চৌরঙ্গী গিরি নামে এক সন্ন্যাসীর নাম থেকেই অঞ্চলটির নাম হয় ‘চৌরঙ্গী’
সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার কথা। শহর কলকাতা আধুনিক ভাবে তখনও গড়ে ওঠেনি। আজকের ময়দান ও এসপ্ল্যানেড ছিল সে সময় ব্যাঘ্র-সংকুল জঙ্গল। এর পশ্চিম দিকে ছিল একটি প্রাচীন রাস্তা। সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার বড়িশা থেকে হালিশহর পর্যন্ত এই রাস্তাটি নির্মাণ করিয়েছিলেন।
এখানে সে সময় ছিল তিনটি ছোটো ছোটো গ্রাম – চৌরঙ্গী, বিরজি ও কোলিম্বা। শোনা যায়, 'চৌরঙ্গী গিরি' নামে এক সন্ন্যাসীর নাম থেকেই নাকি অঞ্চলের নাম হয় 'চৌরঙ্গী'। আরও জানা যায়, এই সন্ন্যাসীই হিন্দু দেবী কালীর একটি মুখাবয়ব নিয়ে আদি কালীঘাট মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
চৌরঙ্গী তখন জলাভূমি। ধানক্ষেত আর বাঁশঝাড়ে ভরা একটি ছোট্ট গ্রাম। সেই গ্রামে দেখা মিলত ছোটো ছোটো কুঁড়েঘরের। শুধু তাই নয় একটি জঙ্গল দ্বারা চৌরঙ্গী গ্রামটি গোবিন্দপুর গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। শোনা যায়, ওয়ারেন হেস্টিংস সেই জঙ্গলে হাতি নিয়ে বাঘ শিকার করতে আসতেন।
পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশদের রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। বাণিজ্যিক কারণে তারা শহর গড়ার কাজে হাত দেয়। কয়েক বছরের মধ্যে কলকাতায় ব্রিটিশরা ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণের কাজ শুরু করে। এই সময় কলকাতায় থাকা ইউরোপীয়রা ময়দানের দিকে বসবাস করত। আর অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইংরেজরা চৌরঙ্গীতে বড়ো বড়ো অট্টালিকা নির্মাণের কাজে হাত দেয়। যার ফলে কলকাতা পায় ‘প্রাসাদ নগরী’র তকমা।
১৮৫৭, ৬ জুলাই। সন্ধ্যাবেলায় চৌরঙ্গী অঞ্চল ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানির গ্যাসের আলোয় চারপাশ ঝলমল করে ওঠে। সেজে ওঠে চৌরঙ্গীর আশপাশ।
এর এক বছর পর চৌরঙ্গীতে কলকাতার প্রথম ফুটপাথ তৈরির কাজ শুরু হয়। ফুটপাথ তৈরির নেপথ্যে কারণ ছিল গ্যাসের বাতিস্তম্ভ স্থাপন। কিন্তু রাস্তার দু'পাশে সারিবদ্ধভাবে বাতিস্তম্ভ স্থাপনের জন্য ব্যবসায়ীরা আপত্তি জানায়। কারণ তাদের দোকানে আগত খদ্দেরদের গাড়ি দোকান থেকে অনেকটা দূরে রেখে দোকানে আসতে হচ্ছিল। অনেক বাবুদের তাতে খুব অসুবিধা হচ্ছিল। দোকানিরা ইংরেজদের সে-বিষয়ে জানাতে গেলে কোনো ফল হল না। ইংরেজ শাসকরা জানালেন, পরবর্তীকালে তাঁরা চৌরঙ্গীতে আলাদাভাবে পার্কিং-এর বিষয়টির দিকে নজর দেবেন।
চৌরঙ্গীর সুবিশাল রাস্তাটি দক্ষিণে লোয়ার সার্কুলার রোড যা এখন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড নামে পরিচিত সেখান থেকে উত্তরে ধর্মতলা পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। পুরনো মানচিত্র দেখে জানা যায়, চৌরঙ্গী একটি অঞ্চল এবং স্থানের নাম। শুধু রাস্তার নাম নয়। কর্নেল মার্ক উড ১৭৮৪ সালে একটি মানচিত্র অঙ্কন করেন, যেখানে তিনি চৌরঙ্গী অঞ্চলের রাস্তাটির নাম ‘রোড টু চৌরঙ্গী’ বলে উল্লেখ করেছেন। ইংরেজ আমলে পার্ক স্ট্রিটের দক্ষিণদিকের অঞ্চলটির নাম ছিল ‘চৌরঙ্গী’।
লন্ডনে যেমন 'পিকাডিলি', নিউ ইয়র্কে যেমন 'ফিফথ অ্যাভিনিউ' এবং প্যারিসে যেমন 'চ্যাম্পস এলিসিজ', কলকাতায় তেমনই বিখ্যাত এই 'চৌরঙ্গী'।
Also Read
বাবুঘাটের ইতিকথা
কলকাতায় এক সময় অনেকগুলি ইংরেজি নাট্যশালা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তার মধ্যে বিখ্যাত ছিল 'ক্যালকাটা থিয়েটার'। আর এই ক্যালকাটা থিয়েটার ছাড়াও সে সময় আরও দুটি বিখ্যাত থিয়েটার ছিল। একটি হল 'চৌরঙ্গী থিয়েটার' এবং অন্যটি 'সানসৌসি থিয়েটার'। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন চৌরঙ্গী থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর অনেক রাস্তারই নাম বদলাল। চৌরঙ্গী রোডেরও নাম বদলে হল ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর নামে। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী চৌরঙ্গীর নাম বদলে যাই নাম রাখা হোক না কেন চৌরঙ্গী কিন্তু চৌরঙ্গী নামেই জনপ্রিয় থাকবে।
ঔপন্যাসিক শংকর 'চৌরঙ্গী' নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। প্রকাশের অল্পদিনের মধ্যেই উপন্যাসটি আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা লাভ করে। উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট ছিল পঞ্চাশের দশকের কলকাতা আর চৌরঙ্গীর অন্যতম বৃহৎ হোটেল শাহজাহানের কর্মচারী ও অতিথিদের অন্তরঙ্গ জীবনের নানান গল্প। চৌরঙ্গী উপন্যসের কাহিনি নিয়ে সিনেমা হয়। উত্তমকুমার অভিনীত সেই সিনেমাও সুপারহিট হয়।
চৌরঙ্গী আজও শহর কলকাতার প্রাণকেন্দ্র। অজস্র গল্প উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু।