পাঁচটি মাপকাঠির ভিত্তিতে প্রাথমিক শিক্ষায় রাজ্যকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে
শিক্ষাক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের নাম উজ্জ্বল হয়েছে, কারণ এই রাজ্য চিরকালই শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ অনেক আগেই বলেছিলেন, “শিক্ষা হল মানুষের পরিপূর্ণতার প্রকাশ।” অন্য ভাবে বলতে গেলে, শিক্ষা একজন মানুষের সহজাত প্রতিভা এবং জ্ঞানকে চিহ্নিত করে।এবার প্রাথমিক শিক্ষায় দেশের অন্যান্য বড়ো রাজ্যগুলিকে পিছনে ফেলে শীর্ষস্থান দখল করলো পশ্চিমবঙ্গ। শুক্রবার কেন্দ্রীয় সরকার প্রকাশিত প্রাথমিক শিক্ষা সূচকে (ফাউন্ডেশনাল লিটারেসি অ্যান্ড নিউমারেসি ইনডেক্স) রাজ্যের এই সাফল্য প্রকাশিত হওয়ার পর এই আনন্দবার্তা নিজের ট্যুইটারে শেয়ার করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদ (ইকোনমিক অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল) পাঁচটি মাপকাঠির ভিত্তিতে প্রাথমিক শিক্ষায় রাজ্যকে এই স্বীকৃতি দিয়েছে। দেশের বড়ো রাজ্যগুলিতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার তুলনামূলক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পশ্চিমবঙ্গকে ‘সেরা’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ট্যুইটারে লিখেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য দারুণ খবর। আমরা ফাউন্ডেশনাল লিটারেসি অ্যান্ড নিউমারেসি ইনডেক্স-এর মাপকাঠিতে দেশের সব বড় রাজ্যের মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করেছি। আমি এই অসামান্য কৃতিত্বের জন্য আমাদের সকল শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষা বিভাগের সদস্যদের অভিনন্দন জানাচ্ছি।’
Great news for West Bengal!
We have secured the top rank among larger states on the 'Foundational Literacy & Numeracy Index'.
I congratulate all teachers, guardians & members of our Education Department for this outstanding achievement!https://t.co/BQPNUiQX9r
— Mamata Banerjee (@MamataOfficial) December 17, 2021
উল্লেখ্য, করোনার জেরে দীর্ঘদিন স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল। তবে ফের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে স্কুল-কলেজে পঠনপাঠন। অন্যদিকে, আগামী ১ জানুয়ারি ছাত্র দিবস পালনের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তার আগে প্রাথমিক শিক্ষার সাফল্যের এই খবর রাজ্যবাসীর কাছে সত্যিই গর্বের মুহূর্ত তৈরি করলো।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পচিমবঙ্গের সাক্ষরতার হার ৭৭.০৮ শতাংশ। তার মধ্যে পুরুষদের সাক্ষরতার হার ৮১.৬৯ শতাংশ এবং মহিলাদের সাক্ষরতার হার ৭০.৫৪ শতাংশ। প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক মিলিয়ে রাজ্যে মোট ৮০০০ স্কুল রয়েছে। উচ্চ শিক্ষার জন্য রাজ্যে রয়েছে ৫০০-এরও বেশি কলেজ এবং ৩৩টি বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে বেশ কয়েকটি প্রকল্প চালু করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষায় জাতীয় পুষ্টি সহায়তা প্রকল্প, প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের শিক্ষার জাতীয় কর্মসূচী এবং শিক্ষার উন্নয়নে সর্বশিক্ষা অভিযান।
১৯৬৬ সালে, ইউনেস্কো ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, যাতে বিশ্বের সমস্ত সম্প্রদায় ব্যক্তি ও সমাজের জন্য সাক্ষরতার গুরুত্ব বুঝতে পারে এবং শিক্ষার প্রতি আরও উদ্বুদ্ধ হয়। নিজের জীবনকে সার্থক করার জন্য সম্পদ হিসেবে শিক্ষার অন্তর্নিহিত মূল্য ছাড়াও, শিক্ষার মাধ্যমে স্বনির্ভর হয়ে গোটা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। ২০০৯ সালের অগাস্টে সংসদে পাস হয় যুগান্তকারী শিক্ষার অধিকার আইন। যেখানে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের পড়াশোনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং পড়াশোনার জন্য কোনও খরচ করতে হবে না।
ইউনিফাইড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন প্লাস (ইউডিআইএসই+) -এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একমাত্র রাজ্য যেখানে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অতিক্রম করেছে। আর মাত্র তিনটি রাজ্য—অরুণাচল প্রদেশ, আসাম এবং মেঘালয়ের স্কুলে ছাত্রদের চেয়ে বেশি ছাত্রী ভর্তি করেছে। ইউনিফাইড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন প্লাস-এর জরিপে দেখা যায়, ২০১৯-২০-এর শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১৮, ৭৪, ৮৭, ৭৯২ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, যেখানে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের সংখ্যা বেশি।
নারীশিক্ষার সাফল্য রাজ্য সরকারের উদ্যোগে ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় বারবার উঠে এসেছে, মেয়েরাই জাতির সম্পদ ও তারা সবাইকে গর্বিত করে। প্রকৃতপক্ষে, মেয়েদের ক্ষমতায়নের জন্য তিনি বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সেরকমই একটি সফল উদ্যোগ হলো- কন্যাশ্রী, যা ২০১৭ সালের জুনে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ জনসেবামূলক পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিল। ৬২টি দেশের ৫৫২টি সামাজিক প্রকল্পের মধ্যে কন্যাশ্রীকে সেরার স্থান দেওয়া হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী প্রবর্তিত সবুজ সাথী প্রকল্পের পাশাপাশি কন্যাশ্রীর মাধ্যমে প্রায় ৬৭ লক্ষ মেয়ে উপকৃত হয়েছে।
রাজ্য সরকারের শিক্ষামূলক প্রকল্পগুলির জন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও উপকৃত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, রাজ্য জাতীয় স্তরের শিক্ষার মানদণ্ডে অনেক এগিয়ে রয়েছে। ২০১৯-২০ সালে, মোট ৩০.০৯ শতাংশ মুসলিম ছাত্ররা বিভিন্ন রাজ্যের শিক্ষা ক্ষেত্রে পৌঁছাতে পেরেছে, যার মধ্যে ৩২.০৪ শতাংশ ছাত্র এবং ২৯.০৪ শতাংশ ছাত্রী। এটি জাতীয় পর্যায়ে অগ্রগতির হারের চেয়ে অনেক ভালো। আমেরিকান সমাজ সংস্কারক, বিলোপবাদী, বক্তা, লেখক এবং রাজনীতিবিদ ফ্রেডরিক ডগলাস একবার বলেছিলেন, “একবার আপনি পড়তে শিখলে আপনি চিরকালের জন্য স্বাধীন।”