বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে রমেশ ভবনে এক সভার আয়োজন করা হয়েছে আজ
সাধারণ মানুষের কাছে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর মূল পরিচয়—একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। যে ক’টি প্রতিষ্ঠান ব্যতিরেকে বাঙালি সারস্বত-চর্চার কথা ভাবা যায় না, তারই অন্যতম এটি। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ তার জন্মলগ্ন থেকেই বিবিধ বিশিষ্টের চিন্তাধারায় সমৃদ্ধ হয়েছে, পথ দেখিয়েছে বঙ্গবিদ্যাচর্চাকে। যদিও আমরা এর খোঁজ রাখি না আর। যদুনাথ সরকার ঋণস্বীকারের ভঙ্গিতে তাঁর শিষ্য-সহকর্মী ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, “আজ যে পরিষদের পুস্তাকাগার কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির পরই সর্বশ্রেষ্ঠ গবেষণা-সহায়ক কেন্দ্র হইয়াছে—শুধু বাঙ্গলা গ্রন্থ নহে, ইংরেজি ও অন্য কোও কোনও ভাষার উৎকৃষ্ট গ্রন্থে—তাহা ব্রজেন্দ্রনাথের গৃহিণীপনার ফল।”
যখন যখন আত্ম-আবিষ্কারের প্রয়োজন পড়ে, প্রায় সব জাতির মধ্যেই রেনেসাঁস বা নবজাগরণের এক বিশিষ্ট চরিত্রলক্ষণ ফুটে ওঠে। বাংলার নবজাগরণও তার ব্যতিক্রম নয়। উনিশ শতকের একেবারে শেষের দিকে, তার মাত্র বছর আষ্টেক আগে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ভূমিষ্ঠ হয়েছে, ও দিকে কার্জনের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হতে বারো বছর দেরি। বাঙালির জাতীয়তাবাদী আবেগ এই সময়েই আস্তে আস্তে দানা বাঁধছিল। যা কিছু বাংলার, যা কিছু বাঙালির, তাকে নিয়ে গর্ব করার প্রয়োজন তৈরি হচ্ছিল। বাঙালির সাহিত্য, বাঙালির সংস্কৃতি নিয়ে চর্চার জন্য একটা মঞ্চ দরকার, এ কথা অনেকেই ভাবছিলেন। শোভাবাজার রাজপরিবারের বিনয়কৃষ্ণ দেবের পৃষ্ঠপোষণায় ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুলাই তাঁর বাড়িতেই প্রথম গড়ে ওঠে ‘বেঙ্গল অ্যাকাডেমি অফ লিটারেচার’। সভাপতি হন বিনয়কৃষ্ণই। এক দিকে ইংরেজি, অন্য দিকে সংস্কৃত সাহিত্যের সাহায্য নিয়ে বাংলা সাহিত্যের উন্নতিই এই সভার উদ্দেশ্য ছিল। সভার কার্যবিবরণী ইংরেজিতে লেখা হত, সভার মুখপত্রেও অধিকাংশ লেখাই থাকত ইংরেজিতে। কিন্তু বাংলা-সাহিত্য চর্চার এই প্রতিষ্ঠানের কাজে ইংরেজি-বহুলতা দেখে অনেকেই আপত্তি তোলেন। তখন উমেশচন্দ্র বটব্যালের প্রস্তাব মেনে সভার নাম বদল করা হয়।
‘বেঙ্গল অ্যাকাডেমি অফ লিটারেচার’ শুরুর ছয় মাসের মাথায় উমেশ্চন্দ্র বটব্যাল অসন্তোষ প্রকাশ করলেন, “অপর ভাষায় দেশের লোকের কাছে আত্মপরিচয় দিয়া বেড়াইতে লজ্জাবোধ হয়।” অনেকেই তাঁকে সমর্থন জানালেন। বছর ঘোরার আগেই ১৭ বৈশাখ ১৩০১-এ নাম বদল করে নাম রাখা হল ‘বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ’। সভাপতি হন রমেশচন্দ্র দত্ত, সহ-সভাপতি নবীনচন্দ্র সেন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সম্পাদক এল লিওটার্ড। রাজনারায়ণ বসু দাবি জানালেন, পরিষদের সব আলোচনা হবে বাংলা ভাষায়, প্রতিবেদন লেখা হবে বাংলায়। এমনকি বাংলায় আলোচনা চলাকালীন কেউ ইংরেজি ব্যবহার করলে তাঁকে শব্দ পিছু এক পয়সা করে জরিমানা দিতে হবে।

বছর পাঁচেকের মধ্যেই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের সদস্য এবং তাঁদের অনুগামী গোষ্ঠীর প্রাধান্য বাড়তে থাকে। ১৩০৬ বঙ্গাব্দে পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৩৫০-র মতো, সভাপতি তখন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ এবং আরও অনেকে চাপ দেন যাতে পরিষদের কার্যালয় বিনয়কৃষ্ণের বাড়ি থেকে অন্য কোনও ‘সাধারণ প্রকাশ্য স্থানে’ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সভায় মতভেদ হয় এবং অনেকে বেরিয়ে চলে যান। শেষে উপস্থিত সদস্যদের ভোটে কার্যালয় সরানোর সিদ্ধান্তই বহাল থাকে এবং এর পরই পরিষৎ উঠে যায় ভাড়া বাড়িতে, আজকের টাউন স্কুলের উত্তরে। অন্য দিকে বিনয়কৃষ্ণের বাড়িতে গড়ে ওঠে ‘সাহিত্য সভা’।
বাংলা মুদ্রণের আদি পর্বের বই ও পত্রপত্রিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগ্রহ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গ্রন্থাগার। বাংলা হরফে প্রথম ছাপা বই হলহেডের বাংলা ব্যাকরণ, প্রথম সচিত্র বাংলা বই ‘অন্নদামঙ্গল’ সহ প্রথম যুগের বহু দুর্লভ সচিত্র বই, শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত বাংলা বই ও পত্রিকা এই সংগ্রহের সম্পদ।
কাশিমবাজারের মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর আনুকূল্যে পরিষদের নিজস্ব বাড়ি তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয় ১৯০১-এ। আজকের ২৪৩/১ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড, সে কালের আপার সার্কুলার রোডের উপর হালসিবাগানে সাত কাঠা জমি পরিষৎকে দান করেন মনীন্দ্রচন্দ্র। চাঁদা তোলা হয় বাড়ি তৈরির জন্য, মোট ২৭ হাজার টাকা খরচের মধ্যে দোতলা তৈরির পুরো দশ হাজার টাকাই দেন লালগোলার মহারাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ রায়। মুর্শিদাবাদেরই শ্রীনাথ পাল দেন আড়াই হাজার বর্গফুট মার্বেল! ১৯০৮-এর ডিসেম্বরে পরিষৎ নিজস্ব বাড়িতে উঠে আসে, গৃহপ্রবেশের দিন সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল আশ্চর্য উন্মাদনা। সমসাময়িক বর্ণনা থেকে জানা যায়, ভিড়ের জন্য দোতলা আর একতলায় দু’টো আলাদা সভা করতে হয়েছিল। বাড়ির ছাদের সামনে পেডিমেন্টটা ছিল মন্দিরের মতো, তাই বহু দিন পর্যন্ত একে পরিষৎ-মন্দির বলে উল্লেখ করা হত। মাঝে কোনও সময় এটি ভেঙে গিয়েছিল, কয়েক বছর আগে সরকারি অর্থানুকূল্যে এবং স্থপতি অরুণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় আবার তাকে যথাসম্ভব আগের চেহারায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি এখন পুরসভার ঐতিহ্যবাহী ভবনের তালিকায় প্রথম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। অথচ এই ভবনের শতবর্ষ উদযাপনের দিন উপস্থিতি ছিল হাতে গোনা কয়েকজনের। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তুঙ্গ সময়ে গড়ে ওঠা এই ভবন এক সময় বাঙালির নিজস্ব গৌরবের ‘আইকন’ হয়ে উঠেছিল। সূচনা থেকে আমৃত্যু রবীন্দ্রনাথ নানা ভাবে এর সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, শিবনাথ শাস্ত্রী, যদুনাথ সরকার, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, বিধুশেখর শাস্ত্রী, উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, প্রমথ চৌধুরী, যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, রাজশেখর বসু, চিন্তাহরণ চক্রবর্তী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সজনীকান্ত দাস, মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, বিনয়কুমার সরকার, সুকুমার সেন, নির্মলকুমার বসু, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়— গত শতাধিক বছরের বাঙালি মনীষার একটা বড়ো অংশই কোনও না কোনও ভাবে এই প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করেছেন। নামগুলি দেখলেই বোঝা যায়, এখন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ যে শুধু একটি গ্রন্থাগার হিসেবে পরিচিত, তা তার আসল পরিচয় নয়।
এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, বাংলা মুদ্রণের আদি পর্বের বই ও পত্রপত্রিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগ্রহ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গ্রন্থাগার। বাংলা হরফে প্রথম ছাপা বই হলহেডের বাংলা ব্যাকরণ, প্রথম সচিত্র বাংলা বই ‘অন্নদামঙ্গল’ সহ প্রথম যুগের বহু দুর্লভ সচিত্র বই, শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত বাংলা বই ও পত্রিকা এই সংগ্রহের সম্পদ। লক্ষাধিক বই ও পত্রপত্রিকার মধ্যে উনিশ শতকের বাংলা পত্রপত্রিকার এত বড়ো সংগ্রহও আর নেই বললেই চলে। শুধু সাধারণ সংগ্রহই নয়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নিজের লাইব্রেরির অধিকাংশ বইই এখন সাহিত্য পরিষদে ঠাঁই পেয়েছে।
গ্রন্থসংগ্রহের পাশাপাশি আরও অনেক কিছু পরিষদে আছে যা ততটা আলোচিত নয়। ১৯০৮-এ নিজস্ব ভবন তৈরির পর থেকেই বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের উদ্যোগও পরিষৎ-কর্তৃপক্ষের মনে একই ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
শুধু বিদ্যাসাগরই নয়, রমেশচন্দ্র দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, ঋতেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এবং আরও অনেকের সংগ্রহ রয়েছে পরিষদে, আছে বিখ্যাত সাবিত্রী লাইব্রেরির দুর্লভ বইপত্রও। খেয়াল করার বিষয়, এই সব সংগ্রহে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি বইয়ের সংখ্যাও প্রচুর। বস্তুত বিদ্যাসাগর-রমেশচন্দ্র-রামেন্দ্রসুন্দর সংগ্রহের অধিকাংশই ইংরেজি, আর তার মধ্যে রয়েছে বহু দুষ্প্রাপ্য বই। পরেও যতীন পাল সংগ্রহের মতো মূলত ইংরেজি বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহও এসেছে পরিষদে, যার মধ্যে আছে সতেরো শতকে ছাপা মানচিত্রকর জন ওগিলবি-র ‘এশিয়া/ ইন্ডিয়া অ্যান্ড পারসিয়া’ বইটি, যেটি এশিয়াটিক সোসাইটি কয়েক বছর আগে পুনর্মুদ্রণ করেছে। জেমস রেনেল-এর ‘বেঙ্গল অ্যাটলাস’-এর মতো বাংলার মানচিত্রের দুর্লভ বইটিও পরিষৎ সংগ্রহে আছে। আবার বই ছাড়াও পুথির সংগ্রহও কম নয়। বাংলা ভাষার প্রথম সাহিত্যকীর্তি ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ (এর একটিমাত্র পুথিই বসন্তরঞ্জন রায় খুঁজে পেয়েছিলেন এক গোয়ালঘরের মাচা থেকে!) ছাড়াও বহু বাংলা, সংস্কৃত, এমনকী ওড়িয়া, অসমীয়া ও তিব্বতি পুথিও পরিষদে আছে, যার মোট সংখ্যা হাজার দশেক।
কিন্তু এমন গ্রন্থসংগ্রহের পাশাপাশি আরও অনেক কিছু পরিষদে আছে যা ততটা আলোচিত নয়। ১৯০৮-এ নিজস্ব ভবন তৈরির পর থেকেই বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের উদ্যোগও পরিষৎ-কর্তৃপক্ষের মনে একই ভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধান ভূমিকা নেন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহের ক্ষেত্রে। ভারতীয় জাদুঘর থাকা সত্ত্বেও সেখানে আলাদা করে বাংলার ইতিহাস গুরুত্ব পাবে না বলেই তাঁরা এ ব্যাপারে উদ্যোগী হন। বাংলার পাল ও সেন যুগের প্রাচীন ভাস্কর্য, কুষাণ ও গুপ্ত যুগের স্বর্ণমুদ্রা ও অন্যান্য মুদ্রা, টেরাকোটা-ফলক, ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য নিয়ে গড়ে ওঠে বাংলার অন্যতম সেরা সংগ্রহশালা। এমনকী তামার পাতে খোদাই করে জমি দান করার যে সব দলিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা আকর, তেমন ছ’খানা তাম্রশাসনও রাখা আছে পরিষৎ সংগ্রহশালায়। আবার বাঙালি মনীষীদের স্মৃতিরক্ষাও সমান গুরুত্ব পেয়েছিল পরিষদে, তাই মনীষীদের স্মৃতিচিহ্ন, পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্রের বিপুল সংগ্রহও গড়ে ওঠে এখানে। স্থাপন করা হয় বিখ্যাত দেশি-বিদেশি ভাস্করের তৈরি করা মূর্তি, শিল্পীদের আঁকা অজস্র প্রতিকৃতি-তৈলচিত্র। এখানে সংগৃহীত তৈলচিত্র ও প্রাচীন আলোকচিত্রগুলি নিয়ে অনায়াসে গড়ে তোলা যায় একটি চিত্রবীথি। বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, গিরিশচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র, ভগিনী নিবেদিতা, তারাশঙ্কর, নির্মলকুমার বসুর মতো ব্যক্তিত্বের পাণ্ডুলিপি ও চিঠিপত্রের সম্ভার এখানে গবেষকদের জন্য অপেক্ষমান।সংগ্রহশালার শতবর্ষ উপলক্ষে নতুন প্রদর্শকক্ষ তৈরি হয়েছে, নতুন করে তৈরি হয়েছে সাহিত্যিক স্মারক কক্ষও। সংগ্রহশালায় সংযোজিত হয়েছে দু’টি নতুন গ্যালারি। একটি বাংলার লোকায়ত শিল্প, অন্যটি বাঙালির দৈনন্দিনের শিল্প। লোকশিল্পের নমুনাগুলি সাজানো হয়েছে মূলত জেলা ধরে, কোথাও বিষয় অনুযায়ী। আর দৈনন্দিনের ব্যবহার্য নানা উপকরণে যে শিল্পের প্রকাশ, পূর্ব ভারতে আর কোনও সংগ্রহশালায় তা এ ভাবে সংরক্ষিত হয়নি। থালা, গ্লাস, বাটি, হাঁড়ি, কলসি, পানের সাজ, হুঁকো কলকে, বাজনাবাদ্যি, রান্নাবান্না ও পুজোর উপকরণ, মিষ্টির ছাঁচ সবই আছে এখানে। এখানেই রাখা আছে বিহারীলাল চক্রবর্তীর জন্য কাদম্বরী দেবীর হাতে বোনা ‘সাধের আসন’। শুরু হয়েছে পাণ্ডুলিপি ও নথিপত্র তালিকাকরণ, সংরক্ষণের কাজ।
‘শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন’-এর পুথিপরিষদের আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র প্রকাশনা। ১২০ বছর ধরে সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা-র প্রকাশ যেমন অব্যাহত, তেমনই আছে বহু মূল্যবান বই। ‘বৌদ্ধগান ও দোহা’, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন’, ‘সংবাদপত্রে সেকালের কথা’, ‘বাংলা সাময়িকপত্র’, ২৪ খণ্ড ‘সাহিত্য সাধক চরিতমালা’, ৫ খণ্ড ‘ভারতকোষ’-এর মতো ক্লাসিক ছাড়াও সম্প্রতি শুরু হয়েছে দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থমালার প্রকাশ। সংগ্রহশালা প্রকাশনায় আছে নির্মলকুমার বসুর ‘ভারতের গ্রামজীবন’, হীরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘বাংলার লোকউৎসব ও লোকশিল্প’, ‘পশ্চিমবঙ্গের মন্দির টেরাকোটা’, ‘বাংলা গ্রন্থচিত্রণের আদিপর্ব’, ‘দুর্গা: বাংলার ঐতিহ্যে’, ইত্যাদি।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গ্রন্থাগারের অভ্যন্তর
নানা কারণে পরিষদের অগ্রগতি অনেক দিন শ্লথ হয়ে পড়েছিল, গত এক দশকে আবার অনেকটা সক্রিয়তা ফিরে এসেছে। ভবন দু’টি আমূল সংস্কার করা হয়েছে, পাঠক-গবেষকরা নিয়মিত আসছেন, ডিজিটাইজ করা দুর্লভ বইপত্র কম্পিউটারের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে, সংরক্ষণের কাজ চলছে পুরোদমে, নতুন নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে, আলোচনা সভা আয়োজিত হচ্ছে, সংগ্রহশালায় নানা সংযোজন হচ্ছে সব মিলিয়ে বেশ খানিকটা আশার আলো অনেক নিরাশার মধ্যে।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর ১৩০তম প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে রমেশ ভবনে এক সভার আয়োজন করা হয়েছে ২৫ জুলাই, ৩টেয়। ‘বাঙালি নারীর মুক্তিদূত মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়’ বিষয়ে বলবেন স্বপন বসু। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্চনা চৌধুরী ও ইলা চন্দ নামাঙ্কিত স্মৃতি পুরস্কার পাবেন যথাক্রমে যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী, আশিস খাস্তগীর, অনুরাধা রায় ও হামিরউদ্দিন মিদ্যা। পাঠকক্ষ সর্বাধিক ব্যবহারের জন্য নিরুপমা চন্দ স্মৃতি পুরস্কার পাবেন আশুতোষ মল্লিক। পরিষৎ-এর বই ও পত্রিকার প্রদর্শনী, এবং স্বল্পমূল্যে তা কেনার সুযোগ থাকবে। চলবে ৮ অগাস্ট পর্যন্ত।
*উল্লেখ্য, ২০২২-এ ১৩০ বছর পূর্ণ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি এবং সেই উপলক্ষ্যেই এই লেখা। প্রতিবেদনটি পুনঃপ্রকাশিত হলো।
তথ্যসূত্রঃ
bangiyasahityaparishat.org
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী
দেবাঞ্জন সেনগুপ্ত