সবুজ মাঠ, মাটির সোঁদা গন্ধ আর প্রাণবন্ত অভিনয় ‘দুধপিঠের গাছ’ ছবির সম্বল

আড়ংঘাটা গ্রামবাসীদের অর্থসাহায্যে নির্মিত উজ্জ্বল বসু পরিচালিত এই ছবি

২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে বঙ্গদর্শনে স্বয়ং পরিচালক উজ্জ্বল বসু লিখেছিলেন, “কিছু ছবি তৈরি হচ্ছে পুরস্কারের জন্য, আর কিছু ছবি বাণিজ্যিক কারণে। আর ভালো ছবিগুলোর ক্ষেত্রে আবার খরচের টাকা তোলার একমাত্র ভরসা শহর বা সদর শহরগুলোর হাতে গোনা কিছু প্রেক্ষাগৃহ। কিন্তু, বাকি এলাকা, গ্রামগুলো? তারা ভালো ছবি দেখা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। …এইরকম বেশ কিছু এলোমেলো ভাবনা থেকেই ক্রাউড ফান্ডিংয়ের কথা মাথায় আসে। কিন্তু ক্রাউড ফান্ডিং তো আমাদের দেশে নতুন নয়। এটা এমন এক বিষয় যেখানে একটি ছবির শুরু থেকেই দর্শকদের ইনভলভমেন্ট থাকে সরাসরি। একজন দর্শক ছবিটির শুটিং শুরুর আগেই যদি মিনিমাম তার টিকিটের টাকাটুকুও ইনভেস্ট করে, তাহলেই সে অপেক্ষা করে থাকবে ছবিটি দেখার জন্য। পরিচালকের দায়বদ্ধতাও সেক্ষেত্রে অনেক বেড়ে যায়। কারণ সেখানে বাণিজ্য নয়, ছবির বক্তব্যই প্রধান। অন্যের টাকা ফেরত দেওয়া এবং যথেষ্ট মুনাফা লাভের আশায় আকারণে একটি কুরুচিকর, অবাস্তব ভিডিও তৈরির চাপটা আর থাকে না। আর, ছবি বাণিজ্যও করবে অবশ্যই। কারণ, একটি ছবির সঙ্গে বহু মানুষ যুক্ত। তাদের রুটি রুজি। কিন্তু, শুধু বাণিজ্যের কারণে ছবি বানানো নয়। এভাবে ভালো ছবি হতেও পারে না।”

ছবির একটি দৃশ্য

অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কথা। বাংলা চলচ্চিত্রের নতুন পরিচালক উজ্জ্বল বসু। তাঁর নির্মিত 'দুধপিঠের গাছ' দেখার জন্য কতজন মানুষ উৎসুক ছিলেন তা এই লেখার আলোচ্য নয়৷ মূল বক্তব্য হল দুর্গাপুজোয় মুক্তি পেল এই ছবি। হাতে গুটিকয়েক সিনেমাহল। বেশিরভাগই প্রাইম টাইমের বাইরে। তথাকথিত স্টারকাস্ট নেই। ছবির বক্তব্যের স্বর উচ্চকিত নয়। বড়ো ব্যানারও নেই৷ তবে আছেটা কী? পরিচালকের দুই হাতে গড়া কিছু স্বপ্ন আছে। অত্যন্ত নিপুণভাবে বক্রপথে সেই স্বপ্নের যাতায়াত। এই ছবি দেখলে অনায়াসে ফিরে চলে যাওয়া যাবে ছোটোবেলার সেইসব রূপকথার দেশে। যে দেশের নায়িকা ঠাকুমা-দিদিমারা। অনায়াস অভিযান শুরু করলেন পরিচালক উজ্জ্বল।

দুই দিদির পরে বাবা মায়ের তৃতীয় সন্তান গৌর। পুত্রসন্তানের সাধ মিটলেও গৌর স্পষ্ট করে কথা বলতে পারে না। দুই দিদির থেকে গৌরের প্রতিই বাবা মায়ের স্নেহের প্রকাশ বেশি। ছোট্ট গৌরের ধারণা, দুধপিঠেরও গাছ হয়। এই বিশ্বাসকে জাপটে ধরে সে মাটিতে পিঠে পোঁতে। নিয়মিত জল দেয়। আর অপেক্ষা করে পিঠে চারার জন্ম কবে হবে! তিরতির করে গল্পের স্রোত বয়। তবে কোনো তাড়া নেই। ছটফটানি নেই। বরং প্রত্যেকটি মুহূর্ত ধীর লয়ে নিঁখুতভাবে ফ্রেমবদ্ধ করা আছে। যেখান থেকে দর্শকমনে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তাই তো, সংলাপের চেয়েও তীব্র হয়ে ওঠে প্রত্যেকটি চরিত্রের শারীরিক ভাষ্য। 

পর্দাজুড়ে দুর্দান্ত সব দৃশ্যের ঘনঘটা। সাংঘাতিক এক একটি ওয়াইড শট চোখের আরাম দেয়। সবুজ মাঠ, মাটির সোঁদা গন্ধ আর প্রাণবন্ত শ্বাস এই ছবির সম্বল। তাই চিত্রগ্রহণে (শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়) ছোটোবেলা তথা রূপকথার মায়াবি দৃশ্য প্রাণ পেয়েছে। 'দুধপিঠের গাছ' ছবির সম্বল অনির্বাণ মাইতির দক্ষ সম্পাদনা। তাঁর আন্তরিকতা অত্যন্ত প্রাণোচ্ছল। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরের ঢেউয়ে সামিল হয়েছে জয় সরকারের সুর ও আবহ। গ্রামবাংলার আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা যাবতীয় অভিমান এই ছবিটিকে সজীব রাখতে সাহায্য করেছে। এমন কাজে বোধহয় এটিই সবচেয়ে জরুরি। পরিচালক উজ্জ্বল বসু অত্যন্ত সুচারুভাবে সেটি পালন করেছেন। গ্রামে গিয়ে মানুষদের সঙ্গে মিশে বুঝেছেন তাঁদের ভালোলাগা মন্দলাগার গল্প। সে সবই জায়গা করে নিয়েছে এখানে। হয়ে উঠেছে মহৎ শিল্প। বড়োদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছে মোট চল্লিশ জন বাচ্চা। একজন বাদে সবাই গ্রামেরই বিভিন্ন পরিবারের। 

দামিনী বেণী বসু অত্যন্ত শক্তিশালী একজন অভিনেত্রী। এই ছবি তাঁর অন্যতম সেরা কাজ। অল্প কিছু শখ-আহ্লাদ গভীরভাবে বুনেছেন তিনি। আর বলতে হয় গৌরের চরিত্রে শিশু অভিনেতা হর্ষিল দাসের অভিনয়। 

ছবির পোস্টার

নদীয়া জেলার আড়ংঘাটা গ্রামবাসীদের অর্থসাহায্যে জন্ম 'দুধপিঠের গাছ'-এর। গ্রামবাসীদের অনেকে অভিনয়ও করেছেন। এই ছবির প্রিমিয়ারও হয়েছে শহরের রং-ঝলমলে মাল্টিপ্লেক্স বা শপিং মলে নয়, ওই গ্রামেই। ঘন সবুজ মাঠের পাশে পর্দা টাঙিয়ে প্রোজেকশনে চলেছে এই ছবি। প্রিমিয়ারে অংশগ্রহণ করেছেন গ্রামবাসী তথা প্রযোজকরা। ট্রেলার দেখে অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় উচ্চকিত প্রশংসা করেছেন। কিন্তু সিনেমাহলে যাওয়ার হয়তো সময় পাননি। কিংবা ঠিক ভরসা করতে পারেননি। তাঁদের উদ্দেশ্যে জানানো থাকল, এমন ছবি দেখলে ঠকবেন না। এমনকি এমন ছবির পাশে দাঁড়ালে নিজেকে অনেকটা বড়ো বলে মনে হবে। বাংলা স্বাধীন ছবির স্বার্থে এ-ও বা কম কী!
 

Developed by DXDasia