সমস্ত ভয়কে জয় করেছেন পশ্চিম বর্ধমান-পানাগড়ের প্রিয়া, চুমকি
পশ্চিম বর্ধমানের (Paschim Barddhaman) প্রত্যন্ত এক গ্রামে দিশা দেখাচ্ছেন দুই গৃহবধূ। সংসারের হাল ধরার লক্ষ্য নিয়ে তাঁদের হাতে পৌঁছে গেছে স্যাক্সোফোন। একের পর এক সুর নতুনভাবে উঠে আসছে তাঁদের বাজানো বাদ্যযন্ত্রটিতে। শুধু গ্রামই নয়, গোটা বাংলাকে সুরের জাদুতে মাত করছেন প্রিয়া, চুমকি।
এখনও সমাজ পুরুষতান্ত্রিক। কিছু মাতব্বরের চোখ রাঙানিতে এখনও তটস্থ থাকতে হয় অজস্র মেয়েকে। তবুও তার মধ্যেই কিছু মেয়ে নিজেদের জেদকে সম্বল করে সব বাঁধ ভেঙে এগিয়ে চলেছেন কাজের দৌড়ে, স্বপ্নের দৌড়ে। তেমনই দুই মহিলা প্রিয়া বাদ্যকর (Priya Badyakar) এবং চুমকি বাদ্যকর (Chumki Badyakar)। থাকেন বর্ধমান পানাগড়ের কাঁকসা গ্রামে। দুজনের কেউই বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি। বিয়েও হয়ে যায় অল্প বয়সে। কিন্তু সংসারের জাঁতাকল কদ্দিনই বা আর ভালোলাগে! নতুন কিছু করতে চান তাঁরা।
প্রিয়া, চুমকিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্যাক্সোফোনে হাতেখড়ি ২০১৯-এর শুরুতে। সেই অর্থে খুব বেশিদিন হয়নি। কিন্তু বাজনা শুনলে মনে হবে না যে তাঁরা নতুন।

ওঁরা বাড়ির বউ। স্যাক্সোফোন (Saxophone) বাজাচ্ছেন। এমনটা সচরাচর ভারতবর্ষে দেখা যায় না। প্রিয়া-চুমকিদের সেই প্রত্যন্ত গ্রামে গেলে এখনও হয়তো দেখা যাবে বেশ কিছু বাড়িতে শ্বশুর বৌমাকে অত্যাচার করছে। সেখানে প্রিয়া-চুমকিদের বাড়িতে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য। শ্বশুরের উৎসাহেই দুই বৌমা স্যাক্সোফোন বাজাচ্ছেন, এমনকি তাঁদের ননদের মেয়ের মুখেও এখন স্যাক্সোফোনের সুর।
স্বামী, শ্বশুর যখন অশ্বত্থের মতো ছায়া দিয়ে যাচ্ছেন, তখন চিন্তা কী! বর্ধমান পানাগড়ের কাঁকসা গ্রামের সামান্য গৃহবধূ থেকে আজ সফল স্যাক্সোফোন-বাদক।
প্রিয়া, চুমকিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্যাক্সোফোনে হাতেখড়ি ২০১৯-এর শুরুতে। সেই অর্থে খুব বেশিদিন হয়নি। কিন্তু বাজনা শুনলে মনে হবে না যে তাঁরা নতুন। ২০২০-র মার্চ মাসে লকডাউন ঘোষণা হবার পর বাড়ির শ্বশুর এবং স্বামীরা গৃহবন্দি হয়ে পড়লেন। সমস্ত কাজ চলে গেল। তারপরেই দুই বৌমার মাথায় আসে এমন একটি চিন্তা। স্যাক্সোফোন শিখলে কেমন হয়! তাতে তো সংসারে দুটো টাকা আসতে পারে। তিন মাসের মধ্যেই তাঁরা তুলে ফেললেন একটি সম্পূর্ণ গান।

কিন্তু যেকোনো গান বা সুর অনুধাবন করার জন্য স্বরলিপি জানার প্রয়োজন। তাঁরা স্বরলিপি খুব বেশি বোঝেন না। শ্বশুর যেভাবে শিখিয়েছেন, সেটাই অনুসরণ করার চেষ্টা করেন। ঠিক যেভাবে বাঁশি শেখানো হয়, সেভাবেই স্যাক্সোফোন শিখিয়েছেন শ্বশুরমশাই। তবে সুর ভিতরে থাকলে আর একবার কানে বেঁধে গেলে, কোনো বাদ্যযন্ত্রেই তা তুলতে অসুবিধা হবার কথা নয়। এমনটাই মনে করেন তাঁরা।
করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। এখন বেশকিছু শো পাচ্ছেন তাঁরা। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বিভিন্ন শোয়ে তাঁরা বাজাচ্ছেন এবং শ্রোতারা প্রশংসা করছে তাঁদের সুরধ্বনিকে।
করোনা কেড়ে নিয়েছিল স্যাক্সোফোন বাদক এবং তাঁদের শ্বশুর পবন বাদ্যকরের (Paban Badyakar) কাজ। এমনকি মহামারিতে চলে গিয়েছিল ব্যান্ড-সহ অন্যান্য কাজও। তখনই শ্বশুরের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসেন দুই বৌমা প্রিয়া ও চুমকি। মনোযোগী ছাত্রী পেয়ে শ্বশুর আরও উৎসাহ পান। এবং শেখাতে থাকেন একের পর এক গানের সুর। চৌকাঠ পেরিয়ে জগৎ দেখার সেই শুরু। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। চুমকি বাদ্যকর জানাচ্ছেন, “দেখলাম, পারি কিনা। খুব চেষ্টা করলাম। শ্বশুরবাড়িতে আসার পর থেকেই তো দেখছি নানান গান বাজছে। শ্বশুর, স্বামীরা প্র্যাকটিস করছে। তাই সুরগুলো ভিতরে রয়ে গিয়েছিল। ফলত স্যাক্সোফোনে সুর তুলতে অসুবিধা হয়নি।”
শখ পূরণে সমাজের নির্ধারিত নিয়মের বাইরে গেলেই চোখ রাঙানি। মাতব্বরদের শাসানির ভয়। এতকিছু জয় করে চুমকি, প্রিয়ারা সুরের নৌকায় চলেছে বিশ্ব ভ্রমণে। দেখেছে পৃথিবীটা কত বড়ো। কত মানুষের কত স্বপ্ন। তাহলে ওদের স্বপ্ন পূরণ হবে না কেন! আর স্বামী, শ্বশুর যখন অশ্বত্থের মতো ছায়া দিয়ে যাচ্ছেন, তখন চিন্তা কি! বর্ধমান পানাগড়ের কাঁকসা গ্রামের সামান্য গৃহবধূ থেকে আজ সফল স্যাক্সোফোন-বাদক। সঙ্গে তাঁরা পেয়েছেন ননদের এগারো বছরের মেয়ে সঙ্গীতাকেও। প্রত্যেকটা অনুষ্ঠানে সাড়ে তিন ঘণ্টা বাজিয়ে মিলছে বারো হাজার টাকা। তাতেই খুশি তাঁরা। ফোন আসছে একাধিক। বাড়ির সকলেই এখন খুশি। সংসারে হাসি আনতে পারার এই অদম্য জেদ তাঁদের আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে নিশ্চিত।
____
সৌজন্য স্বীকারঃ জিনাত রেহেনা ইসলাম