চন্দননগর স্ট্র্যান্ডের সবথেকে সুন্দর জায়গা
চন্দননগর। বিশাল দুর্ভেদ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মাঝখানে এক টুকরো ফ্রান্স। অবশ্য সরাসরি বোদলেয়ার কিংবা জিদানের ভূখণ্ড নয়, তবে সেই দেশের প্রশাসন এবং সার্বভৌমিকতা পুরোপুরিই হাজির ছিল গঙ্গার ধারে সেই জায়গাটাতে। এমনকি, ফরাসি বিপ্লবের ঢেউও এই শহর এড়াতে পারেনি। সেই উত্তাপ অর্ধেক দুনিয়া পেরিয়ে বাংলায় এসে ১৭৯২ সালে এখানেও একটা ছোটোখাটো বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিল। যার ফলে চন্দননগরের গভর্নরকে কিছুদিনের জন্য তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল গৌড়হাটিতে। এসবের জন্যই তো ‘ফরাসিভূমি’ কিংবা ‘ফরাসডাঙা’ নামগুলো এসেছে। ব্রিটিশদের সঙ্গে যেমন বারবার এখনকার ফরাসি শাসকদের যুদ্ধ লেগেছে, তেমনই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভ্যূত্থান ঘটিয়ে ভারতের নানা জায়গা থেকে বিপ্লবী আর আর স্বাধীনতা সংগ্রামীরা নিরাপদে লুকিয়ে থাকতেন এই শহরে। যেহেতু এই জায়গাটা ইংরেজ প্রশাসনের অধীনে নয়, তাই ব্রিটিশ পুলিশরা যখন তখন এখানে ঢুকতে পারতেন না। একই কারণে ঋণখেলাপি আর দাগি আসামিরাও পালিয়ে আসতেন চন্দননগরে।
আরও পড়ুন
আজও ধোঁয়াশায় শ্রীরামপুর নামের ইতিহাস
চন্দননগরের প্রত্যেক অলিতে গলিতে কান পাতলেই ইতিহাসের ফিসফিস কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়। অতীতকে জীবন্ত দেখতে হলে ঘুরে আসতে হবে এখানকার ফটোকগোড়া এলাকায় বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর পৈত্রিক বাড়ি কিংবা স্ট্র্যান্ড রোডের দক্ষিণ দিকের পাতালবাড়িতে, নদীপথে চন্দননগর এসে রবি ঠাকুর যেখানে থাকতেন। তাছাড়া দুপ্লে মিউজিয়াম, ফরাসি সমাধিস্থল, চন্দননগর গেট, নন্দদুলাল মন্দির, রাধানাথ শিকদার হিমালয়ান মিউজিয়াম – এগুলো তো রয়েছেই। আর আছে গঙ্গার ধারে শতাব্দীপ্রাচীন সব ঘাট। রানিঘাট, জোড়াঘাট, বোড়াই চণ্ডীতলা, শুঁড়িপাড়া ঘাট। তবে দুর্গাচরণ রক্ষিত ঘাটের কথা আলাদা করে বলতে হয়। পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, চন্দননগর স্ট্র্যান্ডের সবথেকে সুন্দর জায়গা হচ্ছে এই ঘাট। সেটা নিয়েই আমাদের গল্প।

১৯২১ সালে এই ঘাট বানানো হয়েছিল। যাঁর নামে এই ঘাটের নামকরণ, তিনি ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে উপেক্ষিতই থেকে গেছেন। বেশির ভাগ বাঙালির একটা ভুল ধারণা আছে যে ভারতীয়দের মধ্যে সবথেকে প্রথম ফরাসি দেশের সর্বোচ্চ সম্মান লিজিয়ঁ দনার (Chevalier de legion d'Honour) সম্মান লাভ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। লিজিয়ঁ দনার প্রদানের রেওয়াজ চালু করেছিলেন ফ্রান্সের সম্রাট এবং প্রবাদপ্রতীম বীর যোদ্ধা নেপোনিয়ন বোনাপার্ট। ইতিহাস বলে, সত্যজিতের আগে অন্তত তিনজন বাঙালি এই সম্মান লাভ করেছিলেন। আর সবার প্রথম যে ভারতীয় এই সম্মান পেয়েছিলেন, তিনি একজন বাঙালি তো বটেই, তার সঙ্গে ফরাসি উপনিবেশের প্রজা। চন্দননগরের দুর্গাচরণ রক্ষিত। ১৮৯৬ সালেই লিজিয়ঁ দনার পেয়েছিলেন তিনি।
আরও পড়ুন
চুঁচুড়ার কবরে ‘সাত খুন মাফ’-এর রহস্য
সারা দুনিয়াতে চন্দননগরের খ্যাতির একটা প্রধান কারণ ছিল ফরাসডাঙার তাঁত। দুর্গাচরণ রক্ষিত সেই তাঁতের ব্যবসা করেই হয়ে উঠেছিলেন এক বড়ো মাপের উদ্যোগপতি। কলকাতার এক ফরাসি ব্যবসায়ী ক্যামা সাহেবের অধীনে কাজ করতে করতে তিনি কাপড় আমদানি রপ্তানির কাজে হাত পাকিয়েছিলেন। তারপর চাকরি ছেড়ে নিজেই ব্যবসা শুরু করলেন। তিনি বিদেশ থেকে আমদানি করতেন হোয়াইট লেদ, জিংক হোয়াইট, কুইনাইন, ফরাসি মদ। আর বিদেশে পাঠাতেন চাল, ডাল, চা, তিল সর্ষে, পোস্ত, তিসি, আফিম, তসরের থান ও কাটা কাপড়। সমস্ত ভারত জুড়েই ছিল তাঁর ব্যবসা। তার পাশাপাশি চন্দননগরের আর্থিক, সামাজিক উন্নয়ন এবং আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রেও তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল। লিজিয়ঁ দনারের টাকা মানুষের সেবাতেই খরচ করেছিলেন। চন্দননগর স্ট্র্যান্ড রোডের ওপর জোড়া ঘাট আর গঙ্গার জেটি বানানো হয়েছিল তাঁরই উদ্যোগে। লেখালেখির জগতেও তাঁর বিচরণ ছিল। দুর্গাচরণ রক্ষিতের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে ফরাসি আমলেই তাঁর নামে গড়ে উঠেছিল একটা স্কুল। যার নাম ‘একল দুর্গা’ হলেও সেটি এখন দুর্গাচরণ রক্ষিত বিদ্যালয় নামেই পরিচিত।