৫০ টাকা সেলামিতে একটি ছোটো দোকানঘর কিনে শুরু করেন ডেকার্স লেনের রাজত্ব
ধরুন ধর্মতলা চৌরঙ্গী মোড় থেকে হেঁটে এগোচ্ছেন রাজভবনের দিকে। আপনার ডানহাতে বিখ্যাত কে সি দাস-এর বিরাট পশার; সামনে এগোলেন আরও মিনিট দুয়েক, পিয়ারলেস হাউসের সামান্য আগে ডানদিকে ঢুকে যাচ্ছে জেমস হিকি সরণী, ভালো নামে যা বলে পরিচিত। কলকাতার বুকে এক একচেটিয়া খাবারের গলি। নিশ্চিন্তে ৫৬ বছর পিছিয়ে গেলে দেখতে পাবেন ওপার বাংলা থেকে কিশোর বয়সে চলে আসা এক যুবক খুলে বসলেন তাঁর চায়ের দোকান। তাও আবার কলকাতার ডান অলিন্দের প্রায় মাঝখানে। গলি দিয়ে এগোতে এগোতে আপনি নানারকম ডাক শুনতে পাচ্ছেন এতক্ষণে। তবে চিত্তরঞ্জন রায় তাঁর সমস্ত ডাকনাম জুড়ে দিয়ে গেছেন ভাইদের হাতে, সেখান থেকে তাঁর ছেলেদের হাত হয়ে দোকান এখন ভাইপোর দায়িত্বে। উত্তরাধিকের বোঝা পিঠে নিয়ে হাসিমুখে দোকান সামলাচ্ছেন চিত্তবাবুর ভাইপো। অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে আসা কলকাতার এই নামজাদা চায়ের দোকান নিজেদের বেঁধে রাখেনি কেবলমাত্র চায়ের কাপে। দিনে দিনে খাবারের তালিকা বাড়তেই থেকেছে ক্রমশ। ঘুগনি, টোস্ট, চিকেন স্টু, ফিশ ফ্রাই, ফিশ রোল, চিকেন পকোড়া হয়ে সাম্প্রতিকতম সংযোজনে খিচুড়ি। একটা গুহার মতো ঘর আর একটা আপাত উজ্জ্বল দোকানে পাশাপাশি চলছে ‘চিত্তবাবুর দোকান’। জিজ্ঞাসা করায় জানা যায় নিরামিষকে আমিষের ছোঁয়া থেকে আলাদা রাখতেই পাশের দোকানটিও কিনে নেন তাঁরা। এখন দুটি দোকান ঘরে স্বতন্ত্রভাবে চলে আমিষ ও নিরামিষের রান্না এবং পরিবেশন। চিত্তরঞ্জন রায়-এর ভালোবাসার এই সৃষ্টি কলকাতার অফিস পাড়ার সঙ্গে মিশে এমন যেন ৭০ টাকার চিকেন স্টু-এর ঝোলে ৭ টাকার পাউরুটি চুবিয়ে দিয়েছেন কেউ, কামড়ের অপেক্ষামাত্র। পুরু পুরের ফিশফ্রাইও পিছিয়ে নেই কোনও কিছুর থেকে, বিশেষত যখন সঙ্গতে ঝাঁঝালো কাসুন্দি। তবে এই সবকিছুর চাপে ঐতিহ্য হারিয়ে বসেননি তাঁরা। এখনও স্থানীয় মানুষের কাছে চা-এর দোকান হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে চিত্তবাবুর স্বপ্ন।

নতুন সংযোজন, খিচুড়ির থালায় পাওয়া যাচ্ছে খিচুড়ি, একটি তরকারি, এক টুকরো পাঁপড়, বেগুনি, চাটনি ও পায়েসের মতো খেতে একটি মিষ্টি অর্ধতরল।
কলকাতার স্ট্রিটফুডের ইতিহাসে স্থান পাওয়া এই হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা বেশ কিছুদিন চায়ের স্টল চালিয়েছেন মোহনবাগান টেন্টে। তারপর রাধাবাজার স্ট্রিটে একটি ভাড়ার দোকান। শোনা যায় সেখান থেকে টাকা জমিয়ে ৫০ টাকা সেলামিতে একটি ছোটো দোকানঘর কিনে তিনি শুরু করেন ডেকার্স লেনের রাজত্ব এবং খাবারের স্বাদে জয় করতে থাকেন মানুষের মন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু বাঁধাধরা খদ্দেরও পেয়ে যান এই সৎ ব্যবসায়ী।
আরও পড়ুন
পুঁটিরামের মিষ্টিতে ১৫০ বছরের স্বাদ
তাঁর আদর্শে অনড় থেকেই দোকানটি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন উত্তর পুরুষেরা, সঙ্গে জুড়ছেন নতুন নতুন পদ। সময়ের সঙ্গে যেভাবে নতুনকে মেনে নিতে হয় আমাদের সকলকেই। তবে এখনও সন্ধের পর কোনও খাবার পড়ে থাকে না দোকানে। রোজের খাবার রোজ শেষ হয় এবং প্রতিদিন টাটকা খাবার মানুষকে খাওয়ানোতেই গর্ববোধ করেন দোকান কর্তৃপক্ষ। ৩০ টাকায় এমন গালভরা খিচুড়ির থালা কলকাতায় আতসকাচ নিয়ে খুঁজতে বেরোলেও পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

গলি দিয়ে আরও খানিক এগোলে চিত্তদার সুরুচি হোটেল। ১৯৯৩ সালে এই হোটেলটিও খোলা হয় একই মালিকানায়। শান্ত সুন্দর পরিবেশে বসে খেতে চাইলে এই জায়গাটি আপনার জন্য আদর্শ। খিচুড়ি ছাড়া দুটি দোকানের বাকি সমস্ত পদ প্রায় একই দামে পাবেন এখানেও। ব্যাস আর কী! এই শীতের দুপুরে বুনে রাখা উলের মতো অলিগলি ধরে হাজির হয়ে যান চিত্তরঞ্জন রায়-এর হোটেলে। একজন নিঃস্ব মানুষের গড়ে তোলা খাদ্য সাম্রাজ্য অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। আমরা শুনতে পেয়েছি মানুষের মনের রাস্তা পেটের মধ্য দিয়েই যায়।