ষড়যন্ত্রের জন্মস্থল : বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের আশ্চর্য দলিল হাওড়ার ভোটবাগান

এই রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চের মূলে ছিলেন দুই ব্যক্তি

প্রত্যেক জায়গারই নির্দিষ্ট ইতিহাস থাকে, শুধু সময়ের পলেস্তারা বিবর্ণ হয়,  আর খসে পড়ে তার গরিমা। যেমন, হাওড়ার ভোটবাগান; নামের মধ্যে ‘ভোট’ প্রসঙ্গ আছে ঠিকই, কিন্তু ‘ভোট’-এর সঙ্গে ‘ভোটবাগান’-এর আদৌ  কি কোনও সম্বন্ধ রয়েছে?

ভোটবাগানের সঙ্গে জুড়ে আছে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় – ষড়যন্ত্রের কাহিনি। তিব্বতী ভুটিয়া প্রভৃতি জনজাতিদের কথ্যভাষায় বলা হয় ‘ভোট’। বোঝাই যাচ্ছে, এই ভোট, সেই ভোট নয়। কিন্তু, শহরের অপর তীরে হাওড়ায় ভোটদের বাগান হল কেমন করে? ভোটবাগান আসলে একটি মঠ, দশনামী শৈব সম্প্রদায়ের মঠ। তাহলে, দশনামী শৈব সন্ন্যাসীদের সঙ্গে ভোটদের যোগাযোগ হল কেমন করে এবং কোন সময়?

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের সঙ্গে এই সব প্রশ্নের উত্তর জড়িয়ে আছে, আর এই রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের প্রধান দু’জন নায়কের একজন ওয়ারেন হেস্টিংস, আর-একজন পুরাণ গিরি। 

ভোটবাগান প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম মিশনের পর। বোগ্লের কাছে তাশি লামা গঙ্গাতীরে একটি মঠ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য হল, বাংলাদেশে এমন একটি আস্তানা করা, যেখানে তিব্বতী লামারা ভারততীর্থ পর্যটনের জন্য গিয়ে আশ্রয় পেতে পারে, ধর্মসাধনা করতে পারে। স্থানটি কলকাতার কাছে হওয়া চাই, কারণ ব্রিটিশের শাসনকেন্দ্রের থেকে বেশি দূরে তারা কিছু করতে চান না। বোগ্লের মাধ্যমে এই কথা তিনি হেস্টিংসকে জানান এবং এও বলেন যে, তিনি যে মঠ প্রতিষ্ঠা করবেন, সেখানকার সর্বময় কর্তা হবেন তাঁদের উভয়পক্ষেরই বিশ্বস্ত দূত পুরাণ গিরি। হেস্টিংস আবেদন মঞ্জুর করেন নিজের স্বার্থে এবং ভোটবাগানের মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়। মঠের মধ্যে আর্য তারা, মহাকাল ভৈরব, বজ্র ভ্রূকুটি, পদ্মপাণি প্রভৃতি যে-সব বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবদেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা পুরাণ গিরিই চীন তিব্বত থেকে এনেছিলেন। 

ভোটবাগান প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম মিশনের পর। বোগ্লের কাছে তাশি লামা গঙ্গাতীরে একটি মঠ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন যে, তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য হল, বাংলাদেশে এমন একটি আস্তানা করা, যেখানে তিব্বতী লামারা ভারততীর্থ পর্যটনের জন্য গিয়ে আশ্রয় পেতে পারে, ধর্মসাধনা করতে পারে।

ভোটবাগান মঠ-স্থাপনের ইতিহাস সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য উদ্ধার করেন স্বর্গীয় গৌরদাস বসাক, তাঁর বিবরণ (প্রথম খণ্ড) প্রকাশিত হয় বঙ্গীয় এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে, ১৮৯০ সালে।  তখন ওমরাও গিরি গোঁসাই ভোটবাগান মঠের মোহান্ত ছিলেন। তিনি বসাক মহাশয়কে এশিয়াটিক সোসাইটিতে সংরক্ষণের জন্য দু-খানি দুষ্প্রাপ্য তিব্বতী পাণ্ডুলিপি উপহার দেন এবং মঠসংক্রান্ত চারখানি ফার্সী সনদ দেখান। পুরাণ গিরির নামে একখানি তিব্বতী ছাড়পত্র ছিল, সেটিও বসাক মহাশয় দেখেন। চারটি সনদের মধ্যে একটি সনদে গঙ্গাতীরে ১০০ বিঘা ও ৮ কাঠা জমি দানের কথা উল্লেখ আছে। গ্রহীতা হলেন পুরাণ গিরি গোঁসাই। জমি হল মৌজা বারবকপুর পরগণা বোরোতে এবং মৌজা ঘুসুড়ী, পরগণা পাইকানে মঠ মন্দির ও উদ্যান বানানোর জন্য জমি দান করা হয়।

আর একটি সনদে ৫০ বিঘা জমি দানের কথা আছে। এই ৫০ বিঘা মহারাজা নবকৃষ্ণ, রাজচন্দ্র রায় ও রাজা রামলোচনের জমিদারীর অন্তর্ভুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নবকৃষ্ণ শোভাবাজারের রাজা এবং রায়েরা আন্দুল রাজবংশের। মুৎসুদ্দী চৌধুরী, কানুনগো, তালুকদার প্রভৃতিদের উদ্দেশে সনদের নির্দেশ জারি করা হয়েছে। ১নং সনদের তারিখ বাংলা ১১৮৫ সং, ১ আষাঢ়; ইংরাজী ১২ জুন ১৭৭৮ সাল। ২নং সনদের তারিখ বাংলা ১১৮৯ সন, ২ ফাল্গুন; ইংরাজী ১৭৮২ সাল, ১১ ফেব্রুয়ারী। ৩ ও ৪নং সনদের তারিখ এক এবং জমির পরিমাণও এক দেখা যায়, মনে হয় প্রথম দু’টি সনদের নকল। কিন্তু উল্লেখযোগ্য হল ৩ ও ৪নং সনদে গ্রহীতার নাম আছে – লামা পাঞ্চন অরদানি বাকদেও পাঞ্চন। শীলমোহরের ছাপও ভিন্ন। ৩নং ও ৪নং সনদে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর শীল আছে, দেওয়ান হিসেবে। দু’টি সনদেই ওয়ারেন হেস্টিংসের স্বাক্ষর আছে।

ভোটবাগান মঠ-স্থাপনের ইতিহাস সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য উদ্ধার করেন স্বর্গীয় গৌরদাস বসাক, তাঁর বিবরণ (প্রথম খণ্ড) প্রকাশিত হয় বঙ্গীয় এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে, ১৮৯০ সালে।  তখন ওমরাও গিরি গোঁসাই ভোটবাগান মঠের মোহান্ত ছিলেন।

সনদগুলি থেকে ভোটবাগান মঠের ইতিহাস অনেকটাই আন্দাজ করা যায়। এইটুকু বোঝা যায় যে, ১৭৭৮ ও ১৭৮২ সালে, পুরাণ গিরি গোঁসাই ও পাঞ্চন লামা উভয়েই গঙ্গাতীরে প্রায় ১৫০ বিঘা আন্দাজ জমি পান, বর্তমান ভোটবাগান অঞ্চলে, মঠ ও মন্দির উদ্যানসহ প্রতিষ্ঠার জন্য। এই হল ভোটবাগান মঠের ইতিহাস।  

মোট কথা, সমস্ত নথি ঘেঁটে বোঝা যায় যে, ভোটবাগান মঠের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল প্রধানত ব্রিটিশ-তিব্বতী বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সম্পর্কের স্বার্থে, ধর্মের আবরণে। হাওড়ার ভোটবাগানে সেই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ধ্বংসস্তূপ এখনও রয়ে গিয়েছে।

______________________

গ্রন্থ সহায়তা: পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, বিনয় ঘোষ

Developed by DXDasia