বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও বিভিন্ন পরবকে তিনি গানে তুলে এনেছেন, করেছেন অজস্র অনুবাদ
লোপামুদ্রা মিত্রের (Lopamudra Mitra) গাওয়া ‘বাংলা আমার সর্ষে-ইলিশ’-এর কথা বাঙালি শ্রোতাদের নিশ্চয় মনে আছে। লোপামুদ্রার গায়কিতে এই গান পেয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা। অথচ আড়ালে রয়ে গেছেন এ গানের গীতিকার গিয়াসুদ্দিন দালাল (Giasuddin Dalal)৷
গিয়াসুদ্দিন লিখেছেন, “শীতের ভোরের বেওরা পুকুর/ টুসু গানের সারি/ নতুন চালের ভাপা পিঠে/ চাকলি আহামরি/ সরু চাকলি আহামরি”।
গ্রাম্য মানুষের কথা। তাঁদের উৎসবও যে বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, গানে সেই অনুভূতি জুড়ে দিয়েছেন গিয়াসুদ্দিন। গানের শেষে গিয়াসুদ্দিন বলছেন, “বাংলা ইদের লাড্ডু বানায়/ আবছা ভোরে ওঠা/ বাংলা কিশোর ভাইয়ের মাথায়/ ছোট্ট বোনের ফোঁটা”।
আজ যে সম্প্রীতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হয়, তা সহজাত এবং স্বাভাবিক বিষয় গ্রাম্য বাঙালির জীবনে। যেভাবে জমির আলে বসে বিড়ি ভাগাভাগি করে খায়, হিন্দু-মুসলমান চাষী৷ পান্তাভাত মাখে কৃষিকাজের বিরতিতে৷ গিয়াসুদ্দিনের গান সেই মানুষদের জুড়ে দেয়৷
আজ যে সম্প্রীতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হয়, তা সহজাত এবং স্বাভাবিক বিষয় গ্রাম্য বাঙালির জীবনে। যেভাবে জমির আলে বসে বিড়ি ভাগাভাগি করে খায়, হিন্দু-মুসলমান চাষী৷ পান্তাভাত মাখে কৃষিকাজের বিরতিতে৷ গিয়াসুদ্দিনের গান সেই মানুষদের জুড়ে দেয়৷
সত্তরের দশক, আকাশবাণীতে কাজ দিয়ে শুরু হয় গিয়াসুদ্দিনের কর্মজীবন। এর পাশাপাশি একজন নজরুল (Nazrul Islam) অনুরাগী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম ইংরেজি অনুবাদ করেন ২০০৮ সালে৷ এর আগে এই প্রয়াস সম্ভবত হয়নি৷ নজরুলের বিভিন্ন কাব্য এবং নজরুলগীতির ইংরেজি অনুবাদ করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর স্বপ্ন৷ প্রকাশের একশো বছর পর ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের প্রথম ইংরেজি অনুবাদ তাঁরই করা। নজরুলের সমগ্র উপন্যাসগুলির ভাষান্তর করেছেন৷ ছোটোগল্প, প্রবন্ধ ও নাটক নিয়েও তিনি চর্চা করে চলেছেন৷
বাংলা গানে গিয়াসুদ্দিনের বিচরণ সম্পর্কে বাঙালি তেমন সচেতন নয়৷ দেবদেবীদের নিয়ে ভক্তিমূলক গান, ইসলামি গান, বাংলা এবং বাঙালির সংস্কৃতি নিয়ে গান, গণসংগীত প্রায় সব ধারাতেই তিনি গান লিখেছেন৷ দুটি ছবির জন্যও গান লিখেছিলেন৷
আকাশবাণী ছাড়ার পর জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে শিক্ষকতায়৷ ১৯৯৮ সাল, একদিন আড্ডা দিচ্ছিলেন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে৷ কথা হচ্ছিল বাঙালির জীবন এবং জীবনধারণ নিয়ে৷ তখনই নতুন পরিকল্পনা এল গিয়াসুদ্দিনের মাথায়৷ ভাবলেন বাঙালির খাদ্যাভ্যাস এবং বিভিন্ন পরবকে গানে তুলে ধরলে কেমন হয়! লিখে ফেললেন, “বাংলা আমার সর্ষে ইলিশ/ চিংড়ি কচি লাউ/ বাংলা পারশে মাছকে ধুয়ে/ জিরের বাটায় দাও”। বাঙালির মুখে মুখে ফিরল সেই গান৷ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠল৷
স্বাভাবিক বাংলা সংস্কৃতি এবং বাঙালিয়ানার উত্তরাধিকার নিয়ে বড়ো মঞ্চে দাঁড়িয়েছে কোনও মুসলমানের ছেলে৷ প্রশ্ন এল, “এত ভালো বাংলা তুমি শিখলে কোথা থেকে?”
“যেভাবে আপনি আপনার মায়ের থেকে শিখেছেন, আমিও সেভাবেই শিখেছি।” – এই উপলব্ধিই গিয়াসুদ্দিনের যাপন৷
দেশজ ও বিদেশি লোকসংগীত, রাগসংগীতের প্রয়োগ ও নতুন রাগ সৃষ্টি করে কাব্যময় ভাষায় আধুনিক আঙ্গিকে নজরুল যে অমূল্য গানের ভাণ্ডার বিশ্বকে দিয়ে গেছেন। ভাষাগত সীমাবদ্ধতার জন্য সেসকল গানের পূর্ণ রসাস্বাদনে বঞ্চিত হচ্ছিলেন আন্তর্জাতিক শ্রোতা।
গিয়াসুদ্দিন নজরুলের সুর তাল-মাত্রা-ছন্দ-আঙ্গিক বজায় রেখে সেইসব গানের শুধু ইংরেজি ভাষান্তরই করলেন না, শিল্পীদের দিয়ে তা রেকর্ড ও বাজারজাত করালেন। দল তৈরি করে বাংলাদেশ, কানাডা, প্যারিস, মালয়েশিয়া ও লন্ডন থেকে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান করে চলেছেন। এই প্রয়াস বাঙালি ও বিদেশি শ্রোতাদের মধ্যে বাংলা গানের যোগসূত্র তৈরি করে৷ ২০১৮ সালে এ কাজের জন্য দুবাই এতিসালাত অ্যাকাডেমিতে সাঙ্গীতিক অবদানের জন্য আরতি মুখোপাধ্যায় (Arati Mukhopadhyay) সঙ্গে গিয়াসুদ্দিনকে ‘গ্লোবাল মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’ (দুবাই) প্রদান করা হয়।
বাংলা গানে গিয়াসুদ্দিনের বিচরণ সম্পর্কে বাঙালি তেমন সচেতন নয়৷ দেবদেবীদের নিয়ে ভক্তিমূলক গান, ইসলামি গান, বাংলা এবং বাঙালির সংস্কৃতি নিয়ে গান, গণসংগীত প্রায় সব ধারাতেই তিনি গান লিখেছেন৷
নজরুলের গানের বিশ্বায়নে এ কাজ আগে এভাবে হয়নি৷ তাই গিয়াসুদ্দিন এক্ষেত্রে অবশ্যই অন্যতম পথপ্রদর্শক। ২০০৮ সালে গিয়াসুদ্দিন শেষ করেন রাশিয়ার বলশেভিক মুভমেন্ট অনুপ্রাণিত নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’-র প্রথম ইংরেজি অনুবাদ ‘Hunger for Death’। প্রথম তাঁর দ্বারা ইংরেজিতে অনুদিত হল বাংলা সাহিত্যের প্রথম এপিসোলারি নভেল নজরুলের ‘বাঁধনহারা’, ‘Bondless’ নামে এবং স্বদেশি আন্দোলনের উপর প্রথম উপন্যাস ‘কুহেলিকা’, ‘The Mysterious’ নামে। রাজনৈতিক উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’-র অনুবাদ ‘Hunger for Death’ দৃষ্টি আকর্ষণ করল রাশিয়ান কনস্যুলেটের। গিয়াসুদ্দিন সোভিয়েত ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোশিয়েনের ‘ইয়ুথ গিল্ড’ পুরষ্কার পেলেন ২০১০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। এ কাজের জন্য বাংলাদেশের (Bangladesh) ডেপুটি হাইকমিশনার সংবর্ধনা দেন গিয়াসুদ্দিনকে।
ছোটোগল্প, প্রবন্ধ, নাটক উপন্যাস অভিভাষণ নিয়ে নজরুলের গদ্যসাহিত্য অনেক। গান কবিতার সঙ্গে এগুলোরও অনুবাদ শেষ হতে চলল গিয়াসুদ্দিনের। সমগ্র নজরুল সাহিত্যের এতটা অনুবাদ গিয়াসুদ্দিনের আগে কেউ করেননি। রচনার একশো বছর পর এই প্রথম সম্পূর্ণ ‘অগ্নিবীণা’ কাব্য গিয়াসুদ্দিন ইংরেজিতে অনুবাদ করলেন ‘Harp of Fire’ নামে। এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব যা বাঙালি পালন করতে পারেনি এতদিন, তা আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সংকল্প নিয়েছেন গিয়াসুদ্দিন।
বাংলা ভক্তিগীতিতে এখনকার গীতিকারদের মধ্যে গিয়াসুদ্দিন উল্লেখযোগ্য। শৌখিন মজদুরি নয়, জীবনাচরণ – যা নানান ডাইমেনশনে আমরা নজরুলে পেয়েছি। শ্যামা মায়ের প্রতি অনু্যোগ এসেছে তাঁর গানে। ‘জবা লাল বলে যে সকলে খুশি হোস তুই মা, আমার জবাটি কমলা বলে কি পূজা তুই নিবি না?’ হিন্দু ভক্তিবাদ থেকে তিনি সহজেই চলে যান ইসলামি আধ্যাত্মবাদে- ‘জাহানের মায়া বাড়াস কেন রে হেথা তুই মুসাফির’।
ইসলামে মৃত্যু পরবর্তী শেষবিচার অর্থাৎ কেয়ামতের কনসেপ্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ সেদিন আল্লাহ কর্তৃক স্থির হয় অনন্ত জান্নাত-জাহান্নামের হিসেব৷ গিয়াসুদ্দিন এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, “যেন পার হতে পারি শেষের সে দিন পুলসিরাতের পথ…”, “মাঠের মাজখানিতি ঘাস আর পাতা চাষ করবি কী করে…” – যেন প্রতীকী ভাবাচরণেরই শিক্ষা।
অন্তরের সৌন্দর্য ব্যতিরেকে যে জীবন বাহ্যিক বিলাস-ব্যসনেরই আস্ফালন, সেই আস্ফালনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াস পরিলক্ষিত হয় গিয়াসুদ্দিনের গানে, “না রাঙিয়ে মন কেন রাঙালে বসন, যোগী…”।
গিয়াসুদ্দিন এক প্রচারবিমুখ গীতিকার। যাঁর কথা সেভাবে লেখা হয় না কোথাও৷ ভূপেন হাজারিকা থেকে কল্যাণ সেন বরাট, অনেক গুণী মানুষের সঙ্গে কাজ করেছেন৷ প্রাণের ভাষা হয়ে উঠেছে গানের ভাষা। গিয়াসুদ্দিন সোচ্চারে বলে যাচ্ছেন, “বাংলা ভুলি কী করে/ বাংলা বুকের ভিতরে”।
হয়তো একদিন পৃথিবীতে মেলা হবে৷ শব্দ, সুর নিয়ে মানুষের মেলা। জীবনের আশাব্যঞ্জক উদযাপনের প্রহরে সে মেলার নাম হবে গিয়াসুদ্দিন।
