ফুল ও টেডি ব্যবসায়ীদের চোখে শহরে বসন্তের কথোপকথন

উপহারে-উষ্ণতায় ভরা ফেব্রুয়ারির শহরে ভালোবাসার একটা দিন

“নাগরিক ক্লান্তিতে তোমাকে চাই,
এক ফোঁটা শান্তিতে তোমাকে চাই,
বহুদূর হেঁটে এসে তোমাকে চাই,
এ জীবন ভালোবেসে তোমাকে চাই..” (কবীর সুমন)

ফেব্রুয়ারি মাস মানেই শহরে ভালোবাসার মরশুম – “বসন্ত জাগ্রত দ্বারে”। হাতে গোলাপ, মনে বসন্তের ছোঁয়া – এসবকে সঙ্গে করেই শুরু হয়ে যায় বছরের প্রেম পার্বণ। রোজ ডে দিয়ে শুরু, এরপর প্রোপোজ ডে, চকোলেট ডে, টেডি ডে, প্রমিস ডে, হাগ ডে, কিস ডে এবং সর্বশেষ হল বহু প্রতীক্ষিত ভ্যালেন্টাইন্স ডে। টানা এক সপ্তাহের প্রেম পর্ব। ভালোবাসার প্রতিটা অনুভূতিকে আলাদা আলাদা করে সেলিব্রেট করা হয় এই ফেব্রুয়ারির শহরে। শুধু শহর বললে ভুল হয়, শহরতলি জুড়েও প্রেমের বাহারি সাজে আলো হয়ে ওঠে সবকিছু।

আরও পড়ুন: প্রেম-অপ্রেম

আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি। ভালোবাসার দিন। ভালোবাসার আলাদা করে কোনো দিনক্ষণ হয় না, তবুও তার উদযাপনে অন্যরকম তৃপ্তি খুঁজে পায় মানুষ। ফ্রেব্রুয়ারির শহর তাই প্রেমময়। বাঙালি চিরকালই উৎসবের আমেজে শহরকে সাজিয়ে তুলতে ভালোবাসে। প্রেমের উৎসবেও সে সাজিয়ে নেয় নিজেকে। তবে এই উৎসবের আলো আজ তিলোত্তমা ছাড়িয়ে শহরতলির অলিতে-গলিতে। রং-বেরঙের বাহারি উপহারে সেজে উঠেছে সবকিছু। বছরের এই কটাদিন পথ চলতে গেলে বারবার চোখ চলে যায় সেইসব উপহারের দোকানের দিকে। 

মৌসুমি ভৌমিক তাঁর গানে বলেছেন, “আমাদের ভালোবাসা এখনও গোলাপে ফোটে…”

তাই ভালোবাসার উপহারের দলে জাঁকিয়ে বসে গোলাপ ফুল। লাল গোলাপকে প্রেমের প্রতীক মনে করেন অনেকেই। গোলাপের গন্ধ মিশে যায় প্রেমে। মায়াবী হয়ে ওঠে সম্পর্কের আনাচ-কানাচ। ভালোবেসে কেউ প্রেমিকার মাথায় গুঁজে দেন ফুল, কেউ আবার উপহারের ফুলকে যত্ন করে রেখে দেন গল্পের বইয়ের প্রিয় কোনও পরিচ্ছেদের খাঁজে।

এই সময় পাশের মানুষটির জন্য ভালোবেসে ফুল কিনে নিয়ে যান শহরবাসী। আজকের প্রেমের শহরে ফুলের বাজার কেমন আছে, সেই খোঁজ নিতেই কথা বলেছিলাম বালিগঞ্জ স্টেশন বাজারের ফুল বিক্রেতা রবি নায়েকের সঙ্গে। নয় নয় করে কুড়ি বছর তিনি রয়েছেন এই ব্যবসায়। প্রতি বছর কত প্রেমিক-প্রেমিকার হাতে ফুল তুলে দেন তিনি। বছরের অন্যান্য সময়ের থেকে এই সময়টায় তাই খানিক বেশি লাভ করেন ফুল ব্যাবসায়ীরা। প্রেমের সেলিব্রেশনে দামের হিসেব করে না অনেকেই। রবি নায়েক জানান, “দেখুন, ফুল সব সময়েই মরুশুমের ব্যাবসা। বিয়েবাড়ি, অনুষ্ঠানবাড়ি কিংবা বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মীপুজো এসব দিন হিসেব করেই ব্যাবসা ভালো হয়। আর এই ভ্যালেন্টাইনস ডে’র সময় ভালো জমে গোলাপের বাজার। কাস্টমার তো দরদাম করবেই। তবে অনেকেই এমন আসেন যাঁরা দরদাম করতে চান না। তাঁদের বাজেটও বেশ বেশি থাকে।”

ভালোবাসার উপহারে ফুল 

তাঁর কাছে নাকি প্রতি বছর অন্তত এমন একজন কিশোর বা কিশোরী আসবেই, খুচরো পয়সা গুনে কুড়ি বা তিরিশ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবে, “এতে যা হয় দিন।” এসব সময়ে অবশ্য ব্যবসার কথা মাথায় রাখেন না তিনি। খানিকটা লোকসান করেই তাদের হাতে প্রেমের উপহার সাজিয়ে দেন।

এমনিতে ঘোর ব্যবসায়ী রবিবাবু। বললেন, “চাহিদা বাড়লে দাম তো বাড়বেই। এই দু-একটা দিনেই তো বিক্রিবাট্টা ভালো হয়।” তবে ফুলের বাজার এখন একটু মন্দার দিকে। করোনার প্রভাব যে ফুল ব্যাবসাকেও আঘাত করেছে এমন কথাও বললেন তিনি, “চারদিকে সবাই কাজ হারাচ্ছে, খাবার টাকা জোগাতেই নাজেহাল অবস্থা। এর মধ্যে ফুল কেনার বিলাসিতা করতে চাইছেন না বেশিরভাগ মানুষই।”

শুধু গোলাপ নয় ভ্যালেন্টাইনস ডে-র উপহারের তালিকায় রয়েছে টেডি বিয়ার, গ্রিটিংস কার্ড, চকলেট, শোপিস, ইত্যাদি নানাধরনের স্টেশনারি আইটেমও। গড়িয়াহাট বাজারের ফুটপাথ ধরে হাঁটলে পরপর চোখে পড়ে এইসব বাহারি উপহারের দোকান।

প্রেমের উপহার টেডি বিয়ার 

ছোট্টো দোকান, পাকা ছাউনি পর্যন্ত নেই। অথচ উপচে পড়া টেডি বিয়ারের ভারে আসল মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া দায়। আলাপ হল টেডি-বিক্রেতা শিবদাস মণ্ডলের সঙ্গে। কথায় কথায় জানলাম তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে এই হাতি, ঘোড়া, ভাল্লুকদের সঙ্গে সহবাস করছেন। আগে বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে ছোটোদের জন্য এসব কেনার চাহিদা ছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাঙালির হুজুগ বদলেছে। কয়েক বছর ধরে প্রেমের উপহারেও জুড়ে বসেছে এরা।

বাঘ-ভাল্লুক-সিংহরা 

শিবদাসবাবু বলেন, “জানেন তো, এই করোনা এসে সব কিছু ডুবিয়ে দিয়েছে। এত বছর ব্যবসা করছি, এরকম খারাপ বাজার কখনও যায়নি।” বিভিন্ন মাপের ভিন্ন ধরণের টেডিতে ঠাসা দোকান। অথচ লোক আসছে হাতে গোনা কয়েকজন। আমি যতক্ষণ দোকানে ছিলাম, দু-একজন এলেন ঠিকই, তবে বিক্রি হল না সেই অর্থে। শিবদাসবাবু আরও বলেন, “আসলে প্রেম তো করবে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা। ওদেরই তো উৎসাহ বেশি। কিন্তু এখন তো মোবাইলের যুগ। পড়াশোনা অনলাইনে, প্রেমও অনলাইনে। সবাই তাই টেডি না কিনে টেডির স্টিকার পাঠিয়েই প্রেম বিনিময় করছে। পকেট ফ্রেন্ডলি কিনা!”

উপহারে -উষ্ণতায় প্রেমের কথোপকথন

গড়িয়াহাট অঞ্চলের আর এক টেডি বিক্রেতা নিজে থেকেই ডেকে কথা বলতে চাইলেন আমার সঙ্গে। নাম শম্ভু পাল। উনিও অনেক বছর রয়েছেন এই ব্যাবসায়। “এইসব প্রোডাক্ট আসে চিন থেকে। লোকাল যেগুলো তৈরি হয় সেগুলোর দাম বেশি হয়। আর এমনিতেও দাম এত বেড়ে গেছে যে, লোকের পছন্দ হচ্ছে, দোকানে আসছেন, দেখছেন, কিন্তু দাম শুনে আর কিনতে চাইছেন না অনেকেই। আমাদেরও হাত-পা বাঁধা, লস করে তো দিতেও পারছি না”, এমনটাই বলেন শম্ভুবাবু।

টেডির দুনিয়া ছাড়িয়ে আর একটু হেঁটে আসতেই চোখ পড়লো বিভিন্ন রকমের শোপিস দিয়ে সাজানো একটি দোকানে। দোকানের মালিক প্রশান্ত মুখার্জি তখন একটি ‘প্রেমের’ উপহার দরদামে ব্যাস্ত। ভিড় একটু কমতেই কথা হল তাঁর সঙ্গে। গত তিরিশ বছর ধরে তিনি তাঁর ছোট্টো দোকানে নানা সিজনে রকমারি জিনিস বিক্রি করেন। দোলের সময় রং, নববর্ষে পঞ্জিকা কিংবা কালীপুজোয় বাজিপটকা। ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে সেরকমই বিক্রি করেন স্টেশনারি আইটেম। প্রশান্তবাবু বলেন, “সারা বছর টুকটাক বিক্রিবাট্টা লেগেই থাকে। তবে এই সময় কমবয়সী ছেলে মেয়েদের ভিড় বেশি হয়। আজকাল সব নানারকমের ‘লাভ’ আঁকা শোপিস বেরিয়েছে। দামেও সস্তা। তাই এসবের চাহিদা বেশি থাকে।”

প্রেমের  মএশুমে রকমারি উপহার

কথা শেষ করে ফেরার বাস ধরব বলে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় নজরে পড়ল একদল ছেলে-মেয়ে কাঁচের দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসছে। হাতে প্রেমের অন্য আর একটি উপহার, গ্রিটিংস কার্ড। দোকানের ঢুকে জানতে চাইলাম কেমন চলছে প্রেমের বাজার?

দোকানের মালিক স্বপ্না বসু জানালেন, “ছাপা গ্রিটিংস কার্ডের থেকে আজকাল হাতে আঁকা গ্রিটিংস কার্ডের চাহিদা বেশি। ইদানীং  আবার কার্ড, চকলেট, অন্যান্য উপহার সব একসঙ্গে বাক্সে করে সাজিয়ে দেওয়ার চল হয়েছে। সেগুলোরও ভালোই চাহিদা।” আসলে প্রেমে খানিক হাতের ছোঁয়া থাকলে বোধহয় ভালোবাসার স্বাদেও নতুনত্ব আসে।

এসময় “শহর জুড়ে যেন প্রেমের মরশুম”। উপহারে-উষ্ণতায় ভরপুর ভালোবাসার দিন আজ। হাতে হাত রেখে চেনা-অচেনা জীবনটাকে উপভোগ করার একটা দিন। তবে সময় বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে বাজারও। উপহারের ভাবনায় আসছে নতুন নতুন প্রকরণ। কিন্তু ভ্যালেন্টাইনস ডে-র উষ্ণতা তাতে ফিকে হয়ে যায় না একটুও। সব বয়সেই আজ ভালোবাসার সেলিব্রেশনের ছবি। শহরের রাস্তা জুড়ে এ কটা দিন উপচে পড়ে প্রেম। ছোটো-বড়ো দোকানে ভিড় জমে যুগলের। পকেটের সঙ্গে সামঝোতা করে উপহারও বেছে নেন তাঁরা।

তারপর? তারপর, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে দেখা হয় মনের মানুষটির সঙ্গে, কথা হয়। অজানা উপহার দেখে হয়তো চমকে যান মানুষটি। আর সেই চমক ভেঙেই চড়তে থাকে ভালোবাসার উষ্ণ পারদ। আর এভাবেই পরিচিত ছন্দে শহরে শুরু হয় বসন্তের কথোপকথন।

Post Tags
Developed by DXDasia