দুর্গাপুজোর ইউনেস্কো স্বীকৃতিতে ‘বঙ্গদর্শন’-এর ভূমিকা এবং গর্বের শোভাযাত্রা

“আজ থেকেই আমাদের দুর্গাপুজো শুরু হয়ে গেল” শোভাযাত্রার শুরুতেই বললেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী

তবছর অর্থাৎ ২০২১-এর ডিসেম্বরে সুদূর প্যারিসে শোনা গিয়েছিল ঢাকের আওয়াজ – বাঙালির জন্য গর্বের খবর। ডিসেম্বরেই অকাল বোধন হয়েছিল বাঙালির মহোৎসবের। ইউনেস্কো হেরিটেজ তালিকায় স্থান পায় বাঙালির প্রধান উত্সব দুর্গাপুজো। ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এই উৎসবকে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, ব্রাজিল, বলিভিয়ার মতো বিশ্বের মাত্র ৬ দেশের উৎসব এখনও পর্যন্ত ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে। দুর্গাপুজোর সর্বজনীনতা বাংলাকে সার্বিক ভাবে ‘বিশ্ব-বাংলা’-য় রূপান্তরিত করে। এই স্বীকৃতিস্বরূপ ধন্যবাদ জানাতে ১ সেপ্টেম্বর প্রাক্‌ পুজো মিছিলের ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেইমত আজ, বৃহস্পতিবার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির তোরণের সামনে থেকে দুপুর দুটো নাগাদ শুরু হয় শোভাযাত্রা। চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, ডোরিনা ক্রসিং,রানি রাসমণি অ্যাভিনিউ হয়ে মিছিল রেড রোড পর্যন্ত। বিধি মেনে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ অন্যান্য মন্ত্রী, সাংসদ, শহরবাসী, আদিবাসী, টেলিতারকা, বিভিন্ন পুজো কমিটির সদস্যেরা এবং স্কুলপড়ুয়ারা পদযাত্রায় অংশ নিয়েছেন।

মুখ্যমন্ত্রীর ডাকে জোড়াসাঁকো থেকে শুরু দুর্গাপুজোর পদযাত্রা

দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে, এটা আমাদের কাছে নিশ্চিত গর্বের বিষয়, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ধরনের ঐতিহাসিক ঘটনার অন্তরালে কিছু প্রস্তুতি পর্বের কথা থেকে যায়। অনেক সময় যা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়। অনেকেই জানেন না, দুর্গাপুজোর ইউনেস্কো স্বীকৃতিতে বঙ্গদর্শন-এরও কিছু ভূমিকা রয়েছে। ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রধান সচিব অত্রি ভট্টাচার্য শিল্প-গবেষক, সমালোচক, শিক্ষক দেবদত্ত গুপ্ত-কে একটি চিঠি দেন। সেই চিঠিতে দেখা যায়, তিনি জানিয়েছেন যে ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে একটি ওয়ার্কশপ হবে। যেখানে ইউনেস্কোর হেরিটেজ তালিকায় বাঙালির দুর্গাপুজো যাতে স্বমহিমায় জায়গা পায়, তার জন্য পথ অনুসন্ধান করা হবে। সেই সূত্রেই একজন এক্সপার্ট হিসেবে দেবদত্ত গুপ্ত-কে ওই কনভেনশনে বক্তব্য রাখতে হবে।

২০১৯ সালে আলোচ্য অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন দেবদত্ত গুপ্ত

এই ঘটনা নিয়ে, চিঠি প্রাপ্তির বেশ আগে থেকেই ব্যক্তিগতভাবে ভাবনা চিন্তা শুরু করেছিলেন বঙ্গদর্শন-এর কর্ণধার শ্রী ইন্দ্রজিৎ সেন। তিনি একাধিক আলাপচারিতায় দেবদত্ত গুপ্ত-র থেকে জানতে চান, ঠিক কী কী কারণে দুর্গাপুজোকে ইউনেস্কোর হেরিটেজ তালিকাভুক্ত করা যায়। সেই সূত্র ধরে ‘বঙ্গদর্শন’ টিম দুর্গাপুজো সংক্রান্ত একাধিক লেখালিখি প্রকাশ করতে শুরু করে। এই কথাটুকু বলে আবার ফিরে আসি পর্যটন বিভাগের চিঠিটির প্রসঙ্গে।

ওই দপ্তরের অন্যতম আধিকারিক সুবীর চ্যাটার্জির কাছ থেকে ফোন আসে। তিনি দেবদত্ত গুপ্ত-কে জানান, ইন্দ্রজিৎবাবুর সঙ্গে কথোপকথনের সূত্রেই দপ্তর জানতে পারে যে, দেবদত্তবাবু দুর্গাপুজো নিয়ে বেশ কয়েকবছর যাবৎ ললিতকলা একাডেমির একটি প্রোজেক্ট করেছেন, সেই সূত্রেই এই আমন্ত্রণপত্র। এই পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে ইউনেস্কোর প্রথম অধিবেশনে দেবদত্তবাবুর  বক্তব্য রাখার সুযোগ হয়।

দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য, পরম্পরা, কথ্য ইতিহাস, লিখিত তথ্য, প্রচলিত কথোপকথন ইত্যাদির ভিত্তিতে এবং দেশজ উপাদানের দীর্ঘ ব্যবহারিক পরম্পরা সূত্রে, দুর্গাপুজো কেন ইনট্যানজিবল হেরিটেজ, তার পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য সেখানে দেবদত্তবাবু উপস্থিত করেন এবং দুর্গাপুজো কেন ইনট্যানজিবল হেরিটেজের তালিকাভুক্ত হওয়া উচিত, তার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। অর্থাৎ আজকের এই ঘটনায় বঙ্গদর্শনের পূর্ণাঙ্গ সহায়তা না থাকলে, তাঁর পক্ষে হয়তো বলা সম্ভব হত না, তাঁর যুক্তিগুলি ঠিক কী কী এবং কেন।

ইউনেস্কোর হেরিটেজ তালিকায় বাঙালির দুর্গাপুজো নিয়ে বৈঠকের সেই শুরু

তাই, আজকে মনে হচ্ছে ‘বঙ্গদর্শন’ এবং দেবদত্ত গুপ্ত, তাঁদের কিছু ভূমিকা এর মধ্যে রয়ে গেল। নিঃসন্দেহে তা আমাদের কাছে গর্বের একটি অধ্যায়। পাঠকের মনে হতে পারে, এরকম একটি লেখা হঠাৎ তৈরি করার প্রয়োজন হল কেন। আসলে হেরিটেজ তালিকাভুক্ত হতে গেলে অনেকগুলি পদক্ষেপ থাকে। যে পদক্ষেপগুলির সঙ্গে সরাসরি আমাদের কোনও যোগাযোগ নেই। কিন্তু যে যোগগুলি আমাদের রয়েছে, সেগুলির কোনও উচ্চারণ এখনও পর্যন্ত শোনা যায়নি। সেই কারণে সেই উচ্চারণের নথিটি ধরে রাখার জন্য আজ বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হল এই লেখা। এত বড়ো ঘটনার পিছনে দেবদত্তবাবুর এবং  বঙ্গদর্শনেরও যে কিছু ভূমিকা রয়ে গেল, সেটাও আপনাদের জানানোই আমাদের লক্ষ্য। সেইসঙ্গে ২০১৯ সালে পাওয়া অত্রি ভট্টাচার্যের চিঠি দেওয়া রইল পাঠকদের সুবিধার্থে।

“আজ থেকেই আমাদের দুর্গাপুজো শুরু হয়ে গেল। সমস্ত ধর্ম, বর্ণকে নিয়ে এগিয়ে চলব আমরা। ইউনেস্কোকে ধন্যবাদ। সারা বিশ্বকে ধন্যবাদ।” আজকের শোভাযাত্রার শুরুতেই বললেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী।

২০১৯ সালে দেবদত্ত গুপ্তকে লেখা অত্রি ভট্টাচার্যের চিঠি

শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ঢাকের তালে ধুনুচি নাচ— এক মাস আগেই পুজো শুরু হয়ে গেল বাংলায়। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার সূচনা করে মমতা বলেও দিলেন, “আজ থেকেই আমাদের দুর্গাপুজো শুরু হয়ে গেল। সমস্ত ধর্ম, বর্ণকে নিয়ে এগিয়ে চলব আমরা। ইউনেসকোকে ধন্যবাদ। সারা বিশ্বকে ধন্যবাদ।” কলকাতায় বিভিন্ন সংগঠনের ছোটো ছোটো বা ব্যক্তিগত উদ্যোগ, মহিলাদের অংশগ্রহণ এই উৎসবে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে বলে মন্তব্য করেছে ইউনেস্কো। ইউনেস্কোর ঐতিহ্যবাহী উৎসবের হেরিটেজ তকমা পাওয়ার ফলে কলকাতার দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে পর্যটনের সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে গেল, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। অতীতে এই পুজোকে কী ভাবে পর্যটনের আওতায় আনা যায় সে বিষয়ে বহু পরিকল্পনা করেছে রাজ্য সরকার।

Developed by DXDasia