‘গাছ দত্তক’ – অনাথ গাছেদের আশ্রয় খুঁজে দিচ্ছে সোমনাথ ঘোষের বৃক্ষ ফাউন্ডেশন

বৃক্ষ ফাউন্ডেশন : গাছেদের অনাথ আশ্রম

যারা মা-বাবাকে হারিয়ে অনাথ হয়েছে অথবা পরিত্যক্ত সন্তান হিসেবে অনাথ, স্বচ্ছন্দে জীবন কাটানোর জন্য এই সমাজ তাদের কাজে সত্যিই বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ নয় সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে পারে, একটা গাছ পারে কি? প্রতিকূল পরিবেশে প্রতিনিয়ত টিকে থাকার সংগ্রাম জারি রাখতে হয় উদ্ভিদদের। প্রকৃতি আমাদের শিখিয়েছে দলবদ্ধ ভাবে থাকার মানে। একজন মানুষ তখনই ‘অনাথ’ হয় যখন সমাজ তাকে একা করে তোলে। কেউ অসহায় হলে, তাকে আশ্রয় দিতে জানতে হয়। গাছেদের ক্ষেত্রে তো এই আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা অনেক গুন বেশি। সবকিছুর পরেও মানুষ মানুষের জন্য কিন্তু গাছেদের জন্য কে? এই বোধ সকলের মধ্যে থাকে না। যাঁদের থাকে, তাঁরা হন ব্যতিক্রমী। সেরকমই একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা সোমনাথ ঘোষ (Somnath Ghosh)। তাঁর এবং আরো কয়েকজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গত বছর অর্থাৎ ২০২১-এ বোলপুরে তৈরি হয়েছে ‘বৃক্ষ ফাউন্ডেশন’ (Brikkho Foundation) নামে একটি গাছেদের অনাথ আশ্রম তথা আশ্রয় ।

হোমো স্যাপিয়েন্স অর্থাৎ মনুষ্য জাতির আবির্ভাবের অনেক আগে থেকে—লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীর বুকে বসবাস গাছেদের। বিশ্ব বাঁচাতে সবুজায়ন অন্যতম পথ। কেন্দ্রের অনুমোদনে এই সংস্থা সরাসরি এবং ওয়েব সাইটের মাধ্যমে গাছের চারা দত্তক (Tree Adoption) দিচ্ছেন৷ এমনকি দত্তক নেওয়া চারা রোপণের জন্য জমি দেওয়া এবং তার পরিচর্যা করার দায়িত্বও নিচ্ছে বৃক্ষ ফাউন্ডেশন ৷

শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? শান্তিনিকেতনের বাসিন্দা সোমনাথ কলকাতার হাই-টেক অ্যানিমেশন ইনস্টিটিউট থেকে ফিল্ম এডিটিং-এর উপর একটি পেশাদার কোর্স করেন। শেষ হওয়ার পর, তিনি শান্তিনিকেতনে ফিরে যান এবং তার নিজস্ব মাল্টি-মিডিয়া প্রোডাকশন হাউস, ‘ছায়া-ছবি ইন্ডিয়া’ শুরু করেন। তথ্যচিত্র, শর্ট ফিল্ম, বিজ্ঞাপন, পোস্টার ডিজাইন ইত্যাদি তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং অল্পদিনের মধ্যেই এই পেশায় নিজের পরিচিতি তৈরি করেন। ইতিমধ্যে, গ্রামীণ উন্নয়নের উপর একটি পূর্ণ-সময়ের স্নাতক কোর্সের জন্য বিশ্বভারতীতে যোগ দেন সোমনাথ।২০২০ সালে, যখন অতিমারী শুরু হয়, বিশ্বভারতী সহ সমস্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। তখন তিনি তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তারপর আর পড়েননি। এই সময়টা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।  ধীরে ধীরে তাঁর মনোযোগ তৈরি হয় সমাজের জন্য ইতিবাচক কিছু করার জন্য।লকডাউন চলাকালীন সময়ে অভুক্ত –অসহায় প্রাণীদের জন্য টানা ১৫০দিন খাবার জোগান দেন তিনি। আমফানের সময়ও দূরবর্তী গ্রামে ঘুরে ঘুরে আর্তদের পাশে দাঁড়ান। এর মধ্যেই তাঁর এক শিক্ষক তাঁকে জানান যে একজন গাছ-নার্সারি মালিক ৪০০টি চারা দান করতে চাইছেন। সোমনাথ সেই চারাগুলোর দায়িত্ব নিতে চান কিন্তু এত চারা রোপণের জন্য জমি তাঁর কাছে ছিল না। “একটা চারা লাগিয়ে দিলাম আর আমার দায়িত্ব শেষ হয়ে গেল এরকম হয় না। একটা গাছের পিছনে ততটাই সময় ও গুরুত্ব দিতে হবে, যতটা আপনি আপনার পরিবারের মানুষকে দেন। একটা মানসিক বন্ধন তৈরি হওয়াটা এক্ষেত্রে বাঞ্ছনীয়। ভেবে খারাপ লাগে যে আমি শুরুতেই গাছগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারিনি।” বলেন সোমনাথ।

তারপর বর্ধমান বনবিভাগের জন্য দুটি তথ্যচিত্র বানানোর সময় গাছের রক্ষণাবেক্ষণ জনিত সমস্যার মুখোমুখি হন তিনি। ক্রমশ বুঝতে পারেন গাছ লাগানো আর তার যত্ন নেওয়া দুটো ভিন্ন বিষয়। রক্ষণাবেক্ষণের দুরাবস্থার জন্যই মূলত ভারতে বনভূমির গভীরতা হ্রাস পাচ্ছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছেসেবী সংস্থা এবং বনবিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে সোমনাথ এই ধারণায় উপনীত হন যে, এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে আমরা বড়োসড়ো বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে চলেছি।

এর পরেই নিজের মাল্টি-মিডিয়া হাউসের জন্য তাঁর কেনা সমস্ত সরঞ্জাম বিক্রি করে দেন সোমনাথ এবং ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প ‘বৃক্ষ ফাউন্ডেশন’। বোলপুরের মকরমপুরে এই সংস্থার অফিস থেকে যে কেউ নিজের পছন্দ মতো গাছ দত্তক নিতে পারবেন। এমনকি গাছ রোপণ করার জায়গাও দেবে এই সংস্থা। তবে, সেক্ষেত্রে এককালীন খরচ করতে হবে। পরিচর্যার জন্য এককালীন কিছু টাকার বিনিময়ে একটি অরণ্যজাত গাছ দত্তক নেওয়া যাবে। দত্তক নেওয়া গাছের দেখভাল করেন বৃক্ষ ফাউন্ডেশনের সদস্যরাই। তাদের তৈরি ওয়েবসাইট (brikkhofoundation.com)-এর মাধ্যমেও দূরদূরান্তের মানুষজনও গাছ দত্তক নিতে পারবেন। যে যান দত্তক নেওয়া হচ্ছে, সেই গাছ ছোটো থেকে বড়ো হওয়ার সমস্ত তথ্য ওয়েবসাইটে আপলোড করে সংস্থাটি।

বোলপুরের কঙ্কালীতলা এলাকায় রয়েছে এই সংস্থার বনভূমি। সেখানেই বেড়ে ওঠে দত্তক নেওয়া গাছগুলি। ভারত সরকারের বনবিভাগের তরফে অনুমোদন পেয়েছে এই সংস্থা। পুরোনো বাড়ির দেওয়ালের ফাটলে আগাছার মতো বট, অশ্বত্থ গাছের চারা বের হয়। সেই চারাগুলি সংগ্রহ করে সংস্থার তরফে সংগ্রহ করা হয়।

এই কর্মসূচীর শুরু থেকেই বহু মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন, উৎসাহ পেয়েছেন একটি গাছ ‘দত্তক’ নিতে। ‘ধ্বংসের মুখ থেকে একটা জোনাকির মতো এই পৃথিবী ঘুরে দাঁড়াক’ এই স্বপ্ন নিয়েই তৈরি হয়ছিল ফাউন্ডেশনটি। ‘বৃক্ষ ফাউন্ডেশন’-এর সোমনাথরা তাই সাবলীল ভাবে বলেন, ‘অনেক কিছুই তো করলেন, এবার একটা গাছ দত্তক নিন।’

তথ্যসূত্রঃ
গেট বেঙ্গল
বৃক্ষ ফাউন্ডেশন

Developed by DXDasia