কলকাতা দূরদর্শন, ছোটোপর্দার ইতিহাস
ঠিক ৪৬ বছর আগের কথা। দিনটা ছিল ৯ অগাস্ট। টালিগঞ্জের রাধা ফিল্মস স্টুডিওতে একফালি অফিস। বাংলার চলচ্চিত্র, থিয়েটার, কৃষিকাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য — সবকিছু এক জায়গায় সুন্দর ‘প্যাকেজ’-এ পরিবেশনের দায়িত্ব নিল একটি চ্যানেল। শুরু হল বাংলা তথা ভারতীয় টেলিভিশনের সুবর্ণ যুগ। ছোটোপর্দায় গড়ে উঠল ইতিহাস। কলকাতা দূরদর্শন বা ডিডি বাংলা। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের ১ জুলাই গল্ফগ্রিনে চলে আসে অফিস।
অসমের ডিগবয়ে অবস্থিত ভারতের প্রথম তৈলকূপ। ১৮৮৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এখানে খনিজ তেল উত্তোলন শুরু হয়। ভারতের খনিজ তেল উত্তোলনের সেই ইতিহাস নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রের শুটিংয়ে তথ্যচিত্রটির পরিচালক বিভাস বোস (ডানদিকে)
শুরুর দিন থেকে যেসব অনুষ্ঠান দর্শকদের কাছে ভীষণভাবে জনপ্রিয়তা পেয়ে এসেছে এবং বাংলায় সেই সময় যখন চলচ্চিত্র, সাহিত্য, সংবাদপত্রের যথেষ্ট উৎকর্ষতা, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে টেলিভিশনের নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়েছিল দূরদর্শনের মাধ্যমে। শুরুর সময় থেকেই দূরদর্শনের পর্দায় তথ্যচিত্রের একটি বিশেষ স্থান ছিল। বহু তথ্যচিত্র পুরস্কারও পেয়েছে। শুধু এদেশেই নয়, বিদেশেও। গতবছর সেইসব তথ্যচিত্র নির্মাণের কথা উঠে এসেছে পঙ্কজ সাহা, বিভাস বোসের মতো বর্ষীয়ান নির্মাতাদের স্মৃতিচারণায়।
খেলাধুলার সম্প্রচার হত নিয়মিত। ফুটবলের শহর কলকাতা, আর সেই কলকাতা ময়দানের একটি ঐতিহাসিক দিন ছিল যেদিন নিউ ইয়র্ক কসমস ক্লাবের হয়ে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে খেলতে এসেছিলেন ফুটবল-সম্রাট পেলে। সেই ম্যাচের সরাসরি সম্প্রচার হয়েছিল। ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন প্রবাদপ্রতিম অজয় বসু। কিংবদন্তি শিল্পীদের গান ও আড্ডায় ভরে ওঠা ‘কথায় ও সুরে’ – কীভাবেই বা এত মানুষকে নিয়ে এইসব অনুষ্ঠান সম্ভব হয়েছিল, টেলিভিশনের মতো নতুন মাধ্যমকে তাঁরা আপন করে নিলেন, তা আজও বিস্ময়। কলকাতা দূরদর্শনে প্রথম যাঁর মুখ ভেসে উঠেছিল পর্দায়, সেই শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন, “নমস্কার, আজ থেকে কলকাতা টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হল।”
আগস্ট, ১৯৭৫। প্রথম দিনের ঘোষণায় শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত – “নমস্কার, আজ থেকে কলকাতা টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হল”
দূরদর্শনে হয়েছে প্রচুর সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুষ্ঠান। জীবন্ত কিংবদন্তিদের এক-একটি পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠান আয়োজন করা হত। এখন ইউটিউবে প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায় সেইসব দুর্লভ সংগ্রহগুলি। কিন্তু এর পিছনের ঘটনাগুলির কথা আর কজনই বা জানেন। ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতেন যেসব প্রযোজকরা, তাঁরাও তো এক-একজন দিকপাল। কিংবা সম্পূর্ণভাবে ছোটোদের জন্য তৈরি হওয়া অনুষ্ঠানগুলি! ‘চিচিং ফাঁক’-এর সেই বঙ্গখ্যাত মাইকেল! কত রঙিন ছিল সেইসব অনুষ্ঠান।
দূরদর্শনে একসময় প্রযোজিত হয়েছিল প্রচুর নাটক এবং নৃত্যনাট্য। তৃপ্তি মিত্র নির্দেশিত ‘ডাকঘর’-এর প্রযোজনা যেমন সুবিখ্যাত। এছাড়াও অন্যান্য রবীন্দ্র-নৃত্যনাট্য যেমন ‘শ্যামা’, ‘চণ্ডালিকা’, ‘চিত্রাঙ্গদা’-র প্রযোজনাও এখানকার মঞ্চে। নাটক ছাড়াও নাটকের শিক্ষাদানের বিশেষ অনুষ্ঠান অবধি আয়োজিত হয়েছিল দূরদর্শনে।
অন্যদিকে, আকাশবাণীর ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র মতোই সমান নস্টালজিক ছিল দূরদর্শনের ‘মহালয়া’। এই অনুষ্ঠানও শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছিল গ্রাম-মফস্সলে। প্রথমে মহালয়া কীরকম ছিল, পরে কী ধরনের পরিবর্তন এল! জগন্নাথ মুখোপাধ্যায়, শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্তরা ছিলেন প্রযোজক। একসময়ে বাংলার ঘরে ঘরে জীবন্ত ‘দনুজদলনী দুর্গা’ হয়ে উঠেছিলেন যিনি, সেই প্রখ্যাত সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও আজও ভোলেননি বিশ্বের বাঙালি।
প্রথম ‘সাহিত্য সংস্কৃতি’ অনুষ্ঠান। একদম বাঁদিকে দাঁড়িয়ে আছেন পঙ্কজ সাহা। তারপর (বাঁদিক থেকে) বনফুল, গোপাল হালদার, রাধারাণী দেবী, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও সংযোজক স্বপন মজুমদার
১৯৭৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় কলকাতা দূরদর্শন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, তার পিছনে ছিলেন পঙ্কজ সাহা। দূরদর্শনে একসময়কার জনপ্রিয় টেলিছবি ও টেলিসিরিয়াল আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ‘টেনিদা’ থেকে শুরু করে ‘তেরো পার্বণ’, ‘বিবাহ অভিযান’ থেকে শুরু করে ‘জননী’, ‘জন্মভূমি’।
ইডেনের সবুজে পেলের স্কিল প্রদর্শন
কলকাতা দূরদর্শনে প্রায় বাইশ বছর সংবাদ প্রযোজক হিসাবে কর্মরত ছিলেন সুমিত বন্দ্যোপাধ্যায়। দূরদর্শনের একেবারে শুরুর দিকের কথা। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি ‘বঙ্গদর্শন’-কে জানালেন, “দূরদর্শন ছিল আমাদের গর্ব করার মতো জিনিস। শিল্প-সাহিত্য-খেলা-বিনোদন এই এতকিছু মানুষ দেখতে পাবেন ছোটোপর্দায় বাড়িতে বসেই। এই ভাবনার শরিক হতে পারার একটা আলাদা আনন্দ আছে। এই দীর্ঘ ৪৬ বছরে আমি অনেক সহকর্মীদের হারিয়েছি। তাই ৯ অগাস্ট বারবার তাঁদের কথা মনে পড়ে। আমি চাই দূরদর্শন কারোর সঙ্গে কোনো প্রতিযোগিতায় না থেকে নিজ উদ্যমে এগিয়ে যাক আরও অনেক অনেক বছর।”
‘দনুজদলনী দুর্গা’ রূপী সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়
ছবি সৌজন্যেঃ কলকাতা দূরদর্শন এবং সোহম দাস