সত্যজিৎ নির্মিত গুপি গাইনের বিচার হয়েছিল এই বাড়িতেই

হেতমপুর রাজবাড়িতে আছে ৯৯৯টি দরজা

দুর্গের মতো দেখতে একটা বিশাল প্রাসাদ। তার দরজার সংখ্যা ৯৯৯টি। মুর্শিদাবাদের (Murshidabad) নবাব হুমায়ুন জা-র তৈরি করা হাজারদুয়ারি প্রাসাদের সম্মান যাতে অক্ষুণ্ণ না হয়, তার জন্য হাজারদুয়ারির থেকে একটা দরজা কম রাখা হয়েছিল এই বাড়িতে। তবে স্থানীয় লোকজনের মুখে এই প্রাসাদের নাম হয়েছিল ‘হেতমপুরের হাজারদুয়ারি’। হেতমপুরের (Hetampur) রাজ পরিবারের আবাস এই অট্টালিকা। ১৯০৫ সালে হেতমপুরের রাজা রামরঞ্জন চক্রবর্তী এটি তৈরি করিয়েছিলেন। তাই এই বাড়িটাকে ‘রঞ্জন প্যালেস’ নামেও ডাকা হয়। ১৮৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে এই রামরঞ্জন চক্রবর্তী ব্রিটিশ সরকারকে নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। যার ফলে খুশি হয়ে ব্রিটিশ শাসকরা তাঁকে দিয়েছিলেন ‘রাজাবাহাদুর’ উপাধি। ইংরেজ সরকারের সঙ্গে এই রাজপরিবারের সখ্য অবশ্য অনেক পুরোনো। রামরঞ্জনের ঠাকুরদা বিপ্রচরণ সাঁওতাল বিদ্রোহ (Santal Movement) দমনে বেশ অবদান রেখেছিলেন।

সত্যজিতেরই ‘অভিযান’ (Abhijan), মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ (Mrigaya), তরুণ মজুমদারের ‘গণদেবতা’ (Ganadebata), সন্দীপ রায়ের ‘গোঁসাইপুর সরগরম’, রাজা সেনের ‘দামু’-র কথা তো বলতেই হয়।

হেতমপুর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মুরলীধর চক্রবর্তী। চাকরির খোঁজে তিনি বাঁকুড়ার (Bankura) ভিটেমাটি ছেড়ে বীরভূমে (Birbhum) এসেছিলেন। তিনি মারা গেলে বড়ো ছেলে চৈতন্যচরণ নিজের মা আর ভাইকে নিয়ে হেতমপুরে এসে থাকতে শুরু করেন। তখন চরম দারিদ্র ছিল তাঁদের নিত্যসঙ্গী। চৈতন্যচরনের বড়ো ছেলে রাধানাথ চাকরি পেয়েছিলেন হেতমপুরের জাঁদরেল রায়বংশের জমিদারিতে। নিজের কর্মদক্ষতার প্রমাণ দিয়ে তিনি একটা সময়ে সেরেস্তার দায়িত্ব পান। আর্থিকভাবেও ধনী হতে থাকেন। জমিদারির ইজারা কিনে সম্পত্তি বাড়াতে থাকেন। একটা সময়ে তাঁর প্রতিপত্তি রায়দেরও ছাড়িয়ে যায়। মুর্শিদাবাদের নবাবদের থেকে তিনি কিছু মহল আর জমিদারি কেনেন। রাধানাথ ব্রিটিশ শাসকদের অধীনতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন, আর ইংরেজ সরকারও তাঁকে দিয়েছিল ‘মহারাজা’ উপাধি।

রাধানাথ মারা গেলে তাঁর বড়ো ছেলে বিপ্রচরণ জমিদারি সম্পত্তিকে আরও বাড়িয়েছিলেন। বিপ্রচরণের ছেলে কৃষ্ণচন্দ্র অবশ্য ধর্মকর্ম নিয়ে বেশি মেতে থাকতেন। তাঁর ছেলে রামরঞ্জন বানিয়েছিলেন হেতমপুরের সেই বিশাল প্রাসাদ। সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ (Gupi Gayen Bagha Bayen) ছবিতে গুপিকে তার গ্রাম থেকে যে রাজা গাধার পিঠে করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তার রাজবাড়ির সেট ছিল হেতমপুর প্রাসাদে। আরও অনেক বিখ্যাত ছবির শুটিং এখানে হয়েছে। সত্যজিতেরই ‘অভিযান’ (Abhijan), মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ (Mrigaya), তরুণ মজুমদারের ‘গণদেবতা’ (Ganadebata), সন্দীপ রায়ের ‘গোঁসাইপুর সরগরম’, রাজা সেনের ‘দামু’-র কথা তো বলতেই হয়। হেতমপুর রাজবাড়ির রথটাও খুব বিখ্যাত। এখন হেতমপুর বীরভূম জেলায় সিউড়ি সদর মহকুমার একটা শহর। আর হেতমপুর রাজবাড়ির একাংশে এখন রয়েছে ডিএভি পাবলিক স্কুল, আর আছে বিএড কলেজ।

 

তথ্যসূত্র – রাঢ় বাংলা, এক্সক্লিউসিভ অধিরথ, গুরুচণ্ডা৯।

Developed by DXDasia