কিলিমাঞ্জারোর কনকনে ঠাণ্ডা, খাড়া চড়াই ভেঙে চাঁদের পাহাড়ের পথে
যাত্রা চলছে: ২৩ জানুয়ারি সকাল। ‘চাঁদের পাহাড়’ কিলিমাঞ্জারোয় সাইকেল নিয়ে ওঠার যাত্রা শুরু হল কিলিমাঞ্জারো ন্যাশনাল পার্কের কিলেমা গেট থেকে। এটা মূলত রেস্কিউ গেট। নুড়ি-পাথরের রাস্তা। দু’পাশে জঙ্গল, পাখ-পাখালি, ফুল, ব্লু মাঙ্কি। আর চড়াই। সাইকেল চালাতে কষ্ট হলেও দাঁড়ানো যাচ্ছে না। দিন থাকতেই পৌঁছতে হবে হোরোম্বো ক্যাম্পে।
এতক্ষণ রাস্তা ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠছিল। কষ্ট করে হলেও সাইকেল চালিয়ে আসা গেল। দম লাগল ঠিকই, সঙ্গে অনেকটা সময়ও লাগলো। কিন্তু, এখান থেকে রাস্তা যেন বেশ খাড়াই উঠে গেছে। গাছের উচ্চতা কম থাকার জন্য অনেকটা সামনের দিক দেখতে পাচ্ছি। ব্রুনো একটা দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল ওই পাহাড়ের রিজটার পেছনেই ক্যাম্প। দেখে মনে হল ৪-৫ কিলোমিটার হবে। ব্রুনোকে সে কথা বলতেই হেসে উঠল। বলল, রাস্তা গেছে এঁকেবেঁকে। দেখে কাছে মনে হলেও এখনো অর্ধেক রাস্তা বাকি। মানে ৯-১০ কিলোমিটার অন্তত।

এদিকে সূর্যদেব পাটে বসেছেন। কিছুক্ষণ পরেই আঁধার নামবে। সূর্য নেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডা বাড়তে শুরু করছে। আমাদের দুজনেরই সমস্ত জিনিসপত্র পোর্টারদের কাছে। ওঁরা মারাংগু রুট দিয়ে উঠছে। হোরোম্বো হাটে পৌঁছে ওদের সঙ্গে দেখা হবে। তাই তাড়াতাড়ি পৌঁছনো দরকার। অথচ, চড়াই বাড়ার জন্য সাইকেল চালিয়ে ওঠা মুশকিল। একটু যেন মানসিক চাপ হল। মুখে কিছু না বললেও বুঝলাম ব্রুনোরও পরিস্থিতি বুঝে অস্বস্তি হচ্ছে। যাই হোক, যেতে যখন হবেই তখন দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট না করাই ভালো। দুজনে সাইকেল ঠেলতে শুরু করলাম।

কিছুদূর ঠেলি, খানিক দাঁড়াই। আবার চলি। কিলোমিটার দুয়েক যাবার পর অন্ধকার নেমে এল। রাস্তা দেখা যায় না। রাস্তা আরো খাড়া হয়েছে। সাইকেল ঠেলতেও রীতিমতো কষ্ট। সঙ্গে বেড়েছে ঠাণ্ডা। একটু দাঁড়িয়ে সঙ্গে থাকা হেড টর্চ বার করলাম। ব্রুনোর অবস্থা আমার থেকেও খারাপ। বেচারার মনে হয় ভালো করে খাওয়াও হয়নি। দুদিন আগেই নেমেছে কিলিমাঞ্জারো অভিযান করে। কাজেই যথেষ্ট বিশ্রামও হয়নি। খারাপ লাগল ব্রুনোর জন্য। সঙ্গে থাকা কাজুর প্যাকেটটা বার করে ওর হাতে দিলাম। এক টুকরো করে ক্যাডবেরি খেলাম দুজনেই। এক ঢোক করে জল খেয়ে আবার সাইকেল ঠেলা শুরু করলাম।

যতক্ষণ আলো ছিল ততক্ষণ দু’পাশ দেখতে দেখতে চলছিলাম। গাছপালা, ফু্ল, দূরের পাহাড়ের নানান বৈচিত্র দেখতে পাচ্ছিলাম বলে সাইকেল ঠেলে চড়াই চড়ার কষ্টটা অতটা টের পাচ্ছিলাম না। কিন্তু এখন অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হেড টর্চের আলোয় শুধু সামনে ৮-১০ ফুট রাস্তা দেখতে পাচ্ছি। মাঝে মাঝে আলো ঘুরিয়ে ব্রুনোকে দেখছি। সে বেচারা ঠাণ্ডায় বেজায় কাহিল। আমার অবস্থাও খারাপ। সাইক্লিং-এর হাফ গ্লাভসে কিলিমাঞ্জারোর শীত আটকাচ্ছে না। পাহাড়-চূড়া থেকে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া নেমে আসছে ঢাল বেয়ে। আমাদের গতি এখন কচ্ছপের মতো। শরীর আর সঙ্গ দিচ্ছে না।
আরো পড়ুন
গাছমানুষের ডায়েরি-১
এইভাবেই বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর ব্রুনো বলল, ‘ডাইনে দেখো ক্যাম্পের আলো দেখা যাচ্ছে’। সত্যিই তো! ওই তো লাল লাল বাল্বের আলো বেশ কয়েকটা। তাহলে তো পৌঁছে গেলাম। বেশ জোর পেলাম মনে। বললাম, ডানদিকে দেখা যাচ্ছে, তাহলে আমরা সিধে যাচ্ছি কেন? ডানদিকে কোনো রাস্তা নেই? আসলে আর পেরে উঠছিলাম না। এক হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল অন্য হাত পকেটে ভরে গরম রাখার চেষ্টা। গায়ে একটা পাতলা টি-শার্ট। জুলিওর কথা মতো দু’ঘণ্টায় ক্যাম্পে পৌঁছে যাওয়ার কথা। অর্থাৎ চারটে-সাড়ে চারটেয়। কাজেই গরম জামাকাপড় সঙ্গে রাখার কোনো প্রয়োজন বোধ করিনি। ব্রুনো একবার মাত্র সাইকেলে এসেছে। সেও অতটা বুঝতে পারেনি সাইকেলে পাহাড় চড়তে কতক্ষণ লাগবে। তার উপর, আমি এমনিতে খুবই ধীর গতির ট্রেকার। সব মিলিয়ে দু’ঘণ্টার রাস্তায় আমরা এখনই ৫ ঘণ্টা লাগিয়ে দিয়েছি। ব্রুনোকে জিজ্ঞেস করাতে বলল, ক্যাম্প কাছে দেখতে পাওয়া গেলেও এখনো সামনের ঢালটায় উঠতে হবে। তারপর ডানদিকে বেশ খানিকটা গিয়ে নামতে হবে কিছুটা। তাহলেই ক্যাম্প। আরো ঘণ্টাখানেক তো বটেই।

শুনেই তো কান্না পেয়ে গেল। হাত দুটোয় কোনো সার নেই, ঠাণ্ডায় পাগুলো ঠকঠক করে কাঁপছে। চারিদিকে ঘন অন্ধকার। পিঠের ৪ কেজি ন্যাপস্যাকটা পাথরের মত ভারী মনে হচ্ছে। মন শক্ত করে শামুকের গতিতে চলতে থাকলাম। ব্রুনোরও অবস্থা খুবই খারাপ। সে বেচারার সাইকেল আমার সাইকেলের থেকে ওজনে বেশি। চড়াইটা কোনোমতে উঠে ডানদিকে ঘুরে ঢালুটা আসতে স্বস্তি পেলাম। ঠিক সামনেই ক্যাম্পের আলোগুলো স্বর্গের বাতির মত জ্বলছে।
আরো পড়ুন
গাছ-মানুষের ডায়েরি-২
হোরোম্বো হাট লেখা ফলকটার নিচে পৌঁছলাম তখন কাঁটায়-কাঁটায় রাত্রি আটটা। রীতিমতো ঠকঠক করে কাঁপছি। দীর্ঘ ছয় ঘন্টা ধরে মাত্র ১৯ কিলোমিটার রাস্তা পার হয়ে এলাম। ওয়ার্ডেনের সঙ্গে কথা বলে ১৩ নম্বর হাটে জায়গা হল। রুমে ঢুকতেই জ্যাকশন এসে আমার আর ব্রুনোর স্যাক দিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি করে ফেদার জ্যাকেট, উলের মোজা সব পরে নিলাম। জ্যাকসন কফি নিয়ে এলো। কিছু পরে ম্যাগি-স্যুপ দিয়ে গেল। গরম জিনিসগুলো পেটে যেতে একটু একটু করে ঠকঠকানিটা থামল। শুনলাম, আমার কুক আর একজন পোর্টার আজ পৌঁছতে পারেনি। ওঁরা নিচের ক্যাম্পে রয়েছে। কাল সকালে পৌঁছবে। জ্যাকসন আর একজন পোর্টার এসেছে। ওরাই কিচেন সামলাচ্ছে।

বেশি কথাবার্তা বলার ক্ষমতা আজ আর নেই। মনে মনে ঠিক করছি জুলিওকে বলতে হবে, কখনো কোনো সাইক্লিং মেম্বারের জন্য যেন এত বেলায় যাত্রা শুরু না করে। সূর্য ডোবার আগেই যেন ক্যাম্পে পৌঁছতে পারে সবাই, সেটা মাথায় রেখেই সময়মতো শুরু করা উচিত। এসব ভাবনার মধ্যেই আবার জ্যাকশন হাজির। সঙ্গে ফিঙ্গার চিপস আর প্রচুর কাঁচা সালাদ। সালাদটা অবশ্য আমারই বলে দেওয়া। প্রায় পুরোটাই খেয়ে ফেললাম একটু একটু করে। এবার মনে ফুর্তি হল। আমি আমার চেতককে সঙ্গে নিয়ে ৩৭২০ মিটার উচ্চতার হোরোম্বো হাটে পৌঁছাতে পেরেছি। বাকিটা, অর্থাৎ সাইকেলে আফ্রিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কিলিমাঞ্জারোতেও পৌঁছতে পারব নিশ্চয়ই, এই আশা নিয়ে দশটায় ঘুমিয়ে পড়লাম।
(চলবে)