মেডিসিনে নোবেল পাবেন কে, মনোনীত করেন নদিয়ার এই বাঙালি ডাক্তার

ডাঃ অসীম কুমার দত্ত রায়ের যুগান্তকারী আবিষ্কার ‘ফ্রুটফ্লো’

ডাঃঅসীম কুমার দত্ত রায়ের (Dr Asim K. Dutta Roy) নাম আপনারা শুনেছেন আশা করি। না শুনে থাকলেও, একটা সামান্য গুগল সার্চই আপনাকে বলে দেবে যে তিনি ঠিক কীসের জন্য বিখ্যাত। তবে তাঁর নাম যে এখনো পর্যন্ত গুগলে খুঁজে জানতে হচ্ছে, এ ঘটনা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। কারণ ডাঃ দত্ত রায় এমন একজন মানুষ, যার জন্য সমগ্র ভারতের গর্ব হওয়া উচিত। ইন্টারনেটে ‘ফ্রুটফ্লো’ (Fruitflow) শব্দটি অনুসন্ধান করলে তাঁর কথাই উঠে আসবে বারবার। তাঁর ফেসবুক প্রোফাইল আপনাকে জানাবে, ডাঃ অসীম দত্ত রায় একাধারে ইউনিভার্সিটি অফ অসলো-র (University of Oslo) অধ্যাপক, ফ্যাকাল্টি অফ মেডিসিন, এবং ‘ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন রিসার্চ’ (Food & Nutrition Research) নামের একটি ওপেন অ্যাকসেস জার্নালের সম্পাদক।

সাম্প্রতিক সময়ে গনমাধ্যম থেকে আপনি হয়তো জেনে থাকবেন, এবছর মেডিসিনে নোবেল প্রাইজ কে পাবেন তা মনোনীত করার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। যদিও ওনার কাছে এই দায়িত্ব নতুন নয়। প্রতি বছর মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার কে পাবেন সিদ্ধান্ত নেয় যে কমিটি, ডাঃ দত্ত রায় আগেও বিভিন্ন ভাবে তার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। তাঁর সম্বন্ধে উইকিপিডিয়াতে লেখা রয়েছে, ডাঃ অসীম কুমার দত্ত রায় একজন ভারত-জাত আমেরিকান মেডিক্যাল সাইন্টিস্ট। ২০০১ সাল থেকে নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অফ অসলো-য় অধ্যাপনা করছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া (Nadia) জেলার গোপীনগরে (গাংনাপুর) তাঁর জন্ম।

তবে, তাঁর গাংনাপুর (Gangnapur) থেকে অসলো যাত্রার আসল গল্প কিন্তু কোনো গুগল পেজে পাবেন না। ঢাকায় দাঁড়িয়ে ফোনে  তিনি বলছিলেন, “সেই গল্পটাই তো আসল। নোবেল প্রাইজ মনোনয়নের মতো বিষয়গুলিই বরং পরে এসেছে, লেজুড় হিসেবে।” বোঝা যায়, নিজের জীবনের উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক সাফল্যগুলিকে অত্যন্ত সহজভাবে মেনে নিয়েছেন তিনি। কেন? তা তাঁর জীবনের গল্প শুনলেই অনেকখানি পরিষ্কার হয়ে যায়। তাঁর জন্ম ১৯৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে (জুলাই নয়, বহু জায়গায় এমনটাই উল্লেখ রয়েছে)। বাবা মা ছিলেন রিফিউজি। তাঁর স্কুল ছিল এক বটগাছের তলায়। আজ্ঞে হ্যাঁ! গ্রামের যে স্কুলে তিনি পড়তেন, সেখানে শিক্ষন সামগ্রী তো দূরের কথা, ক্লাসরুম পর্যন্ত ছিল না। “চারপাশে গরু আর ছাগল, তাদের সঙ্গে নিয়েই পড়তে বসতাম আমরা,” বলতে গিয়ে হেসে ফেলেন ডাঃ দত্ত রায়।

তাঁর বাড়ি

অবশেষে ২.৫ কিলোমিটার দূরের গাংনাপুর হাইস্কুলে ভর্তি হন তিনি। সেখানে ক্লাসরুম থাকলেও ছিল না কোনো ব্ল্যাকবোর্ড। স্কুলঘরের পাঁচ ইঞ্চির পাতলা দেওয়াল ভেদ করে ভিতরে চলে আসত রোদের গনগনে তাপ। সে সময় প্রতি মাসে স্কুলের মাইনে ছিল মাত্র দু’টাকা, কিন্তু সেটুকু সামর্থ্যও তাঁর পরিবারের ছিল না। “আজ এত বছর পার করেও…” বলতে গেলে অসীমবাবুর গলা বুজে আসে। সে সময় প্রায়ই স্কুলের মাইনে দিতে পারতেন না বলে পরীক্ষায় বসা হত না তাঁর।

হাইস্কুল থেকে রাণাঘাট কলেজ, তারপর কলকাতা (Kolkata) এসে বায়ো-কেমিস্ট্রি’তে ডিগ্রি লাভ। সেখান থেকে বোস ইন্সটিটিউটে মাত্র দু’বছরে পিএইচডি করে রেকর্ড গড়েছিলেন। তাঁর পক্ষে থেমে থাকা সম্ভব ছিল না। উচ্চশিক্ষার তাগিদে তাই তিনি এসে পৌঁছান ইউএসএ-তে, যেখানে মেডিসিনে এমডি-পিএইচডি ডিগ্রি পান। আর এরপরই আসে ১৯৮৮ সাল, যা তাঁর জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছিল।

তেত্রিশ বছর বয়সী ডাঃ দত্ত রায়ের সঙ্গে এই বছরই পরিচয় হয় বিখ্যাত বিজ্ঞানী জেমস ব্ল্যাকের, যে বিখ্যাত স্কটিশ ফিজিশিয়ান ও ফার্মাকোলজিস্ট ১৯৮৮ সালে ড্রাগ-ডিজাইনের জন্য যুগ্মভাবে মেডিসেন নোবেল প্রাইজ জিতেছিলেন । ব্ল্যাক আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন এমন এক নতুন শ্রেণীর ওষুধ, যা হৃদরোগ, বিটা ব্লকার এবং পাকস্থলীর আলসার সারিয়ে দিতে পারে। সেই ব্ল্যাক বড়ো বেশি পছন্দ করে ফেলেছিলেন এই বাঙালি ছাত্রটিকে। ১৯৮৮ সালে আবেরদিন ইউনিভার্সিটিতে এসে হাজির হন ডাঃ দত্ত রায়। টোম্যাটোর নির্যাসের সাহায্যে হৃদরোগ প্রতিরোধ, ১৯৯৯-২০০০ সালে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন তিনি। এছাড়াও অ্যান্টিপ্লেটলেট হিসাবে রক্তচাপ দমন করতে সাহায্য করে এই নির্যাস। এই আবিষ্কারটিই পরবর্তীকালে ‘ফ্রুটফ্লো’ নামে পরিচিত হয়।

তাঁর ওয়েবসাইটে ডাঃ দত্ত রায় বলেন, “ফ্রুটফ্লো হল সেই অদ্বিতীয়, সংরক্ষিত, দ্রাব্য মিশ্রনটি, যা টোম্যাটো বীজের গায়ে লেগে থাকা শাঁসালো অংশটি থেকে নিঃসারিত হয়। স্কটল্যান্ডের আবেরদিন ইউনিভার্সিটি-র রোয়েট রিসার্চ ইন্সটিটিউট-এ থাকাকালীন আমি এটি আবিষ্কার করেছিলাম।”

কিন্তু এটাই পুরো গল্প নয়। ফ্রুটফ্লো ছাড়াও প্লাসেন্টার স্বাস্থ্য, প্রিম্যাচিওর শিশুদের মস্তিস্কের বিকাশ, সন্তানের স্বাস্থের উপর সি-সেকশনের ক্ষতিকর প্রভাব প্রভৃতি বিষয়ে অগাধ পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে গেছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে আবারও তাঁর ওয়েবসাইট থেকে উদ্ধৃত অংশটি তুলে দেওয়া যায়, “আমার গবেষণার মূল লক্ষ্য হল বৃদ্ধি, ক্রমবিকাশ, এবং হৃদরোগ কিংবা ডায়বেটিস প্রতিরোধে খাদ্যের ভূমিকা বিবেচনা করা।”

৩৫০-টিরও বেশি পাবলিকেশন, ১০টি প্রকাশিত বই রয়েছে তাঁর। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আমেরিকান না হয়েও ‘ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন রিসার্চ’ সম্পাদনা করছেন। এত কিছুর মধ্যেও প্রতি বছর বাড়ি ফেরার সময়টুকু ঠিক বের করে নেন ডাঃ দত্ত রায়। তাঁর কথায়, “আমি পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য একটি ক্লিনিক চালাই। যদিও সত্যি বলতে, আমি অনুশীলনকারী নই। আমি একজন গবেষক এবং শিক্ষক।” কিছুটা মজার সুরে যোগ করেন, “আমি বোধহয় এতদিনে ডক্টোরাল থিসিস সম্পাদনায় বিশ্ব রেকর্ড গড়ে ফেলেছি। প্রায় ২৭৫গুলো থিসিস পরীক্ষা করেছি আমি।”

সৌভাগ্যবশত, সন্তানের “ফ্রুটফ্লো” আবিষ্কার দেখে যেতে পেরেছেন ডাঃ দত্ত রায়ের বাবা মা । “যখন এই খবর পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, আমি সে সময় গোপীনগরে। সবকিছু থেকে এতই দূরে ছিলাম যে নিজেই প্রথমে খবরটা জানতে পারিনি।” হেসে উঠে বলেন তিনি। ভারত কি এখনো তাঁর এই আবিষ্কারের সদ্ব্যবহার করতে পেরেছে? যদিও সুযোগ এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়িতে এখানে করুন।

Developed by DXDasia