হল যে উপাদানগুলি অ্যাক্সেস করা হচ্ছে তা শুধুমাত্র একাডেমিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, কোনও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়। তবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে কপিরাইটহীন পাঠ্য এবং ভিজ্যুয়াল উপাদান প্রয়োজনীয় অর্থের বিনিময়ে বাণিজ্যিক প্রকাশনার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। তার জন্য প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করে গবেষণার যাবতীয় নথি, প্রমাণপত্র সহ আবেদন জানাতে হবে।  

১৯১৫ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে ইতিহাস-শাখার সভাপতির অভিভাষণে যদুনাথ সরকার বলেছিলেন ‘‘সত্য প্রিয়ই হউক, আর অপ্রিয়ই হউক, সাধারণের গৃহীত হউক আর প্রচলিত মতের বিরোধী হউক, তাহা ভাবিব না। আমার স্বদেশগৌরবকে আঘাত করুক আর না করুক, তাহাতে ভ্রূক্ষেপ করিব না। সত্য প্রচার করিবার জন্য, সমাজের বা বন্ধুবর্গের মধ্যে উপহাস ও গঞ্জনা সহিতে হয়, সহিব। কিন্তু তবুও সত্যকে খুঁজিব, গ্রহণ করিব। ইহাই ঐতিহাসিকের প্রতিজ্ঞা।” এই উক্তির সারমর্ম আজও অনুরণিত হয় দেশের অন্যতম সেরা গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে তাঁর কলকাতার বাসভবনে।

_______________

তথ্যসূত্র ও ছবি: jbmrc.cssscal.org

Post Tags
Developed by DXDasia