অভাবে সংসারে মান-অভিমানে ভরপুর চোর-গিন্নির বারোমাস্যা

গ্রাম বাংলায় চোরের গার্হস্থ্য জীবন

চোরেদের প্রতি আমাদের প্রচণ্ড রাগ। আমাদের মানে গৃহস্থ মানুষদের। আমরা কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তিল তিল করে নিজেদের ভাঁড়ারকে সাজিয়ে তুলব, আর চোর হতভাগা কয়েক মুহূর্তে সেটা নিয়ে চম্পট দেবে! রাগ হবারই কথা। তা বলে কি রাগ দুঃখ অভিমান শুধু যার চুরি যাচ্ছে তারই থাকে? যে চুরি করছে তার থাকে না? সে কি স্বপ্ন দেখে না যে এমন একটা দিন আসবে, যেদিন তাকে অভাবের তাড়নায় আর চুরি করতে হবে না? সেও তো গৃহস্থ। তারও তো পরিবার আছে। তার স্ত্রী কি চায় না যে একদিন সেও আর পাঁচটা সম্পন্ন পরিবারের মতো মাথা উঁচু করে বাঁচবে? কথাগুলো অনেকটা দার্শনিকের মতো শোনায়। তবে ইউনিভার্সিটির ডিগ্রিধারী ভাবুকদের অনেক আগেই এই কথাগুলো নিয়ে ভেবেছেন গ্রাম বাংলার লোকশিল্পীরা। চোর আর তার বউয়ের সুখ, দুঃখ, মান, অভিমান নিয়ে তারা গান বেঁধেছেন। এখনও জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ারের পশ্চিম ডুয়ার্স অঞ্চলের রাজবংশীদের মধ্যে চোর-চুন্নির গানের চল রয়েছে। চোরের গার্হস্থ্য জীবনের বিরহ-যন্ত্রণা, আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা তো বটেই, তাদের প্রতি সহানুভূতির মোড়কে গ্রামের দরিদ্র মানুষদের জীবন সংগ্রামের ছবিও উঠে আসে চোর-চুন্নির গানে।

অসম-বাংলা সীমান্ত অঞ্চলের লোককথায় একটা গল্প প্রচলিত আছে। মহীরাবণ যখন রামচন্দ্রকে অপহরণ করে পাতালে নিয়ে যায়, তখন হনুমান পাতাল থেকে রামচন্দ্রকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। এই সময়ে মহীরাবণের অনুচরেরা চিৎকার করতে থাকে ‘চোর’ ‘চোর’ বলে। এই কাহিনিকে ঘিরেই চোর-চুন্নির গানের উৎপত্তি বলে এখানকার স্থানীয় লোকেরা বিশ্বাস করেন। কার্তিক মাসে দীপান্বিতা কালীপুজোর পনেরোদিন আগে থেকে শুরু করে কালীপুজোর রাত পর্যন্ত চোর-চুন্নির গানের দল গৃহস্থ বাড়ি বাড়ি ঘুরে মাগন সংগ্রহ করে। মোটামুটিভাবে একেকটা দলে ২০-৩০ জনের মতো লোক থাকেন। গ্রামের কোনো সম্পন্ন কৃষক, জোতদার বা জমিদাররা গানের দলকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তাঁর বাড়ির ডারি ঘর, অর্থাৎ, বাইরের দিকে যে ঘর পুরুষ অতিথিদের জন্য নির্দিষ্ট থাকে, সেখানে বসে তালিমের আসর। দলে থাকেন একজন প্রধান গায়ক, আর তার সহযোগী তিন চার জন দোহার। দলের একজনকে চোর সাজানো হয়, আরেকজন পুরুষকে মেয়ে সাজিয়ে বানানো হয় চুন্নি বা চোরের স্ত্রী। সঙ্গে দোতারা, খোল, সারিঞ্জা, বাঁশি, জুরি, করতাল ইত্যাদি নিয়ে বাদকরাও হাজির থাকেন।

ড. নির্মলেন্দু ভৌমিক চোর-চুন্নির পালায় তিনটে পর্যায়ের কথা জানিয়েছেন। প্রথম পর্যায়ে আদি ও অকৃত্রিম চৌর্যবৃত্তি বিষয়ক গান, তারপর বৈষ্ণব প্রভাবে চোর হয়ে ওঠে ননীচোর এবং বস্ত্রহরণকারী। অবশেষে সমকালীন নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ঘটনা জায়গা করে নেয় পালাগানে। পালার শুরুতে থাকে চোর চক্রপতি ভগবান কৃষ্ণ আর স্থানীয় লৌকিক দেবদেবীর বন্দনা। যেমনঃ

“ও বন্দনা করি চোর চকর পতি

চোর চকর পতি রে তোর পায়ে ভক্‌তি

পাটের ঠাকুর গায়ে গারাম

তাক বন্দিলে হয় আরাম

থানের থানসিড়ি বন্দং

ও বন্দনা করি চোর চকর পতি

চোর চকর পতি রে তোর পায়ে ভক্‌তি।”

এরপর শুরু হয় চোর আর চুন্নির চাপান উতোর। গানে চোর কোনো ধনী বাড়িতে চুরি করতে যাওয়ার আগে স্ত্রী চুন্নির থেকে বিদায় চায়। তার ইচ্ছে, স্ত্রীকে সে একদিন দামি গয়না আর পোশাক কিনে দেবে। চুরি করা টাকায় জমি কিনে চাষবাস করবে, তার সংসার হবে সুখের, চুন্নিও সমাজে মর্যাদা পাবে। তাই হাসিমুখে সে বিদায় চায় স্ত্রীর কাছে, কিন্তু চুন্নির মনে তবুও থেকে যায় আশঙ্কা। পুরো গানের মধ্যেই নাট্যধর্মীতা রয়েছে। ধরা যাক, চুন্নি বলেঃ

“চোরারে

আসিছে পূজার বাজার

লাগে মোক একখানা চন্দ্রহার

দিনে দিনে দিন যাছে মোর

করেক তু বিচার”।

তখন অসহায়ভাবে চোর জানায়ঃ

“চুন্নি গে,

না নাগে কান্দিবার

দিবার না পারিম চন্দ্রহার।

যতলা মাড়িনু পাটা

কি কইম তোক আর

শালার নাই পানু বাজার”।

চোর-চুন্নির গানের আলাদা কোনো মঞ্চ লাগে না। গৃহস্থ বাড়ির উঠোনে বা বাড়ির বাইরের ফাঁকা জায়গায় পালা পরিবেশন করেন গায়কের দল। গান শুনে খুশি হয়ে গৃহস্থ চাষিরা পারিতোষিক হিসেবে গায়কদের দিয়ে থাকে চাল, ডাল আর নগদ অর্থ।

তথ্যসূত্র – প্রান্ত উত্তরবঙ্গের লোকসংগীত, ড. নির্মলেন্দু ভৌমিক; বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশ্বকোষ, দুলাল চৌধুরী; বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতিকোষ, ড. বরুণকুমার চক্রবর্তী (সম্পাদনা)।

Developed by DXDasia