বড়গাছিয়ায় সিংহবাড়ির ঐতিহ্যশালী পুজো। দুর্গা এখানে চতুর্ভুজা।
শহরের ধুলোবালি আজও এখানে এসে পৌঁছায়নি। এখানে বটের ঝুরিতে আজও দোল খায় সারল্যমাখা হাসি। দৈনন্দিন জীবন আজও মন্থর। আচরণে-যাপনে-চর্যায় কৃত্রিমতা নেই কোথাও। বড়গাছিয়া। হুগলী জেলার একটি আধা-শহর, আধা-গ্রাম। গঞ্জ বললেই বেশি মানায়। সেই অঞ্চলে এখন খুশির হাওয়া। হবে নাই বা কেন, আজ-ই তো শুরু হয়ে গেছে দেবীপক্ষ। চারিদিকে সাজো-সাজো রব, মা এসে গেছেন। বড়গাছিয়ায় পুজো মানেই সিংহবাড়ির বিখ্যাত দুর্গাপুজো। বড়গাছিয়ার ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ইতিহাস বহন করে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী সিংহবাড়ি। পুজোর বয়স প্রায় ৩০০ বছরের আশেপাশে। প্রায় তিন শতাব্দীপ্রাচীন এই পুজোয় আজো কথা বলে ইতিহাস, পালিত হয় সাবেকি প্রথা, আচার-অনুষ্ঠান। সময় এই পুজোর আন্তরিকতায়, রেওয়াজে সামান্যও আঁচড় কাটতে পারেনি।

স্থানীয় ভাষায় পরিচয় ‘সিংবাড়ির পুজো’ নামেই। সিংহবাড়ির জামাই হলেন বিশ্বাস ও বসুমল্লিক পরিবারের ছেলেরা। সেই সূত্রে তাঁরাও এই খ্যাতিসম্পন্ন পুজোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৭৩২ খ্রিস্টাব্দে পুজোর সূচনা। কে শুরু করেন এই পুজো, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই, তবে অনুমান করা যায় সিংহ পরিবারেরই কোনো কর্তাব্যক্তি গুরুদায়িত্বটি পালন করেছিলেন। শুরুর বছরগুলোয় পুজো হত একটি গড়পরতা মাটির আটচালায়। কয়েক বছর পর পুজোটিকে আরও বর্ণাঢ্য করে তোলার অভিপ্রায়ে তৈরি হয় তিন খিলানের দালান। বর্তমানে দালানটি পাঁচ খিলানের। তার মাথায় বজ্রনিরোধক হিসেবে তিন ত্রিশূল সমেত ওঁ লেখা লোহার গোলচাকতি রয়েছে যা দালানটিতে অন্য মাত্রা যোগ করে। এই নির্মাণ ছাড়াও দালানটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল একটি গম্বুজাকৃতির শিবমন্দির, রাসমঞ্চ আর তিনটি দোল মন্দির। সেই তিনটির মধ্যে একটি এখন অবশিষ্ট।

তবে সিংবাড়ির পুজোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, এই পুজোর প্রতিমার হাতের মোট সংখ্যা চার। অন্যান্য বাকি পুজোগুলোর মতো দশহাতের দেবী দুর্গা নয়। এখানে মায়ের রুদ্রমূর্তি প্রকাশ পায় না। অভয়া মূর্তি হিসেবেই দেবীর পরিচিতি। চার-হাতের বৈশিষ্ট্য এটাই যে দেবী দুর্গা তাঁর ভক্তদের অভয় দিচ্ছেন, সকল কষ্ট, সকল দুঃসময় কাটিয়ে উঠে যাতে তাঁরা মাথা উঁচু করে স্বাভাবিক জীবনযাপনে করে। প্রত্যেক বছরই প্রতিমা ত্রিভঙ্গ মূর্তির হয়। মহিষাসুর হয় সবুজ বর্ণের। আগে প্রতিমা নির্মাণের কাজ শুরু হত জন্মাষ্টমীর দিনে। কিন্তু, সেই সংক্রান্ত আচার অনুষ্ঠান এগিয়ে এনে রথযাত্রা দিন পালন করা হচ্ছে। সিংহবাড়ির কুলপুরোহিত চ্যাটার্জিরাই পুজো করে থাকেন বনশানুক্রমে। একইভাবে এই পুজোর ঢাকি আর পোটোও বংশানুক্রমেই যুক্ত হন এই ঐতিহ্যশালী পুজোয়।

সিংবাড়ির পুজোয় আজও পশু-বলি হয়। আগে মোষ বলি হত, পরে তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় ছাগবলি। তবে নবমীতে চাল-কুমড়ো, শশা, আখ বলিও হয়। সন্ধিপুজোর লগ্নে বাড়ির মহিলারা ১০৮-টি প্রদীপ বিশিষ্ট দুটি ঝাড়বাতি জ্বালান। চারিপাশের মলিনতা মুছে আলোকময় হয় যায় চারিপাশ। নবমীর রাতে বিশেষ আকর্ষণ ‘রং বাজনা’। সেই আয়োজনে ঢাকীরা দীর্ঘক্ষণ ধরে নানারকম ঢাকের বোল তুলে ও নেচে ঢাক বাজান। নানা প্রান্ত থেকে প্রচুর লোকসমাগম হয়। পুজোয় ভোগ হিসেবে চাল, ফলমূল, সবজি,সন্দেশ ইত্যাদি দিয়ে নৈবেদ্য ও রাত্রে নাড়ু, মিষ্টি প্রভৃতি খাবার দিয়ে শীতলভোগই অপর্ণ করা হয়। প্রতিমা বিসর্জন হয় দশমীর দিনেই।

হুগলী জেলা তথা বাংলার অন্যতম ঐতিহ্যশালী পুজো হিসেবেই আজও সমানভাবে বেঁচে সিংহবাড়ির পুজো। এই পুজোর গন্ধে, ঢাকের আওয়াজে যেমন তিন শতাব্দীর ইতিহাস আছে, ঠিক তেমনই আছে চার-হাত দুর্গার অভয়ামূর্তি। দশপ্রহরণধারিণীর পুজোর মাঝে চতুর্ভুজা দেবী আজও আশ্বাস দিচ্ছেন ভক্তদের। সুদিনের আশ্বাস…