যে বাড়িতে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন

বঙ্গভঙ্গের স্মৃতি আজও সেখানে জীবন্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে খানিকটা মুঘল স্থাপত্যের আদলে লাল রঙের এক বাড়ি। তবে মুঘলদের বানানো নয়, বাড়িটা তৈরি করিয়েছিলেন ব্রিটিশরা। ভালোভাবে খেয়াল করলে বোঝা যাবে, বাড়িটার কাঠামোতে ইউরোপীয় রীতিরও প্রভাব আছে। ব্রিটিশদের তো নিজস্ব সমৃদ্ধ স্থাপত্যশৈলী ছিল, তাহলে মুঘল রীতির সংমিশ্রণ কেন ঘটানো হল বাড়িটায়? এই স্থাপত্যের মাধ্যমে ইংরেজরা বোঝাতে চেয়েছিলেন, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে তাঁদের অবস্থান মুঘল সম্রাট আকবরের মতো। আকবরকে তাঁরা সবথেকে পরিশীলিত মুঘল সম্রাট বলে স্বীকার করতেন। তাই আকবরের তৈরি করানো ফতেহপুর সিক্রির দিওয়ান-ই-খাসের মতো লাল রঙে গোটা বাড়িটা রাঙানো। 

এই বাড়িটার নাম কার্জন হল। এইরকম নাম দেওয়া হয়েছে, তার কারণ, ব্রিটিশ ভারতের দাপুটে এক গভর্নর জেনারেল জর্জ নাথানিয়েল কার্জন বাড়িটার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তখন ১৯০৪ সাল। ব্রিটিশ প্রশাসন বঙ্গভঙ্গের তোড়জোর শুরু করে দিয়েছে তখন থেকেই। প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকা শহরকে গড়ে তোলার প্রস্তুতিও চালু হয়ে গিয়েছিল। সেই বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রমনা অঞ্চলে এই বাড়িটার ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করলেন খোদ গভর্নর জেনারেল। 

বাড়িটা কেন বানানো হয়েছিল, তা নিয়ে সবথেকে প্রচলিত মতটি হল, প্রাদেশিক রাজধানীর টাউন হল হিসেবে এটাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন ব্রিটিশরা। কিন্তু এই বক্তব্য সঠিক নয়। ঢাকা কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবেই এটিকে গড়ে তোলা হয়েছিল, এবং তার জন্য অর্থসাহায্য করেছিলেন ভাওয়ালের রাজকুমার। ১৯০৪ সালে ঢাকা শহরের সবথেকে পুরোনো সংবাদপত্র ‘ঢাকা প্রকাশ’-এ লেখা হয়েছিল, “ঢাকা কলেজ নিমতলীতে স্থানান্তরিত হইবে। এ কলেজের সংশ্রবে একটি পাঠাগার নির্মাণের জন্য সুযোগ্য প্রিন্সিপাল ডাক্তার রায় মহাশয় যত্নবান ছিলেন। বড়লাট বাহাদুরের আগমন উপলক্ষ্যে ভাওয়ালের রাজকুমারগণ এ অঞ্চলে লর্ড কার্জন বাহাদুরের নাম চিরস্মরণীয় করিবার নিমিত্তে ‘কার্জন হল’ নামে একটি সাধারণ পাঠাগার নির্মাণের জন্য দেড় লক্ষ টাকা দান করিয়াছেন”।

কার্জন হল 

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হলে কার্জন হল প্রাদেশিক রাজধানীর প্রশাসনিক ভবন হয়ে উঠেছিল। তারপর আবার যখন ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হল, তখন থেকে ঢাকা কলেজের ক্লাস নেওয়া শুরু হল এই বাড়িতে। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কার্জন হল তখন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত হয় বিজ্ঞান বিভাগের ক্লাসরুম এবং পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য। পরে বিজ্ঞানের অনেকগুলো শাখার পঠনপাঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হলে কার্জন হলের অবয়বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিজ্ঞানের অন্য ভবনগুলো তৈরি করা হয়।

কার্জন হলের ইতিহাসে রয়েছে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দেশভাগের পর তখন বছরখানেকও কাটেনি। ১৯৪৮ সালে মহম্মদ আলি জিন্নাহ এই বাড়িতেই ঘোষণা করলেন, একমাত্র উর্দুই হবে গোটা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। তক্ষুনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা প্রতিবাদে ফেটে পড়লেন। কার্জন হল থেকেই প্রথম উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করা হয়। ভাষা আন্দোলনের জোয়ার ছড়িয়ে পড়ল গোটা ঢাকা শহরে, এবং তারপর সমস্ত পূর্ববঙ্গে।

তথ্যসূত্র – ইতিবৃত্ত, ভ্রমণ গাইড, সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তন। 

Developed by DXDasia