জলপাইগুড়ির চোর-চুন্নি : লোক-অভিনয়ের দিকে ফিরে দেখা

উত্তরবঙ্গের রাজবংশী জনজাতির মধ্যে প্রচলিত একটি লোকনাট্য

বাঙালি চিরকালই সুন্দরের পূজারী, শিল্পের পূজারী। অভিনয়– এক আশ্চর্য শিল্প। এই শিল্প মুহূর্তেই রচনা করে এক আশ্চর্য মায়ালোক। স্বপ্নকে সত্যি মনে হয়, বাস্তব ধরা দেয় স্বপ্নের আলোকে। অভিনয়ের জন্য প্রযোজকরা ঢেলে দিতে রাজি প্রভূত পরিমাণ অর্থ, এর জন্য সেজে ওঠে কত সেটস-প্রপস, কত লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের ভোজবাজি। অন্যদিকে, বহু কাল থেকে আজ পর্যন্ত গ্রামবাংলার মানুষেরা শুধুমাত্র স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দকে সঙ্গী করে অভিনয়ে মেতে ওঠেন। এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায় রাজবংশী জনজাতির মধ্যে প্রচলিত একটি লোকনাট্য চোর-চুন্নি-র কথা। কেমন সেই লোক-অভিনয়, সেদিকেই একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

জলপাইগুড়ি জেলায় এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে কার্তিক মাসে দীপান্বিতা অমাবস্যার সময়টিতে গ্রামের মানুষেরা কোনো মাঠে কিংবা কোনো বড়ো বাড়ির উঠোনে একত্র হয়ে চোর-চুন্নি পালার আয়োজন করেন।

জলপাইগুড়ি জেলায় এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে কার্তিক মাসে দীপান্বিতা অমাবস্যার সময়টিতে গ্রামের মানুষেরা কোনো মাঠে কিংবা কোনো বড়ো বাড়ির উঠোনে একত্র হয়ে চোর-চুন্নি পালার আয়োজন করেন। একমাস আগে থেকে বাড়ি বাড়ি ঘুরে চোর-চুন্নির দল গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করেন। সংগৃহীত অর্থে কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয়। কালীপুজোর পরদিন সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান হয়। চোর-চুন্নির শিল্পীরা সাজসজ্জা সম্পন্ন করে আসরে উপস্থিত হন। সকলের গলায় শোভা পায় রাজবংশী সম্প্রদায়ের বিশেষ গামছা। দলের সকলেই হন পুরুষ; কমবয়সী ছেলেদেরকেই চুন্নি অর্থাৎ চোরের স্ত্রী সাজিয়ে তোলা হয়।

এই লোকনাট্যে চোর ও চুন্নির কথোপকথনে উঠে আসে সমাজেরই ছবি। চোর এই চুরির পেশাকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে অভাবের তাড়নায়। সে আর পাঁচজনের মতোই। চুন্নিও গ্রামের ঘরের সাধারণ বউ। সেও চায় একটি সুখী গৃহকোণ। অভাবের সংসারে তার জো নেই। তাই স্থানীয় ভাষায় চুন্নির অভিযোগ –

‘আহার ভাঙ্গা ঘরে থাকিতে যাছে দিন,/ ও মোক হাতাশে না ধরে নিন।’

এই লোকনাট্যে চোর ও চুন্নির কথোপকথনে উঠে আসে সমাজেরই ছবি। চোর এই চুরির পেশাকে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে অভাবের তাড়নায়।

চোর ও চুন্নির কথা-কাটাকাটি লেগেই থাকে। চোরের সামর্থ্য নেই চুন্নির মনের সাধ মেটানোর কিন্তু চুন্নির মন কিছুতেই মানে না। তাদের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে শুধু নিজেদের গার্হস্থ্যের কথা নয়, গ্রামের কথা, রাজ্যের কথা, এমনকী দেশের কথাও উঠে আসে। একসময় গান্ধিজির আন্দোলন নিয়েও গান ও অভিনয় করতেন চোর-চুন্নির শিল্পীরা। ইন্দিরা গান্ধির সময়কালে জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গও এসেছে। আবার গ্রামে গ্রামে যখন প্রথম সিনেমা এলো, সেই ঘটনার সাক্ষ্যও বহন করে চলেছে চোর-চুন্নি –

 

‘দেখিবার যাই শিনিমা,/ ছবিগিলায় গান করিশে/ কেমন নাচে না।/ ওগে টিকিটের হার টাকা টাকা,/ বসিবার আছে ভালো জাগা,/ নীচের দাম সাড়ে সাত আনা।/ ওগে কেমন নাচন কেমন বাজন,/ কেমন ভঙ্গিমা,/ পষ্ট করি যাছে দেখা আর গান শুনা।’

বর্তমানে এগিয়ে চলা সময়ের স্রোতে, প্রযুক্তির ভিড়ে হারিয়ে না গিয়ে, গ্রাম-গঞ্জের এই প্রান্তিক মানুষগুলির অভিনয় করা আর অভিনয় দেখা– দুই-ই বেঁচে থাকুক প্রাণবন্ত হয়ে।

_________________
ছবি: নিজস্ব সংগ্রহ

Developed by DXDasia