চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের গান

সময়কালকে বোঝানোর জন্য বেশ কিছু রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহার করা হয়েছে

শেখর দাস
রবীন্দ্রনাথের গানের প্রথম ব্যবহার হয় কবির জীবনকালেই, প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’ ছবিতে। এই ছবির সংগীত পরিচালক পঙ্কজ কুমার মল্লিক ছিলেন সুগায়ক ও রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত স্নেহভাজন। যদিও শোনা যায় এই ছবিতে ব্যবহৃত বিপুল জনপ্রিয় দিনের শেষে ঘুমের দেশে গানটির যে সুর পঙ্কজবাবু দিয়েছিলেন তাতে কবিগুরু বেশ রুষ্ট হয়েছিলেন। ‘মুক্তি’ ছবিটি সম্ভবত ১৯৩৫-৩৬-এর কোনো সময়ে মুক্তি পায়। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত কত ছবিতে যে রবীন্দ্রনাথের গান ব্যবহার হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান বার করা সত্যিই দুষ্কর। মোটামুটি যা হিসেব পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথের প্রায় ২৫০টির কাছাকাছি গান বাংলা সিনেমায় ব্যবহার হয়েছে। এর থেকে প্রশ্ন এসে পড়ে যে কেন চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসংগীতের এই ব্যাপক ব্যবহার?

সিনেমার বিশেষ ক্ষেত্রে ভাব অনুযায়ী রবীন্দ্রসংগীতের প্রয়োগ হয় সাধারণত। এই অসাধারণ প্রয়োগ আমরা দেখেছি ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে) কিংবা সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ (এ পরবাসে রবে কে), ‘জন অরণ্য’ (ছায়া ঘনাইছে বনে বনে) অথবা তপন সিংহের ‘অতিথি’ (আমার মুক্তি আলোয়), ‘হাটে বাজারে’ (নদী আপন বেগে পাগলপারা), অজয় করের ‘মাল্যদান’ (ঘরেতে ভ্রমর এলো)… এমনই আরো বেশ কিছু চলচ্চিত্রে।

সিনেমার সময়কালকে বোঝানোর জন্য অনেক সময় বেশ কিছু রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন পূর্ণেন্দু পত্রী পরিচালিত ‘স্ত্রীর পত্র’তে বাংলার ‘মাটি বাংলার জল’, সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’তে ‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি’, ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’-এ ‘ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে’ বা ‘সুভাষচন্দ্র’তে ‘তোমার আসন শূন্য আজি’ ইত্যাদি।

আরও দুভাবে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। প্রথমটি ট্রানজিশান হিসাবে। কাহিনীর গতিকে ব্যাহত না করে তার ছন্দে গানকে ব্যবহার করে কাহিনীর অন্য সূত্রের উত্তরণ ঘটানো। এর চমৎকার উদাহরণ ‘তিন কন্যা’ ছবিতে ‘বাজে করুণ সুরে’র ব্যবহার। এছাড়া এ গানে মূল চরিত্রের বিষাদের সুরটিও ধরা পড়ে। আর দ্বিতীয়টি সিনেমার অলংকার হিসাবে। এমন ব্যবহারই অবশ্য সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যায়। এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট প্রয়োগ দেখিয়েছেন তরুণ মজুমদার ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘ভালবাসা ভালোবাসা’ ও ‘আলো’ ছবিতে। এও বলতে হবে, ‘নিমন্ত্রণ’ ছবিতে ‘দূরে কোথাও দূরে দূরে’ গানটির ব্যবহারে তাঁর চিত্রকল্পনা এক অনবদ্য ব্যঞ্জনা তৈরি করে। যে কথাটি দিয়ে শুরু করেছিলাম আবার একটু সেদিকে ফিরে তাকাই। রবীন্দ্রনাথের গানের এই বহুল ব্যবহারের কারণ কী? আধুনিক বাংলা গানও তো বৈচিত্র্যে ভরা, বিশেষ করে সিনেমার গান। কত প্রতিভাধর সংগীত পরিচালক বাংলা গানের ডালি ভরে দিয়েছেন, তবুও বাঙালি সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রসংগীত আজও বিশিষ্ট স্থানে অধীশ্বর। যত দিন গেছে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত রুচিশীল শ্রোতার অঙ্গন ছাড়িয়ে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে গেছে রবীন্দ্রনাথের গান।

এই প্রসঙ্গে একটি স্মৃতি ভেসে উঠল। মেদিনীপুরের একটি আদিবাসী গ্রামে গেছি, স্থানীয় আদিবাসীদের গান সরাসরি রেকর্ড করব বলে। একটি সাঁওতাল পরিবারে গেলাম, সেখানেই থাকেন স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধান। বাড়ির সামনে গিয়ে শুনতে পেলাম ভেতর থেকে ভেসে আসছে রবীন্দ্রসংগীত। মনে পড়ে যায়, রবিবাবু একসময় বলেছিলেন তাঁর সৃষ্টির কিছু টিকে থাকুক বা না থাকুক তাঁর গান বাঙালির জীবনে চিরকাল থেকে যাবে। আর এ তো শুধু বাঙালির জীবন নয়, কোন দূরপ্রান্তের আদিবাসী ঘরেও সেদিন শুনেছিলাম রবীন্দ্রনাথের গান। পুজো, প্রেম, প্রকৃতি- এই তিন ভাগে ভাগ করা আছে তাঁর গান। আছে দেশাত্মবোধক গানও। প্রায় ২৫০০ গানের কথায় ও সুরে বিশ্বপ্রকৃতির সকল অনুভব, রূপ ও প্রার্থনা প্রকাশ পায়। রবীন্দ্রনাথ নিজের সৃষ্টির সম্বন্ধে লিখছেন, “গায়কেরা সঙ্গীতকে চেতনাহীন জড়ের ওপর স্থাপন করেন, আমি তাকে জীবন্ত করতে চাই। তাঁরা কথা বসিয়ে যান সুর বের করবার জন্যে কিন্তু আমি সুর সংযোগ করি কথার অর্ধকে যথার্থ ভাবে প্রকাশ করবার জন্যে।” এবং স্বয়ং বিশ্বকবির শব্দ-ছন্দ ব্যবহারে যে গান লেখা হয় তাতে সঠিক সুরযোগ ঘটলে যে অনির্বচনীয়তা সৃষ্টি হয় তা আজ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রসঙ্গত, আর একটি বিশেষ দিকের উল্লেখ করতে হয়, তা হল- প্রাচ্য, পাশ্চাত্য ও ইসলামীয়- এই তিন মহতী ধারার ত্রিবেণী সংগম ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের গানে। এর ফলে হিন্দি সিনেমাতেও রবীন্দ্রসংগীতের সুরের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যেমন, ‘আফসার’ ছবিতে শচীন দেব বর্মন সৃষ্ট ‘নয়না দিওয়ানে’ গানটি ‘সেদিন দুজনে’র অনুপ্রেরণায়, ‘সুজাতা’ ছবিতে ‘জ্বলতে হয়ে জিসকে লিয়ে’, ‘একদা তুমি প্রিয়ে’র অনুপ্রেরণায়। ‘যদি তারে নাই চিনি গো’ শচীনবাবুর প্রিয় গান। তিনি হৃষীকেশ মুখার্জির সুপারহিট ছবি ‘অভিমান’-এ এই সুরটি (তেরে মেরে মিলন কি ইয়ে রেয়না) ব্যবহার করেন। এমন কত উদাহরণ রয়ে গেছে। এমনকি জাতীয় সংগীতও যে কতবার ব্যবহার হয়েছে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার ছবিতে তার কোন হিসেব নেই। এ ব্যাপারে সম্ভবত বিমল রায়ের ‘উদয়ের পথে’ অগ্রণী। ভাবলেও অবাক লাগে, ১৯৪৩-এ স্বাধীনতার বহু পূর্বে বিমল রায় তাঁর এই বিখ্যাত ছবিতে প্রয়োগ করেছিলেন ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!’

(ঋণ – ভোরের কাগজ)

Developed by DXDasia