সন্ধ্যারতি-খ্রিস্টসংগীত থেকে কেক-লজেন্স-পেস্ট্রিতে ভরা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ক্রিসমাস

মঠ ও মিশনের ইতিহাসে ক্রিসমাস ছিল সলতে পাকানোর দিন

১৮৮৬ সালের ১৬ অগাস্ট শ্রীরামকৃষ্ণ দেহত্যাগ করেছেন। ওই বছর ডিসেম্বর মাসে নরেন্দ্রনাথ তাঁর গুরুভাইদের নিয়ে পরিকল্পনা করলেন আঁটপুর যাবার। কেন? কারণ অনেকদিন থেকেই গুরুভাই বাবুরামের মা নেমন্তন্ন করে রেখেছেন তাঁদের বাড়িতে। কিন্তু সবাই মিলে যাবার সুযোগ হয়নি। এইবার সুযোগ হল। ২৪ ডিসেম্বর তারকেশ্বর লোকালে চেপে হাওড়া থেকে সবাই চললেন আঁটপুর। বেশ পিকনিকের মেজাজ। গান গাইতে গাইতে ট্রেনের লোকজন মাতিয়ে তাঁরা পৌঁছলেন ঘোষেদের জমিদারিতে। দুপুরে ভালোমন্দ খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে সন্ধেতে নরেন্দ্রনাথ সবাইকে নিয়ে ঠাকুরদালানের উঠোনে এলেন।

১৮৮৬ সালের হুগলি (Hooghly) জেলার এক গ্রামের রাত। বুঝতেই পারছেন এখনকার মতন জলসা বা বাজির আওয়াজের বিঘ্ন নেই। মেঘমুক্ত আকাশে তারা ফুটে রয়েছে। ছোটো করে আগুন জ্বালিয়ে ধুনি তৈরি করলেন। তাকে ঘিরে সবাই বসে ধ্যান করলেন বেশ খানিকক্ষণ। ধ্যানের পর নরেন্দ্রনাথ বলতে শুরু করলেন যিশু ও তাঁর অনুগামীদের কথা। যাঁরা আর্ত পীড়িত মানুষকে বুকে টেনে সেবা করেছিলেন এবং মানবকল্যাণে নিজেদের জীবন নিবেদন করেছিলেন। এই বলে নরেন্দ্রনাথ গুরুভাইদের উদ্বুদ্ধ করেন ও অগ্নিসাক্ষী করে তাঁরা সবাই ভবিষ্যৎ সাধু জীবনের অঙ্গীকার করেন। পরে তাঁরা জেনে আরও আনন্দিত হন যে, সেই রাত ছিল যিশুর জন্মের রাত। সেই থেকে রামকৃষ্ণ পরিমণ্ডলে এই সন্ধের গুরুত্ব অপরিসীম।

নরেন্দ্রনাথ গুরুভাইদের উদ্বুদ্ধ করেন ও অগ্নিসাক্ষী করে তাঁরা সবাই ভবিষ্যৎ সাধু জীবনের অঙ্গীকার করেন। পরে তাঁরা জেনে আরও আনন্দিত হন যে, সেই রাত ছিল যিশুর জন্মের রাত। সেই থেকে রামকৃষ্ণ পরিমণ্ডলে এই সন্ধের গুরুত্ব অপরিসীম।

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের (Ramakrishna Math and Mission) ইতিহাসে ‘ক্রিসমাস ইভ’ সলতে পাকানোর দিন। পাশ্চাত্যে গিয়ে বিবেকানন্দ এবং অন্যান্য গুরুভাইরা পরিচিতি পেয়ে, অর্থসাহায্যের বন্দোবস্ত করে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করবার বহু আগেই ১৮৮৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাতে সারাজীবনের ত্যাগব্রতের সংকল্প করেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের ৯ জন ত্যাগীশিষ্য। পরবর্তীতে তাঁরাই, বহুজনহিতায়-বহুজনসুখায় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন রামকৃষ্ণের নামে। অগ্নিসাক্ষী রেখে সেই ত্যাগব্রতে নাম লেখানোর দিন ক্রিসমাস ইভ।

১৮৩৪ সালে ৩৮ বছর বয়সে শ্রীরামকৃষ্ণ খ্রিস্ট ধর্ম অভ্যাস করেছিলেন। সেই সময়ে যদু মল্লিকের বাড়ির বসবার ঘরে মেরির কোলে যিশুর ছবি দেখে ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়েন। পরে পঞ্চবটিতেও অতীন্দ্রিয় ধারণা হয় শ্রীরামকৃষ্ণের। সমস্ত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে এই দিনটি ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হয়। আমরা স্কুলে থাকতে দেখতাম পুরুলিয়ার চার্চ থেকে একজন ফাদার এসে যিশুর জীবনচরিত শোনাতেন। তারপর আমরা অর্গান বাজিয়ে গান গাইতাম।

বিশ্বজুড়েই রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রতিটি শাখাতেই আলাদা গুরুত্ব সহকারে পালিত হয় এই সন্ধ্যাটি। আঁটপুরে ধুনি-উৎসব পালন হয়। ওই স্থানে পরবর্তীতে নির্মিত একটি ধুনি জ্বালিয়ে হোম হয়। বেলুড় মঠ-সহ অন্যান্য সেন্টারে শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ধ্যারতির পর মাতা মেরির কোলে যিশুর ছবি সাজিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। ক্রিসমাস ট্রি, পাতাবাহার গাছ, মরসুমি ফুলের গাছ দিয়ে সাজানো হয়। বড়ো বড়ো মোমবাতি জ্বলতে থাকে। তিন পুরোহিতকে পথ দেখানো তারা নিয়ে অলংকরণ করা হয়। চুড়ো করে ভোগ নিবেদন করা হয়। ভোগের উপকরণে থাকে কেক, বিস্কুট, লজেন্স, মরসুমি ফল, কফি থেকে শুরু করে ওয়াইন, মায় চুরুট পর্যন্ত।

ক্রিসমাস মরশুমে বেলুড় মঠ এবং অন্যান্য জায়গায় সন্ধ্যারতির পর গাওয়া হয় রবীন্দ্রসংগীত। আলোচিত হয় ক্রিসমাসের মাহাত্ম্য।

রীতিমতো হিন্দুশাস্ত্রানুসারে দশোপচারে পূজা সেরে ভোগ নিবেদন করা হয়। ভোগ নিবেদনের পর কর্পূরারতি করা হয়। আরতি শেষে শুরু হয় ক্রিসমাস ক্যারল ও খ্রিস্টসংগীত। রবীন্দ্রসংগীত ছাড়াও রামকৃষ্ণ পরিমণ্ডলের বেশ কিছু খ্রিস্টসংগীত রয়েছে। সেগুলি গাওয়া হয়। এরপর পুরুলিয়া আশ্রমে দেখেছি স্থানীয় চার্চের প্রধান ফাদার যিশুর পবিত্র জীবন নিয়ে বক্তব্য রাখেন। রামকৃষ্ণ মিশনের প্রবীণ সন্ন্যাসী স্বামী গম্ভীরানন্দ প্রণীত বিবেকানন্দের জীবনী গ্রন্থ থেকে আঁটপুর অংশটি পাঠ করেন। রামকৃষ্ণ ও যিশুর জীবন নিয়ে তুলনামূলক ভাবগম্ভীর আলোচনা এবং রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠায় এই সন্ধ্যাটির গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়। এরপরে প্রসাদ বিতরণ হয়। বেশ ‘অন্য রকমের’ প্রসাদ পেয়ে সকলেই উৎফুল্ল চিত্তে মন্দির প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন।

যেকোনো উৎসবই আসলে নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীর মানুষজন শুরু করলেও তা ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যেকটি জাতির ঘরে ঘরে। তা দুর্গাপুজো হোক, ইদ হোক বা ক্রিসমাস। রামকৃষ্ণ মিশনের বড়োদিন উদযাপনও বারবার এই বার্তাই স্মরণ করায়।

____

ছবি : বেলুড় মঠ মিডিয়া গ্যালারি

Developed by DXDasia