একটি বিজ্ঞাপনই যত নষ্টের মূলে
গ্র্যান্ড হোটেলে সেদিন খানাপিনার জন্যে লোক যায়নি এমনটা নয়। ভিড় যথেষ্টই ছিল। কিন্তু, তা-সত্ত্বেও ৪ অক্টোবর, ১৯২৯ তারিখটি গ্র্যান্ড হোটেলের জন্য যথেষ্ট বিড়ম্বনার একটি দিন হয়ে উঠল। সেদিন কবিকে নিয়ে সে কী বিভ্রাট! কবি মানে যে-কেউ নন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। একে বিশ্বকবি, তার ওপর ঠাকুরবাড়ির মানুষ বলে কথা! এমনিতে গ্র্যান্ড হোটেলে মানুষ সাধারণত খানাপিনা, আমোদ-আহ্লাদ করতেই ব্যস্ত থাকে। কিন্তু, সেদিন ওখানে আয়োজিত হল থিয়েটার। আর, সেটা করতে গিয়েই গোল বাঁধল।
রবীন্দ্রনাথ তখন ব্যস্ত তাঁর নাটককে কলকাতার দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে। শান্তিনিকেতনের পাশাপাশি কলকাতার নানা জায়গায় তিনি তাঁর লেখা নাটকের অভিনয়ের ব্যবস্থা করছেন। শুধু তাই নয়, অন্য অনেক থিয়েটার কোম্পানিও তাঁর নাটকের অভিনয় করছে দিকে দিকে। সেইসব থিয়েটারের তখন ফুল হাউস শো। সে এক হৈ হৈ ব্যাপার। আজ লাট দম্পতি তাঁর নাটক দেখতে যান তো কাল আাসেন বেলজিয়ামের রাজা-রানী। সেই অনুসারে কলকাতার এক সুপ্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশ পেল রবীন্দ্রনাথের একটা নাটক নিয়ে। বিজ্ঞাপনটি ওপরের তারিখে প্রকাশিত। অর্থাৎ, ৪ অক্টোবর, ১৯২৯ -এ। তাতে লেখা হল, “আমরা বিশ্বস্ত সূত্রে জানিলাম ‘চতুরঙ্গ’ সমিতি কর্তৃক গ্র্যান্ড হোটেলে রবীন্দ্রনাথের ‘রুদ্ররাজ’ নাটকের যে আয়োজন হইতেছে, বিশ্বভারতী, ব্যক্তিগতভাবে রবীন্দ্রনাথ অথবা ওরিয়েন্টাল আর্ট সোসাইটির সহিত উহার কোনও সম্পর্ক নাই।” সে যাই হোক, লোকে ছুটল সেই নাটক দেখতে। হাজার হোক রবীন্দ্রনাথের নতুন নাটক বলে কথা। যথাসময়ে টান টান উত্তেজনা নিয়ে যখন সবাই গিয়ে মঞ্চের সামনে হাজির, তখনই দেখা গেল এক মস্ত ভুল হয়ে গিয়েছে।
আরও পড়ুন
চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের গান
সেই ভুলের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বলে নেওয়া ভালো যে সেই নাটকটিও কিন্তু জনমানসে সাড়া ফেলেছিল সেদিন। লোকে কিন্তু ধন্য ধন্যই করেছিল নাটকের। প্রাচীনকালের শিল্পকলার শৈলীতে তৈরি হয়েছিল নাটকের সেট। কিন্তু, পরের দিন সেই সংবাদপত্রটিই খবর প্রকাশ করে জানাল, গ্র্যান্ড হোটেলে কবি-বিভ্রাট ঘটেছে।
সংবাদের বয়ানে বলা হল, ‘গত রাত্রে গ্র্যান্ড হোটেলে ‘রুদ্ররাজে’র অভিনয় হয়। রঙ্গমঞ্চের সাজসজ্জা প্রাচীনকালের আদর্শে। ‘রুদ্ররাজ’ শ্রীযুক্ত সুভগেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লিখিত নাটক। ভ্রমবশতঃ আমরা পুস্তকখানি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের লেখা বলিয়া প্রকাশ করিয়াছিলাম। লেখক কবির ভূমিকা নিজে গ্রহণ করিয়া কবির হৃদয়ের ভাব বাহিরে আজ সুন্দরভাবে ফুটাইয়া তুলিয়াছিলেন। প্রকৃতই অভিনয় বড়ই মনোমুগ্ধকর হইয়াছিল।’
আরো পড়ুন
প্রথম বাঙালি কোটিপতির গল্প
গ্র্যান্ড হোটেল আজও কলকাতার বুকে পাঁচ তারকা বিলাসবহুল হোটেল হিসেবে কলকাতার মানুষজনের কাছে পরিচিত। কিন্তু, সেখানেই যে লুকিয়ে আছে কবিকে নিয়ে বিভ্রাটের এমন মজার ইতিহাস। এ কথা অবশ্য আজ আর আমাদের মনে রাখার অবকাশ নেই। আজও হরেক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকে সেই বিলাসবহুল হোটেলে। কিন্তু তারই ফাঁকে কান পাতলে হয়তো ফিসফিসিয়ে শোনা যায় ‘রুদ্ররাজে’র গল্প। আর কেউ না বলুক, দেওয়ালের যেমন কান আছে, ইতিহাসেরই তেমনই কণ্ঠ আছে যে।