লক্ষ্মীর পাঁচালিতে জীবনের বারোমাস্যা

পাঁচালি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান অংশ

বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীবার। বাংলার ঘরে ঘরে মহিলারা পাঠ করেন লক্ষ্মীর পাঁচালি – শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীর বৃহস্পতিবারবিহিত ব্রতকথা-পাঁচালি ও বারোমাস্যা। যদিও বছরে একটি দিন ঘটা করে লক্ষ্মীপুজোর রীতি আছে গ্রামবাংলায়। দুর্গাপুজোর ঠিক পরপর উদযাপিত হন ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ব্রতকথা কি শুধুই পাঠ? না। সেখানে মিশে রয়েছে দৈনন্দিন জীবনের হালহকিকত। ছন্দে ছন্দে বুঝিয়ে দেওয়া আছে জীবনের বারোমাস্যা।

দোলপূর্ণিমা নিশীথে নির্মল আকাশ।/ মন্দ মন্দ বহিতেছে মলয় বাতাস।।

লক্ষ্মীদেবী বামে করি বসি নারায়ণ।/ কহিতেছে নানা কথা সুখে আলাপন।।

হেনকালে বীণাযন্ত্রে হরি গুণগান।/ উপনীত হইলেন নারদ ধীমান।।

ধীরে ধীরে উভপদে করিয়া প্রণতি।/ অতঃপর কহিলেন লক্ষ্মীদেবী প্রতি।।

মানুষের বিশ্বাস, মন দিয়ে নিষ্ঠা ও ভক্তি সহকারে যদি লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়, তা হলে নাকি খুব সহজেই ঈশ্বরকে প্রসন্ন করা যায়। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। তার মধ্যে অন্যতম এই পাঁচালি পাঠ। যার নিয়ম মানুষেরই হাতে গড়া। সেখানে থাকে লক্ষ্মী পুজোর যাবতীয় মন্ত্র। আহ্বান মন্ত্র পাঠ করে ঘটে বা চরণে ফুল দিয়ে পুজো অর্চনা শুরু করা হয়। হাতে ফুল নিয়ে পড়তে হয় পাঁচালি। শেষে শঙ্খ বাজিয়ে পুজো সমাপ্ত হয়।পাঁচালি কি শুধুই দেবতা আর ভক্তের সম্পর্কের মধ্যে নিহিত? হয়তো এর চেয়েও বেশি কিছু। আমার মতে, পাঁচালি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান অংশ। যেখানে কথা, ছন্দ, লয়, সুর, প্রাত্যহিকী চর্যা কী না নেই! যেমন এক জায়গায় বলা আছে, 

সতত কুকর্মে রত রহিয়া তাহারা।/ দুর্ভিক্ষ অকালমৃত্যু রোগে শোকে সারা।।

অন্নাভাবে শীর্ণকায় রোগে মৃতপ্রায়।/ আত্মহত্যা কেহ বা করিছে ঠেকে দায়।।

কেহ কেহ প্রাণাধিক পুত্রকন্যা সবে।/ বেচে খায় হায় হায় অন্নের অভাবে।।

প্রত্যন্ত গ্রামবাংলায় এ চিত্র এখনও প্রাসঙ্গিক। পুরাণ থেকে আজকের দুনিয়া – লক্ষ্মীর পাঁচালি হয়ে উঠেছে সর্বজনীন। দুর্ভিক্ষ পীড়িত বাংলায় মানুষ মরছে খিদের জ্বালায়, অর্থাভাবে। কেউ কেউ কুকর্মে নিমজ্জিত। লক্ষ্মী ঠাকুরানি তাদের জন্য বাণী প্রদর্শন করছেন। আর সেসব কথাই উচ্চারিত হচ্ছে বাংলার ঘরে ঘরে। ঘরের একদম কোণের অংশে লক্ষ্মীর স্থান। ঠিক যেন ঘরের মেয়েটি। ‘লক্ষ্মীছাড়া’ বা ‘লক্ষ্মীহীন’ – খুবই পরিচিত দুটি শব্দ, যা আমরা রোজ শুনি; সেই ‘লক্ষ্মী’ শব্দের নানান প্রয়োগ বর্ণিত আছে ব্রতকথায়।

অন্নপূর্ণা অন্নরূপা ত্রিলোকজননী।/ বল দেবী, তবু কেন হাহাকার শুনি।।

কেন লোকে লক্ষ্মীহীন সম্পদ অভাবে।/ কেন লোকে লক্ষ্মীছাড়া কুকর্ম প্রভাবে।।

এই বাংলার রীতি অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুজোর দিন পাঁচালি পাঠ করা ছাড়াও ১০৮ বার গায়ত্রী মন্ত্র জপ করতে হয়। লক্ষ্মীপুজোর দিন বাড়িতে দক্ষিণাবর্ত শঙ্খ স্থাপন করতে হয়। এছাড়াও এই দিন দেবীর পায়ের সামনে পাঁচটি কড়ি রেখে পুজো করালে এবং সেই কড়িগুলো ক্যাশবাক্সে রেখে দিলে নাকি সমৃদ্ধি ঘটে।

পুরাণ এবং দেবীমাহাত্ম্য বাদ দিলেও শিশুদের কাছে খুবই জনপ্রিয় পাঁচালি পাঠ। দুলে দুলে সুর করে পাঁচালি যখন পাঠ করা হয়, শিশুদের শ্রবণে তা তরঙ্গ তোলে। স্বাভাবিকভাবেই যেকোনো শিশুর কাছেই সুখশ্রাব্য হয়ে ওঠে লক্ষ্মীর পাঁচালি।

 

Developed by DXDasia