বাল্যবিবাহ রুখতে পথে নেমেছেন হুগলির প্রধান শিক্ষক দেবাশিস মুখোপাধ্যায় ওরফে গোলাপসুন্দরী

বাল্যবিবাহ রুখতে বহুরূপীর সাজে ছড়িয়ে দিচ্ছেন নিজের লেখা প্রতিবাদী গান ও ছড়া

রনে জরির কাজ করা লাল ঘাগরা এবং সুতির কুর্তি, গলায় নানা রঙের ছোটো ছোটো স্কার্ফ। ফর্সা গালে রং-বেরংয়ের আঁকিবুকি, চোখে টানা কাজল, কপালে বড়ো করে সিঁদুরের টিপ, হাতে সোনালি রঙের চুড়, পায়ে ঘুঙুর আর গলায় ঝুলছে প্ল্যাকার্ড। সকলে তাঁকে চেনে ‘গোলাপসুন্দরী’ নামে। প্রচলিত শিক্ষকের ধারণার সঙ্গে অবশ্য একেবারেই মেলেনা এ ছবি। যদিও শিক্ষা দেওয়ার জোয়ালটা তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছেন ভিন্ন পন্থায়। বিদ্যালয়ের চার দেওয়ালের গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে হয়ে উঠেছেন, একটা গোটা সমাজের শিক্ষক।

নাম দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়। হুগলির তিলকচক গ্রামে বাড়ি বছর বাহান্নর এই মানুষটির। পেশায় হুগলির খানাকুলে মাজপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (Head Master)। তাঁর লক্ষ্য একটাই, বাল্যবিবাহ বন্ধ করা (Prevention of child marriage)। মাস সাতেক আগে সেই উদ্দেশ্যেই সমাজকে সচেতন করতে নারী সেজে ঘুরে বেড়ানো শুরু করেছেন দেবাশিস মুখোপাধ্যায় (Teacher Debashis Mukherjee) ওরফে গোলাপসুন্দরী (GolapSundori)। নিজের গ্রাম, পাশের গ্রাম, ভিনজেলা, এমনকি ভিনরাজ্যেও ছড়িয়ে দিচ্ছেন তাঁর লেখা প্রতিবাদী গান-ছড়া।

বহু বছর আগে সমাজ সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (Ishwar Chandra Vidyasagar) বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য যে লড়াইটা শুরু করেছিলেন, সেই লড়াই আজকের সমাজে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন দেবাশিসবাবুর মতো মানুষেরাই। সরকারের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একক প্রচেষ্টায় বাল্যবিবাহ রোধে প্রচার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি ছুটির দিন এলেই বেরিয়ে পড়েন বহুরূপী সেজে। নিজেই লেখেন প্রতিবাদী সব ছড়া এবং গানের পংক্তি। তাতে আবার পাঁচালির মতো সুরও দেন তিনি। কখনও কোনও স্কুলের গেটের সামনে সেটাই গলা ছেড়ে গাইতে থাকেন। বুকের কাছে রাখা ছোট্ট স্টিলের পাত্রে আঙুলের টোকায় তাল ঠোকেন। পায়ের ঘুঙুরে ওঠে শব্দছন্দ। গোলাপসুন্দরী গেয়ে চলেন, ‘ছেলেদের ২১ আর মেয়েদের ১৮ হলে, তবেই তাদের দু’জনের বিয়ে দেওয়া চলে…।’

দেবাশিসবাবু জানান, ‘‘আমি চাই বাল্যবিবাহের মতো ব্যাধি সমাজ থেকে দূর হোক। চিকিৎসকেরাই তো বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনও মেয়ের যদি বাচ্চা হয়, তাহলে নানা ধরনের জটিল অসুখ দেখা দেয়। এর জন্য দায়ী মূলত অশিক্ষা। তাই মানুষকে শিক্ষিত হতে হবে। শুধু বাচ্চাদের পড়ালেই হবে না। বড়োদেরও শিক্ষা দিতে হবে। একজন শিক্ষক হিসাবে আমি সে কাজটাই করতে চাইছি।’’

দেবাশিসবাবুর কথায় আরও জানা যায়, তাঁর এলাকার বেশিরভাগ মানুষই মনে করেন বাড়ির মেয়েরা পরিবারের বোঝা। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের বিয়ে দিয়ে দেওয়াই ভালো। বর্তমানে এই প্রবণতা পুলিশ ও প্রশাসনের তৎপরতায় কিছুটা কমলেও মেয়েদের নিয়ে মনের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা, তা এখনও কাটেনি। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে কমবয়সী মেয়েদের কেন বিয়ে দিতে নেই, তা নিয়ে প্রচার করতে হচ্ছে, এটা ভেবে রীতিমতো আক্ষেপ করেন তিনি।

সম্পূর্ণ নিজের খরচায় বহুরূপী সেজে দিনের পর দিন বাল্যবিবাহ রোধের প্রচারে ছুটে গিয়েছেন। কখনও বেড়াতে গিয়ে, আবার কখনও শ্রাবণী মেলায় তারকেশ্বর বা তারাপীঠের মন্দিরে মানুষকে সচেতন করেন দেবাশিস মুখোপাধ্যায়। বছরখানেক আগে মাষ্টার মশাইয়ের নজরে আসে নিজের এলাকার একটি বাল্যবিবাহের খবর। তার পরেই তিনি ঠিক করেছিলেন, বহুরূপী সেজে মানুষকে এই ‘সামাজিক ব্যাধি’ সম্পর্কে সতর্ক করবেন। কিনলেন বহুরূপীদের পোশাক, রুপটানের সরঞ্জাম। শুরু হল অন্যরকম পথচলা। সাময়িক অস্বস্তি কাটিয়ে সময়ের সঙ্গে মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন তিনি। এই পথে অবশ্য সবসময় পাশে পেয়েছেন তাঁর পরিবারকে। আজও ছুটির দিনগুলোতে স্ত্রীর সাহায্যে সেজেই ওঠেন ‘গোলাপসুন্দরী’। এমনকি নিজের সঙ্গে প্রচারে নিয়ে যান তাঁর বি.টেক পড়া একমাত্র ছেলে দীপ্তমকেও।

‘১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে দেবে না, মা-বাবা হয়ে তাদের বিপদে ফেলবে না’, ‘অল্প বয়সে বিয়ে দিলে মেয়ে পড়বে রোগে, তোমাদেরই কষ্ট হবে মেয়ে যদি ভোগে’, ‘মেয়েদের ভালো করে লেখাপড়া শেখাও, লেখাপড়া শিখিয়ে তাদের দেশ গঠনে লাগাও’ – এমন হাজারও পংক্তি নিজেই লিখেছেন দেবাশিসবাবু, সুরও দিয়েছেন তাতে।

নেচে, গেয়ে শরীরী ভঙ্গিমায় বাবা-মায়েদের বোঝাতে শুরু করেন, একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর যখন সম্পূর্ণ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয় তখনই বিয়ে দেওয়া উচিত। ‘১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে দেবে না, মা-বাবা হয়ে তাদের বিপদে ফেলবে না’, ‘অল্প বয়সে বিয়ে দিলে মেয়ে পড়বে রোগে, তোমাদেরই কষ্ট হবে মেয়ে যদি ভোগে’, ‘মেয়েদের ভালো করে লেখাপড়া শেখাও, লেখাপড়া শিখিয়ে তাদের দেশ গঠনে লাগাও’ – এমন হাজারও পংক্তি নিজেই লিখেছেন দেবাশিসবাবু, সুরও দিয়েছেন তাতে।

একটি সুস্থ সমাজ গড়ার লক্ষ্যে প্রতিদিন নিজেকে ভেঙে গড়ে চলেছেন হুগলির মাষ্টারমশাই। সমাজের তথাকথিত চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে নারী সাজতেও শিরদাঁড়া কাঁপে না তাঁর। ছক ভাঙার এই লড়াইয়ের শেষ ঠিক কোথায়, কে জানে! আজকাল এসব প্রশ্নের আর উত্তর খোঁজেন না দেবাশিসবাবু। মাথার মধ্যে কেবলই ঘোরে, সমরেশ বসুর ‘সুচাঁদের স্বদেশযাত্রা’ গল্পের বহুরূপী সুচাঁদ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের শ্রীনাথ বহুরূপী, সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ — এ সব গল্প। একদিকে সমাজ গড়ার কারিগর, অন্যদিকে শিক্ষকসত্তা, এ দু’য়ের পাশাপাশি বাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন তা আজকের সমাজে এক ব্যতিক্রমী ইতিবাচক স্বতন্ত্র-এর কথা বলে। আজ শিক্ষক দিবসে এরকমই এক ব্যতিক্রমী শিক্ষককে কুর্নিশ জানায় বঙ্গদর্শন।

সূত্র – দেবাশিস মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, একটি ইউটিউব সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সংগৃহীত।

Developed by DXDasia