চূর্ণি দিয়ে আবার বইবে স্বচ্ছ জল, নদী সংস্কারের উদ্যোগে রাজ্য সরকার

বরাদ্দ হয়েছে ৩ কোটি টাকা

“তবে আমাদের সেই রাণাঘাটের সেই সিদ্ধেশ্বরীতলার/ সেই পুকুরপাড়ের বাড়ি আর তার গাছ আর/ চূর্ণি নদীর তীরই মনে পড়ে।” – জয় গোস্বামী

যে কবির ‘হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে’, তাঁর বুকের ভিতর অন্তঃসলিলা হয়ে বয়ে যায় শৈশবে দেখা চূর্ণি নদীও। পদ্মার এই শাখানদীটি নদিয়া জেলার মাথাভাঙা নদী থেকে উৎপন্ন হয়েছে। তারপর ৫৬ কিলোমিটার দূরে এসে চাকদহের কাছে হরধামে ভাগীরথীতে মিশেছে। বিগত কয়েকবছর চূর্ণি নদী তার গতিপথে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে বারবার। আবর্জনায় পূর্ণ হয়ে জল চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এবার নতুনভাবে জল বইবে চূর্ণিতে। সূত্র মারফত শোনা গিয়েছে, চূর্ণি নদী সংস্কারে উদ‍্যোগী হয়েছে রাজ‍্য সরকার।

ইতিহাসের আলেখ‍্য দিয়েও চূর্ণি নদীর যাতায়াত। সপ্তদশ শতকে, নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় বর্গি আক্রমণ থেকে বাঁচতে রাজধানী নিয়ে আসেন মাজদিয়ায়। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সেই রাজধানীর চারিদিকে তিনি পরিখা নির্মাণ করেন। হাওলি নদীর মাথা চূর্ণ করে তৈরি হয় চূর্ণি নদী। এই নদীর আরেকটি শাখা ইছামতী, যা উত্তর ২৪ পরগণার মধ‍্যে দিয়ে বয়ে গেছে। ১৭৮০ সালের পর থেকে এই নদী বেশি করে পরিচিতি পায়। এই নদীপথ ছিল সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রধান পথ। এর পূর্বপাড়ে ছিল এক জমজমাট বাজার- ছোটোবাজার। এছাড়াও ছিল জমিদার পালচৌধুরীদের বড়োবাজার। বাজারদুটি এখনও বর্তমান আছে, তবে সেগুলি আর জমজমাট নেই আগের মতো।

ইতিহাস থেকে বর্তমান, এই দীর্ঘপথ বয়ে এসে হাঁপিয়ে উঠেছে চূর্ণি নদী। স্থানীয় পুরসভা ও পঞ্চায়েত এলাকার দূষিত জল আর বর্জ‍্য এসে কমিয়ে দিয়েছে নদীটির নাব‍্যতা। কচুরিপানা আর জঞ্জালে নদীর অনেক জায়গা প্রায় মজে গেছে। প্রশাসনিক সূত্র থেকে খবর পাওয়া যায় যে, বাংলাদেশের একটি কারখানা থেকে দূষিত জল ও বর্জ্যও এসে পড়ে এই নদীতে। ফলে এই নদীর জল হয়ে উঠেছে স্নানের অযোগ্য। এই নদীর জল ব‍্যবহার করা যায় না চাষের কাজও। প্রবল দূষণের কারণে এই নদীর প্রচুর মাছ মারা পড়েছে। তার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মৎসজীবীদের পেশাও। আগে এই নদীতে চলত লঞ্চ আর নৌকা। নদীর নাব‍্যতা কমে যাওয়ায় এখন তাও বন্ধ। স্থানীয় মানুষের বহুদিনের দাবি এই নদী সংস্কার করে নদীটিকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার।

সাধারণ মানুষের এই দাবিকে মর্যাদা দিয়ে রাজ‍্য সরকার পাঁচ বছরের জন‍্য ঘোষণা করেছিল চূর্ণি নদী সংস্কারের প্রকল্প। পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের অধীনস্থ কেএমডিএ (KMDA) এই প্রকল্পের দায়িত্ব পেয়েছিল। প্রথম ধাপের জন‍্য তিন কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। রাজ‍্য প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, এই প্রকল্পে মেলেনি কেন্দ্রের কোনও সহায়তা। তারপরেও রাজ‍্য প্রশাসন নিজেরাই এই গুরুত্বপূর্ণ নদীটিকে পুনর্জীবন দেওয়ার উদ‍্যোগ নিয়েছে, যা সত‍্যিই প্রশংসনীয়।

রাজ‍্য সরকারের এই উদ‍্যোগ, কর্মীদের দক্ষতা ও সাধারণ মানুষের সহায়তায় কিঞ্চিৎ সফল হয়েছে চূর্ণি প্রকল্প। ইতিহাস থেকে বয়ে আসা চূর্ণি নদী বাধাহীন ভাবে বয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে, আর তার বুকজুড়ে ভরা থাকছে স্বচ্ছ, দীঘল জল। বৃদ্ধ কবি আবার চূর্ণি নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালে দেখতে পাবেন এক বাচ্চাকে, যে তার বাবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে দেখছে চূর্ণি নদীর শোভা। বড়ো হওয়ার পর যে সুখস্মৃতি উঠে আসবে তার কলমে, “দেখলাম বড়ো একটা নৌকো ধীরে ধীরে ভেসে চলেছে,/ একটা ছই রয়েছে,/ ওইরকম নৌকো কতই দাঁড়িয়ে থাকে চূর্ণির তীরে,/ নৌকোর কাণা পর্যন্ত জল…”।
 

Developed by DXDasia