বাংলার নতুন গোয়েন্দা ‘গোরা’, বেসুরো গলা আর ভুলে যাওয়া স্বভাবে কেমন মাতালেন তিনি?

গোরাকে এখানে দেখানো হয়েছে একজন ‘ডিফেকটিভ ডিটেকটিভ’ হিসেবে, অনবদ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী

তিনি গোয়েন্দা। অথচ সবকিছুই ভুলে যান। তাঁর অসাধারণ স্মৃতির দুনিয়ায় সুপ্রিয়া হয়ে যান সুমিত্রা, সুচিত্রা কিংবা সুচরিতা। তাঁর গোয়েন্দাগিরির পিছনে যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে এক সারথীর। সারথীর নামটিও সারথী। সম্পর্কে হবু ভগ্নিপতি, যদিও তিনি ড্রাইভার হিসেবেই অধিক পরিচিত। কারণ সারথী আর ড্রাইভার তো একই ব্যাপার। প্রেজেন্টিং বাংলার নতুন গোয়েন্দা গোরা। ওরফে গৌরব সেন। গোরা ভুলোমনা হলেও কলকাতা পুলিশ তাঁকে ছাড়া নিরুপায়। তাই ঘরে ঘরে গোরার দাপটও বেশ চোখে পড়ার মতো৷ শহরের মানুষ গোরার নাম শোনেনি, এমনটা বেশ দুর্লভ। গোরা নেমেছে নতুন এক তদন্তে। একের পর লেখকরা খুন হয়ে যাচ্ছেন। কলমের নিব দিয়ে সারা শরীরে ক্ষত-বিক্ষত করে দেওয়ার পর দাঁত উপড়ে নেওয়া হচ্ছে। তারপর সেই দাঁতের জায়গায় নিবগুলো সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে। খুবই ভয়ংকর। পৈশাচিক।

গোরা সেনের আরও একটি গুণ হল চমৎকারভাবে বেসুরো গান গেয়ে থাকেন তিনি। বেসুরো কিন্তু গুণ, কারণ সেই গানের কথার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তাঁর জটিল রহস্য উদঘাটনের সূত্র। আবার তিনি নারীবিদ্বেষী। বিদ্বেষী মানে ভয় পান আরকি৷ সেখানেও এক গেঁড়ো। রহস্যের দরজা খুলতে সোজা বাড়িতে এসে জুটলেন সদ্য বিবাহিতা এক যুবতী সোমলতা। গোরা পড়লেন ফ্যাসাদে। সবমিলিয়ে একটু বেশিই খ্যাপাটে।

এর আগে ‘একেনবাবু’-কে দেখেছি চিরাচরিত গোয়েন্দার তকমা ভেঙেছেন। এই চিরাচরিত ধ্যানধারণাকে বদলে দিলেই তা সবসময় উৎকৃষ্টমানের হবে, সেই ধারণা ভুল। আকর্ষণীয় এবং উৎকৃষ্ট — এক্ষেত্রে দুটি শব্দের অর্থ আলাদা। গোরা সেন এসবকে মোটামুটি ব্যালেন্স করেছেন। কারণটা সাহানা দত্তের চিত্রনাট্য এবং ঋত্বিক চক্রবর্তীর তুমুল অভিনয়। গোরাকে এখানে দেখানো হয়েছে একজন ‘ডিফেকটিভ ডিটেকটিভ’ হিসেবে। এই বৈশিষ্ট্য অনবদ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ঋত্বিক। তবে মূল গল্পের বুনোট খানিক এলোমেলো। হইচই-এর স্মার্ট মেকিং-এ অনেকসময় সেইসব ফাঁকফোঁকড় বুজে যায়। তবে মেনে নিতে অসুবিধা নেই চিন্তাভাবনার দিক থেকে হইচই প্ল্যাটফর্ম অনেকটাই এগিয়ে।

সমানভাবে দুটি কাহিনি এগিয়েছে মূল গল্পের হাত ধরে। যার একদিকে লেখক-খুন রহস্য, আরেকদিকে সদ্য বিবাহিতার ঘুমের মধ্যে হাঁটা। দুটো রহস্যই সমাধান করতে উদ্যত হয়েছেন গোরা সেন। সদ্য বিবাহিতা সোমলতা একদিন হঠাৎ করেই গোরার বাড়িতে চলে আসেন এবং বলেন, “আমার মনে হয় খুব শিগগিরি আমি একটা খুন করতে চলেছি।” গল্প এখান থেকে নতুন বাঁক নেয়। যেন মনে হয় দুটি রহস্যের সমাধান একটাই। কিন্তু শেষে গিয়ে সব রহস্যের জট খুলতে থাকে। যদিও সোমলতার ঘুমের ঘোরে হাঁটার রহস্যে নতুন কিছু নেই। সেটা অন্যভাবে দেখানো যেতেও পারত কিংবা না দেখালেও অসুবিধা থাকত না।

বারবার মনে হয়েছে, সোমলতা আর গোরার বন্ধুত্ব করিয়ে দেবার জন্যই এমন নয়া রহস্যের সূত্রপাত। কে জানে, হতেই পারে পরবর্তী সিজনগুলিতে গোরাকে যোগ্য সঙ্গত করবেন সোমলতাই। অনেকটা শার্লকহোমস আর ওয়াটসনের মতো। এমনকি থিম মিউজিকে শার্লকহোমসের ছায়া।

সিরিজের নাম ‘গোরা’। যে নাম শুনলেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গোরাকে মনে পড়বে আমাদের। পরিচালক সেইমতো প্রত্যেকটি পর্বের নামকরণ করেছেন। প্রত্যেকটি নামকরণই আসলে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সংযুক্ত। যেমন – মায়ার খেলা, অপরিচিতা, অনধিকার প্রবেশ, কালমৃগয়া, শেষের রাত্রি, শাস্তি, সমাপ্তি। চমক দিয়ে শেষ হয় সিরিজ এবং ইঙ্গিত দেওয়া হয় পরবর্তী সিজনের।

কিন্তু প্রশ্ন একটাই, গোয়েন্দার ভুলোমন আর বেসুরো গলা দিয়ে কি দর্শককে ধরে রাখা যাবে? কারণ এই দুটি ছাড়া বাকিসব গড়পড়তা। যিনি সবসময় সবার নাম ভুলে যান, গতকাল কী করেছেন বা এই মুহূর্তে কী খেয়েছেন মনে রাখতে পারেন না, তাঁর মস্তিষ্ক কীভাবে সফল গোয়েন্দা হয়ে ওঠাতে সায় দেয়! তা ভালো বোঝাতে পারবেন পরিচালক সায়ন্তন ঘোষাল এবং চিত্রনাট্যকার সাহানা দত্ত। বাঙালিমাত্রই গোয়েন্দাপ্রিয়। সেই চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে না তুলতে পারলে গোয়েন্দা বেশিদিন টিকবেন না। ইতিহাস সেই কথাই বলছে। পরবর্তী সিজনে আরও নতুন এবং শক্তিশালী চমকের আশায় রইলাম।

অভিনয়েঃ ঋত্বিক চক্রবর্তী, ইশা সাহা, সুহত্র মুখোপাধ্যায়
পরিচালনাঃ সায়ন্তন ঘোষাল
চিত্রনাট্যঃ সাহানা দত্ত
প্রযোজনাঃ হইচই

Developed by DXDasia