পায়ে হেঁটে জানুন কলকাতার ইতিহাস
মেটকাফ হল
কলকাতা সফরের গত দুটি পর্বে আমরা ঘুরতে গিয়েছিলাম বিবাদী বাগ। পরের পর্ব প্রকাশ করতে দেরি হয়ে গেল অনেকটাই। তার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। কথা ছিল, এবার হাঁটব এসপ্ল্যানেডের রাস্তায়। তবে খুব বেশি জায়গায় যাব না। পরের সপ্তাহে মহানগরের ঔপনিবেশিক ইতিহাস আপনার সামনে তুলে ধরব আরও অনেকটা।
কলকাতা শহরে একেবারে প্রথমদিকে গড়ে ওঠা বাণিজ্য কেন্দ্রগুলির অন্যতম ছিল এসপ্ল্যানেড। সাধারণত ‘এসপ্ল্যানেড’ বলতে সমুদ্রের ধারে লম্বা হাঁটা পথ বোঝায়। কলকাতার এসপ্ল্যানেড এমন নয়। যদিও হুগলি নদী খুব কাছেই। তবে শব্দটির অন্য একটি অর্থ রয়েছে। দুর্গ এবং শহরের মাঝখানে বিস্তীর্ণ সমতল ফাঁকা জায়গা। যেমন ‘আমাদের’ এসপ্ল্যানেড।
পলাশির যুদ্ধে ব্রিটিশরা জয়লাভ করার পর কলকাতার ময়দান অঞ্চলে নতুন ফোর্ট উইলিয়াম গড়ে তোলা হয়। নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৭৫৮ সালে। ঐ জায়গায় আগে জঙ্গল ছিল। উত্তর দিকে ‘ধুর্মোটোলাহ’ (ধর্মতলা) থেকে চাঁদপাল ঘাট পর্যন্ত এলাকা ছিল তখনকার এসপ্ল্যানেড। গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের (১৭৭২-১৭৮৫) সময় এসপ্ল্যানেড বিখ্যাত হয়ে ওঠে ‘এলিগেন্ট ওয়াকিং পার্টি’-র জন্য।
তখন খেলার মাঠও ছিল এখানে। ১৮৫৮ সালের এপ্রিলে কলকাতার প্রথম নথিভুক্ত ফুটবল ম্যাচ হয়েছিল এসপ্ল্যানেডে। ক্যালকাটা ক্লাব অফ সিভিনিয়ান্স এবং ‘জেন্টলমেন অফ ব্যারাকপুর’-এর মধ্যে। আজকের এসপ্ল্যানেড দেখলে সেসব বিশ্বাস করা শক্ত। তবে কল্পনা করতে পারেন – অনেকটা খোলা জায়গা, মাঝখানে কিছু রাজকীয় বাড়ি, যার মধ্যে বেশিরভাগই দাঁড়িয়ে রয়েছে এখনও।
আরও পড়ুন: বিবাদী বাগের আনাচে কানাচে পুরোনো কলকাতা
মেটকাফ হল
স্ট্র্যান্ড রোড আর হেয়ার স্ট্রিটের মাঝখানে দারুণ সুন্দর এক বাড়ি চোখে পড়বেই। পশ্চিমে হুগলি নদীর দিকে মুখ করা। প্রাচীন গ্রিসের এক মন্দির এবং ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে এটি তৈরি হয় ১৮৪০ থেকে ১৮৪৪ সালের মধ্যে। নকশা তৈরি করেন কলকাতার ম্যাজিস্ট্রেট সি কে রবিনসন। ভবনটির নাম রাখা হয় স্যার চার্লস টি মেটকাফের নামে, যিনি ১৮৩৫-৩৬ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন।
প্রথমে এই বাড়িতে ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি স্থাপন করেন লর্ড মেটকাফ নিজেই। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লাইব্রেরি থেকে ৪৫০০-র বেশি বই এবং নথিপত্র আনান। ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরির প্রথম মালিক দ্বারকানাথ ঠাকুর। সরকারি জমিতে তাঁর বেসরকারি সম্পত্তি। বর্তমানে এই ভবনের একতলায় রাখা আছে এশিয়াটিক সোসাইটির দুর্লভ বিদেশি পত্রপত্রিকা এবং পাণ্ডুলিপি। দোতলায় ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের অফিস, প্রদর্শনশালা এবং বিক্রয়কেন্দ্র।
ইস্টার্ন রেলওয়ে কমার্শিয়াল অফিস
মেটকাফ হল থেকে উত্তরদিকে স্ট্র্যান্ড রোড ধরে চলতে থাকুন। কয়েকটি পুরোনো অফিসঘর আর ওয়্যারহাউজ পেরিয়ে চোখে পড়বে কয়লাঘাট স্ট্রিটের কোণে বিরাট লাল বাড়ি – ইস্টার্ন রেলওয়ে কমার্শিয়াল অফিস। রাস্তাটির নাম আগে ছিল টাঁকশাল স্ট্রিট। কয়লাঘাট নামটি সম্ভবত এসেছে ‘কেল্লা’ থেকে। যেহেতু কাছেই জিপিও-র জায়গায় আগে ছিল পুরোনো ফোর্ট উইলিয়াম। কয়লার সঙ্গেও নামটির যোগ থাকতে পারে। তখন জাহাজ থেকে কয়লা বের করা হত নদীর ধারে।
পূর্ব রেলের কমার্শিয়াল অফিস গড়ে উঠেছিল ১৮৮২ নাগাদ। শতাব্দীপ্রাচীন ময়লা জমে থাকা সত্ত্বেও মুছে যায়নি বাড়িটির আভিজাত্য। রেনেসাঁস স্থাপত্যের একটি আদর্শ নিদর্শন এই ভবন। চারপাশের নোংরা পরিবেশ এখনও সৌন্দর্যের গরিমাকে ম্লান করতে পারেনি ।
ব্যাংকশাল আদালত
ব্যাংকশাল আদালত
কয়লাঘাট স্ট্রিট দিয়ে বিবাদী বাগের দিকে হাঁটলে দেখতে পাবেন ফিলাটেলি মিউজিয়াম, যার কথা আগে বলেছি। এখানে রাস্তা পেরোলে সামনেই পড়বে ব্যাংকশাল স্মল কজেস কোর্ট। একশো বছরের বেশি আগে এখানে ছিল ‘ব্যাংকশাল’ বা সমুদ্র বাণিজ্যের দপ্তর। যেমন কয়লাঘাট স্ট্রিটের নাম আগে ছিল ‘টাঁকশাল স্ট্রিট’। ব্যাংকশাল কোর্টের পাশেই কয়লাঘাট স্ট্রিটের কোণে একসময় ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর আবাস। ১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ করার আগে। কাছেই সেন্ট অ্যান’স চার্চ ছিল। ১৭৭০ সালে পুরোনো ফোর্ট উইলিয়ামে গড়ে ওঠা প্রথম গির্জা। সিরাজের আক্রমণে সেই চার্চ গুঁড়িয়ে যায়।
আরও পড়ুন: সংগীত গুহার দেশ চামুরচি
এখন ছোটো বা মাঝারি ফৌজদারি মামলা জেলাশাসক বা অন্য কারো সামনে তোলা হয় ব্যাংকশাল কোর্টে। উনিশ শতকের স্থাপত্য, ঝাঁকে ঝাঁকে উকিল এবং কার্যকর্তাদের দেখে মনে পড়ে যায় চার্লস ডিকেন্সের ‘ব্লিক হাউজ’ (১৮৫২) উপন্যাসে ফুটে ওঠা আদালতের দম বন্ধ করা বিবরণ।
ব্যাংকশাল কোর্টের ডানদিকে মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেটস কোর্ট। ১৮৭৮ সালে গড়ে উঠেছিল এই বাড়ি। তার উল্টোদিকে রয়েছে ১৯১০ সালে তৈরি হওয়া শ ওয়ালস অ্যান্ড কোম্পানির প্রধান কার্যালয়।
পূর্ব রেলওয়ের সদর দপ্তর
পূর্ব রেলওয়ের সদর দপ্তর
ফেয়ারলি প্লেসের কোণ ছুঁয়ে উত্তর বরাবর চললে জিপিও পার করার পর দেখবেন পূর্ব রেলওয়ে সদর দপ্তরের অতিকায় ভবন। বাড়ির পূর্ব অংশে আলাদা প্যাভিলিয়ন রয়েছে। গোটা ভবনের নকশা করেন প্রখ্যাত স্থপতি রিচার্ড রোসকেল বেইন। ১৮৬৬ সালে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানিতে (পরে নাম হয় পূর্ব রেল) যোগ দেন। ‘পালাজো’ রীতি অনুসরণ করে প্যাভিলিয়নটি বানানো। রোমের ঐতিহ্যবাহী ফারনেসে প্যালেস এই রীতির প্রসিদ্ধ হাই রেনেসাঁস স্থাপত্য।
পূর্ব রেলওয়ে ভবনের ইভস এবং কার্নিস দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। চওড়া সিঁড়ি, প্রশস্ত ব্যালকনি এবং করিডোরও দেখার মতো। খিলানওয়ালা জানলায় লাগানো ভেনিসীয় খড়খড়ি। অফিসিয়াল কাজ ছাড়া বাড়িতে ঢুকতে গেলে বিশেষ অনুমতি লাগতে পারে।
অ্যান্ড্রু ইউল হাউজ
নেতাজি সুভাষ রোডে পুরোনো কর্পোরেট অফিস
আজকের সফরের একেবারে শেষে নেতাজি সুভাষ রোডে একের পর এক পুরোনো বাণিজ্যিক অফিস ঘুরে দেখব। কলকাতার প্রথম যুগের সাক্ষী এই বাড়িগুলো। এক সময় নতুন ফোর্ট উইলিয়াম এবং জোড়াবাগানের সংযোগ রক্ষা করত মহানগরের অন্যতম পুরোনো এই রাস্তা। জোড়াবাগান ছিল পুরোনো সুতানুটির অংশ। জোব চার্নক ১৬৯০ সালে পা রেখেছিলেন এই সুতানুটি ঘাটেই। এনএস রোডের দু’ধারে দেখতে পাবেন চার্টার্ড ব্যাংক, অ্যান্ড্রু ইউল, বেঙ্গল চেম্বারের মতো বিখ্যাত সব অফিস।
বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স
১৮ শতকের শেষে বেঙ্গল চেম্বার ভবনে থাকতেন স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিস। ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরুদ্ধে ডুয়েল লড়ে তিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। গবেষকদের মতে, ব্রিটিশ ডেপুটি হাই কমিশন ছাড়া এটাই কলকাতার একমাত্র বাড়ি, যেখানে ইংরেজ রাজপরিবারের মোটো এবং শিল্ড লাগানো থাকে।
আগামী সপ্তাহে আমরা ওল্ড চায়না বাজার স্ট্রিটে যাব। ততক্ষণ হাঁটতে থাকুন।
