
কাঁকড়াবিছের কামড় খেয়েও লিখে গেছেন টানা
তখন ঢাকুরিয়ার দাসপাড়ায় থাকেন প্রবোধকুমার। মেঝেতে মাদুর পেতে উপুড় হয়ে শুয়ে লেখা অভ্যেস। একদিন লিখতে লিখতেই হঠাৎ পেটের কাছে জ্বালা শুরু হল। কিন্তু লেখা তো থামানো যাবে না। জ্বালা সহ্য করেই গোটা লেখা শেষ করলেন প্রবোধকুমার। তারপর উঠতেই দেখলেন, পেটের নিচে আস্ত একটি কাঁকড়াবিছে। ভাগ্যিস বিষ ঢোকেনি শরীরে। কিন্তু, হুলের ছোঁয়াতেই পেটের চারপাশ তখন লাল হয়ে ফুলে উঠেছে, সঙ্গে বিষম জ্বালা। অথচ এই জ্বালা নিয়েই তিনি লিখে গেছেন টানা চার-পাঁচ ঘণ্টা!
প্রবোধকুমার সান্যাল মানুষটা এমনই। বাংলা সাহিত্যের দুনিয়ায় এক আশ্চর্য চরিত্র। আশ্চর্য না হলে কেউ বিছের কামড় সহ্য করেও একটানা লিখে যেতে পারে! লেখার সময় তাঁর বাহ্যজ্ঞান লোপ পেত। টানা লিখে যেতেন। জীবনের সবচাইতে বড়ো উপন্যাস ‘হাসুবানু’ লিখেছিলেন ছ’মাস ধরে। লেখার পরে যখন উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে গেলেন। লিখতে লিখতেই পা থেকে কোমর পর্যন্ত অবশ হয়ে গিয়েছিল।
অথচ, লেখায় বুঁদ হয়ে থাকা এই মানুষটাই ঘরে টিকতে পারতেন না। বেরিয়ে পড়তেন পাহাড়ে। নিয়মে ঘেরা জীবনে তাঁর ঘোর অনীহা। বলতেন, “আমি সর্বপ্রকার সামাজিক শাসনের বিরোধী, জন্মের থেকে নিহিলিস্ট, জীবনধর্মে পেগান।” শৈশব থেকেই চাঞ্চল্য আর দুষ্টুমি তাঁর নিত্যসঙ্গী। ছোট্ট বেলাতেই দিদিমার মুখে কাশী যাওয়ার গল্প শুনে বাগবাজারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন কাশীর পথ খুঁজতে। রাস্তার এক পাহারাওয়ালা তাঁকে রাস্তায় ঘুরতে দেখে কোলে করে ফিরিয়ে দিয়ে যান। প্রবোধকুমারের বয়স তখন চার কিংবা পাঁচ।
স্কুলজীবন কেটেছে অভাবে, আজব সব খেয়ালে আর মেধার ঘোরে। মাস্টারের টিকি ধরে টেনে শাস্তি পেয়েছেন, বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছেন। চিত্তরঞ্জন দাশের ডাকে সাড়া দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন স্বদেশি আন্দোলনে। জেলও খেটেছেন। পাশাপাশি চলেছে কবিতা ও গল্প লেখা। বাড়িতে রাতে আলো জ্বলত না। খাতা-কলম বগলদাবা করে সোজা চলে যেতেন শিয়ালদা স্টেশন। একটা শান বাঁধানো জায়গা খুঁজে নিয়ে লেখা শুরু করতেন। পাশ দিয়ে হাজারো লোক আসত-যেত, ফেরিওয়ালার চিৎকার ঢুকে পড়ত কানে, ট্রেন স্টেশন ছেড়ে যেত শব্দ তুলে। হয়তো এক-আধবার চোখ তুলে তাকাতেন প্রবোধকুমার। গল্প, চরিত্র খুঁজে নিতেন। ফের বুঁদ হয়ে যেতেন লেখায়।
তারপর একসময় শহরে প্রাণ হাঁসফাঁস করতে লাগল। পকেটে মাত্র পঁয়ষট্টি টাকা নিয়েই রওনা দিলেন হিমালয়। মাত্র আটাশ দিনে পায়ে হেঁটে ঋষিকেশ থেকে আলমোড়ার রাণীক্ষেত অবধি ৬৪৪ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করেছিলেন প্রবোধকুমার। সেই কাহিনিই ঠাঁই পেয়েছিল তাঁর ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ বইতে। যে বই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের পৃথিবীতে চিরস্থায়ী জায়গা করে দিয়েছিল।
আরো পড়ুন
আসল ঘনাদার বাড়ি, শিবরাম এবং…
প্রবোধকুমারের প্রথম উপন্যাসের নাম অবশ্য ছিল ‘যাযাবর’। এ যেন প্রবোধকুমারেরই আদর্শ সম্বোধন। পাহাড় থেকে ফিরে কয়েকমাসের মধ্যেই পালিয়ে গেছেন রেঙ্গুনে। সেনাবাহিনীর চাকরি নিয়ে চলে গেছেন অধুনা পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির পাহাড়ে। সেখানেও ঘুরে বেড়াতেন নিজের মতো। কত বিচিত্র মানুষ দেখেছেন। এই সময়ে চুটিয়ে বেঁচেছেন প্রবোধকুমার। সে বাঁচায় উচ্ছৃঙ্খলতা ছিল বৈকি, কিন্তু ছিল জীবনকে চেটে-পুটে নেওয়ার ইচ্ছেও।
এরপর, সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে কলকাতায় ফিরেও এসেছেন দুম করে। বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। ঠিক করেছেন লিখেই জীবন কাটাবেন। সেও এক বিপুল সাহসী সিদ্ধান্ত। তিনি তখন বাংলার পাঠকদের কাছে পরিচিত নাম। তাঁর বইয়ের বিক্রিও মন্দ নয়। কিন্তু, তা বলে লিখেই জীবিকা-নির্বাহ তো খুবই কঠিন! কিন্তু প্রবোধকুমার তো এমনই। টানা লিখে যেতেন। দিন-রাতে নানা জায়গা থেকে প্রকাশকরা এসে নিয়ে যেতেন সেই লেখা। তাঁকে দেখেই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন প্রিয় বন্ধু বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
লেখা শেষ হলেই প্রবোধকুমার চলে যেতেন পাহাড়ে। যাযাবর জিন তাঁকে বারবার টানত। সেই ক’দিনের জন্য লেখালিখি-সংসার সব লুপ্ত। প্রবোধকুমার খুঁজে বেড়াতেন এক অন্য শিকড়। সেই ঘোরাঘুরি, মানুষ, ঘটনা, গল্পরাই তাঁর লেখাকে প্রাণ দিত। সেই লেখায় মুগ্ধ হয়েছিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথও। শান্তিনিকেতন থেকে ডাকও এসেছিল। প্রবোধকুমার সাক্ষাৎ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। তাঁর লেখার গুণমুগ্ধ পাঠক ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো মানুষরাও। আরো কত বিখ্যাত মানুষ যে তাঁর ভক্ত, প্রিয়পাত্র ছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রে তখন প্রবোধকুমারের লেখার খুব চাহিদা। ঢাকুরিয়ার বাড়িতে প্রায়ই আসতেন উত্তমকুমার। শিশিরকুমার ভাদুড়ীর সঙ্গেও গভীর সখ্য ছিল তাঁর।
এতকিছুর মধ্যেও মানুষটা আদতে যাযাবর। মানস সরোবরে গিয়ে ভয়ঙ্কর তুষারঝড়ের কবলে পড়েছেন। পঁচাত্তর ছুঁইছুঁই বয়সে গেছেন উত্তরমেরু। বাংলা সাহিত্যকে পাহাড়ের নেশায় জড়িয়ে দিয়েছেন তিনিই। ঘোরার নেশাই তাঁর লেখার মূল উৎস। অথচ, ৭৪ বছর বয়সে ঘুরতে গিয়েই চোট পেলেন ডান হাতের আঙুলে। নিজের হাতে লেখা বন্ধ হয়ে গেল তারপর। ৭৮ বছর বয়সে চিরতরে মহাপ্রস্থানের পথে হাটা দেওয়ার আগে অবধি আর কলম ছুঁতে পারেননি তিনি।
কত যে অদ্ভুত ঘটনা এই রঙিন মানুষটার জীবনে। একবার নাকি প্ল্যানচেটে ডেকেছিলেন রবীন্দ্রনাথের আত্মাকে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা খুব ভাল আবৃত্তি করতেন প্রবোধকুমার। রবীন্দ্রনাথের আত্মা নাকি তাঁর মুখে একটি কবিতা শুনতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে থুড়ি তাঁর বিদেহী আত্মাকে ‘কঙ্কাল’ কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন প্রবোধকুমার। এই ঘটনা বিশ্বাস না করলেও কিচ্ছু যায় আসে না। প্রবোধকুমার এমনই। ব্যখ্যার অতীত এক মানুষ। কখনো উৎকেন্দ্রিক, কখনো মগ্ন, জীবনদৃষ্টিতে অন্তর্ভেদী। বাংলা সাহিত্যের পৃথিবীটায় তিনি এসে পড়েছিলেন কোনো একভাবে। সেই পৃথিবীতে বাসা বেঁধেছেন। ছিটকে বেরিওয়েছেন বারবার। এই আসা-যাওয়ার মাঝে বাংলা সাহিত্যের আটপৌরে সীমানাটাকেও একটানে যে কতখানি বাড়িয়ে দিয়ে গেছেন তিনি।
প্রচ্ছদের ছবি: 'প্রবোধকুমার সান্যাল, শতবার্ষিকী সংকলন' গ্রন্থ থেকে।
