মৃণাল সেনের ছবি : সময়ের গতি, ছন্দ আর আমাদের কথা

‘চালচিত্র’ যেন ন্যারো লেন্স আর ‘কলকাতা ৭১’ যেন ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ক্যামেরায় ধরা সময়ের দলিল

যিনি বলেছিলেন, “নিজের সম্পর্কে একটি বিবৃতিকরণে এটাই আমি জানাতে চাই যে, সারাটা জীবন, একেবারে এই মুহূর্ত পর্যন্ত, আমি থেকেছি তাৎক্ষণিক বর্তমানে” — সেই মৃণাল সেনের নামের ওপর এ বছর এসে পড়েছে একশো বছরের আলো। ‘একশো’ – কথাটা শুনতে যেন সহজ, কিন্তু সৃষ্টির সমকালীনতা ও স্মৃতির আবহে ‘ঠিক ততটা সহজ নয়’। এ গদ্য লিখতে শুরু করেছি, ধরুন কোনো এক প্রাক-শরৎ ভাদ্রের দুপুরে। হাওয়া, মেঘ, আর ভালোবাসার থেকে দূরে এক প্রায়-নিষ্প্রাণ জীবনকে ধরে থাকা এই দুপুরগুলো। শীতের দুপুরের মতন তাতে নরম রোদ্দুর নেই, গায়ে-জড়ানো আদরের শাল নেই, অথবা কমলালেবুর খোসা। আবার গরমের দুপুরও নয় – কষ্টের উজ্জ্বল খনির মতন – তাতে আচার দেওয়া নেই, শীতলপাটি নেই, বরফের জল বা পুরোনো খসখসও নেই। মৃণাল সেনের সিনেমাকে ঠিক এই ভাদ্রের দুপুরের মতন করে দেখি।

“জ্যোৎস্নায় পাগল চলার রাস্তা / আর আমাদের কথা”

এই লেখায় যে দুটি সিনেমাকে ঘিরে ভাবনা বিস্তার করছি, সে দুটির মধ্যে চালচিত্র-কে (Chaalchitra Mrinal Sen) মনে হয় এক ন্যারো লেন্সের মধ্যে দিয়ে দেখা দৈনন্দিন দলিল আর কলকাতা ৭১ (Calcutta 71 Mrinal Sen) যেন ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ক্যামেরায় ধরা সময়ের দলিল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “সৃষ্টিতে যতক্ষণ দ্বিধা থাকে ততক্ষণ সুন্দর দেখা যায় না, সামঞ্জস্য যখন সম্পূর্ণ হয় তখনই সুন্দরের আবির্ভাব।” – অথচ বারবার মনে হয় এই সামঞ্জস্যপূর্ণ সুন্দর প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে মৃণাল সেনের রাজনৈতিক পর্যায়ের ছবিতে। তাঁর সিনেমায় আগুনঝরা এক সময়ের পরিধি জুড়ে কিছু চরিত্র দাঁড়িয়ে থাকে। তারা আমাদেরই মতন ‘ভালো-মানুষ’। তারা আমাদেরই মতন বই পড়ে, গান শোনে, পাড়ার মোড়ে চা খায়, দরকারে ট্যাক্সি ডাকে, লেখাপড়া জানে, চাকরি খোঁজে আর জন্মের অথবা ভবিতব্যের ব্যর্থতা ঢাকতে সক্ষম হয় (অথবা প্রায়শই হয় না)। অনেকখানি দূরাশা নিয়ে মানুষ কী করে? এই প্রশ্নের উত্তরে চালচিত্রের দিকে তাকাই। মনে হয় —

“আমাদের সেইসব কথা/ স’রে গিয়ে ক্রমে স’রে গিয়ে/ মাঝখানে মরা জমি ছাই/ হাওয়ার ধু-ধু ফাঁকা পথ।”

লেখার জন্যে বড়ো পত্রিকার কলামে জায়গা খুঁজতে আসা যুবকের চোখ দিয়ে আমরা দেখি এক চৌখস দণ্ডমুণ্ডের কর্তাকে। হালকা করে ‘The Possible Dream’ বইটা উঁকি দেয় বড়োবাবুর (উৎপল দত্তর) হাতে। দেখি মালিকের হাতে দূরাশা নয়, বরং এক ভরসার নাম ‘The Possible Dream’! পশ্চিমে এই বইটি লেখা হয়েছিল Amway সংস্থার প্রতিষ্ঠাতাদের নিয়ে। ‘Amway – making profit and helping others reaching their own goal’ – ঘরে-ঘরে খুচরো রোজগারের এক মেকি স্বর্গ তৈরি করার পথিকৃৎ বলা যায় যাঁদের। সিনেমার দৃশ্যে বইয়ের নামটা জ্বলতে থাকে এমন দুই চরিত্রের মুখের মাঝখানে যাদের মধ্যে একজন আপাত-ভিখিরি, আর অন্যজন এক মস্ত মালিকপক্ষ – একজনের কলমের একটা খোঁচায় অন্যজনের স্বপ্নপূরণ হতে পারে। কী এই স্বপ্ন? একটু সম্মান, আগের থেকে আরেকটু বেশি টাকা, আরেকটু বেশি স্বাচ্ছন্দ্য, সামান্য একটা স্যুট, আরেকটু ভালো জামাকাপড়, গাড়ি-বাড়ি এবং সেই থেকেই আরেকটু বেশি সম্মান।

মৃণাল সেনের সিনেমায় আগুনঝরা এক সময়ের পরিধি জুড়ে কিছু চরিত্র দাঁড়িয়ে থাকে। তারা আমাদেরই মতন ‘ভালো-মানুষ’। তারা আমাদেরই মতন বই পড়ে, গান শোনে, পাড়ার মোড়ে চা খায়, দরকারে ট্যাক্সি ডাকে, লেখাপড়া জানে, চাকরি খোঁজে আর জন্মের অথবা ভবিতব্যের ব্যর্থতা ঢাকতে সক্ষম হয় (অথবা প্রায়শই হয় না)।

গল্পটা শুরু হয়েছে সেই আলেকজান্ডার দুমার আমল থেকে। যমজ রাজা আর রাজবন্দি – লোহার মুখোশ আর রাজপোশাক – সরিয়ে নিলে কে বা রাজা কে বা রাজা নয় – মানবিক বিশ্বাস ও আনুগত্য পালটে যায়। হুবহু যমজ দুটো মানুষ স্রেফ মুকুটটুকুর অভাবে রাজা থেকে বদলে যাচ্ছে রাজবন্দিতে এবং উল্টোটাও। চালচিত্রের প্রথম মিনিট পাঁচেক আমাদের চোখের সামনে সমাজের ঠিক এমনই একটা ‘স্ট্রিপটিজ’ তুলে ধরে। চোখের সামনে একটি লোক এক চলমান ট্যাক্সি থেকে একটা বিচ্ছিরি বাড়িতে ঢুকে যায়। তাকে সাহায্যকারী মানুষটা আপাত-উচ্চবিত্ত – স্যুট-কোট-প্যান্ট ছেড়ে ফেলে হঠাৎ করে সাধারণ হয়ে যায়। আসলে হঠাৎ গরিব হয়ে যায়। আশ্চর্য অস্বস্তি তৈরি হয় ঘরে – চোখে-চোখ পড়ে দুজনের – সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হতে পারার ঠিক এক মুহূর্ত আগেই। চোখ সরে যায় কলকাতা ৭১-এর কোর্টরুমে। উৎপল দত্ত, আত্মবিশ্বাসী শ্লেষের হাসিমাখা এক উকিল। ‘এই বিবস্ত্র সমস্যা’ – উকিলের অশ্লীল প্রশ্নবাণ। চলচ্চিত্র বারবার চাইছে আমাদের ভাবনাকে নগ্নায়িত করতে, সমাজের সভ্যবেশ অশ্লীলতাগুলোকে বিবস্ত্র করতে। বোঝাতে চাইছে ওই আদালতের, ওই জাজমেন্টাল সমাজের প্রত্যেকেই আসলে নগ্ন।

তবু এ কাহিনির একেবারে শেষে গিয়ে দেখি এক ‘সম্ভাব্য’ স্বপ্নপূরণ। অন্য প্রতিবেশীদের থেকে একটা-দুটো সিঁড়ি উঠে এসে অনেকগুলো কালো ধোঁয়ার চিমনির ভেতর অল্প একটু স্বাচ্ছন্দ্যের স্বপ্ন। তরুণ লিখিয়ের বাড়িতে গ্যাস এলো। স্বাভাবিকভাবেই তার মূল্যবোধ ঠেকে হাজার প্রশ্ন এসে পড়ে। প্রতিবেশ ও কমিউনিটি তাহলে ঠিক কী এবং কতখানি? কতখানি সংলগ্ন হলে সত্যিই সংলগ্ন হওয়া যায়? ক্লাস সলিডারিটি? সে কি ওই এক উঠোনের চারপাশের ক’টা ঘর, বা ওই বাড়ির আশেপাশের আরো কয়েকটা বাড়ি, নাকি গোটা একটা শহর যারা হয়তো কোনো একদিন এই বাড়তি স্বাচ্ছন্দ্যটুকু পাবে অথবা পাবে না? তবু এই সমস্ত চিন্তাজাল কাটিয়ে, সাম্য-চিন্তা কাটিয়ে এমন একটি ছেলের বাড়িতেও গ্যাস এলো। সিনেমার শুরুতে যে কয়লার উনুন আর শ্বাসের কষ্টকে আমরা স্বাভাবিক ধরে নিয়েছিলাম ‘এইসব বাড়িতে’, সেই বাড়িতেই নেমে আসছে ‘দ্য পসিবল ড্রিম’। তবু দেখি, মনে মনে প্রতিবেশীর অভাব ও কষ্টের প্রতি এই একটু ভাবনা, একটু হাত বাড়িয়ে থাকার নামই মধ্যবিত্ততা। অথবা একেবারে অসুন্দরের মধ্যে অকারণ এক সুন্দরকে দেখতে পাওয়ার নামও হয়তো সেই একই। 

আবার সেই সৌন্দর্য আর সামঞ্জস্যের কথায় ‘নিরাবরণ’ ও ‘নিরাভরণ’ শব্দদুটোকে এহাতে-ওহাতে নিয়ে চলচ্চিত্রের কাছে আসি। নিরাভরণ ‘প্রেক্ষাপট’ আর নিরাবরণ ‘সত্য’, এই দুইয়ের অস্বস্তিকর সামঞ্জস্য নিয়ে যে সিনেমা হাঁটাহাঁটি করে, দেখি সেই সৃষ্টিও যেন ঠিক পুরোপুরি সাজবিহীন নয়। কোনো বনবাসী মেয়ের কানের ফুলের গয়নার মতন তাতে লেগে আছে চলচ্চিত্রের সহজাত ছাপ-ছোপ। যেমন স্বপ্নদৃশ্য – অনেকখানি ধোঁয়া, নারী আর সমস্ত স্বপ্নে লেগে আছে পুঁজিবাদী মালিকপক্ষের কাল্পনিক উদ্বেগ। যেমন কুচো কাগজের মতন হালকা কিছু বিপর্যয় উড়ে বেড়ায় সিনেমা জুড়ে। আর এই স্বপ্ন বা ক্রনিকল বা ইতিহাসই বারবার দেখিয়ে দেয় পৃথিবীতে একটিমাত্র জিনিস সম্ভবত স্থির, অপরিবর্তনশীল আর তা হলো আর্থিক শ্রেণি-বৈষম্য। এবং এমন ধ্রুব বৈষম্যই যদি একটি ইজম বা মতবাদেরও ভিত হয়, তবে তাকে টলানো সময়েরও দু:সাধ্য। তবু এই যে আমরা কেউ-কেউ আধো-দারিদ্র্যের সামনে দাঁড়িয়েও ‘রানু ও ভানু’-র মতন বই লিখছি না, এই যে আমরা কাগজে কলাম লিখছি না কোনো মহিলা চিত্রতারকার ‘পেটের দাগ আর পিঠের লোম’ নিয়ে, হয়তো এটাই আমাদের রাজার মতন মধ্যবিত্ততা, আমাদের ‘সবাই রাজার’ রাজত্বটুকু আরো একটু বাঁচিয়ে রাখছে। মধ্যবিত্তের ভাবনার দৈন্য নিয়ে আমরা যত গলা ফাটাই, আমাদের সযত্নলালিত সমাজের মধ্যবর্তী কাঠামোর এই অক্ষম অথচ নির্লোভ দিকটা নিয়ে হয়তো ঠিক ততটা নয়।

এখন এই ব্যক্তিগত বাড়ির কাগজভরা ময়লা উঠোন থেকেই আমরা তাকাবো বড়ো ক্যানভাসটার দিকে – কলকাতা ৭১ – যেখানে সমাজ এবং ব্যক্তি প্রায় পর্দাবিহীনভাবে পর্দায় নেমে এসেছে। মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র-ভাবনার অন্যতম ধ্রুবতারা জ্যঁ-লুক গোদার একটি আলোচনায় স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, আমাদের আশেপাশে এমন অনেক আখ্যান বা সিনেমা তৈরি হয় যা একটা বিরাট গল্পকে বড়ো করে বলতে চায়; কিন্তু তেমন ভালো সিনেমা খুব কমই তৈরি হয় যা কোনো বিরাট ইতিহাসকে একটি ছোট্ট অংশ দিয়ে সম্পূর্ণ দক্ষতায় দেখাতে পারে। এই বিচারে মৃণাল সেনের সিনেমায় তাকালে দেখি, নিত্যদিনের কথোপকথন থেকে শুরু করে রাজপথের এক দীর্ঘ মিছিল এসে মিলেছে এক বিন্দুতে। সেই অর্থে যতটাই সমকালীন, ততটাই ইতিহাসমুখী তাঁর সিনেমা। রাজনৈতিক পর্যায়ে সিনেমার বিভিন্ন শট এবং ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভের ব্যাকরণ ভাঙার আদর্শ ছাড়াও তাই মৃণাল সেনকে আমরা কারিগরী দিকটির বাইরে আদতে একজন ‘ক্রনিকলার’ এর মতন করেই পাই। একজন দাস্তানগো, যিনি বলতে চাইছেন জাতির ইতিহাস, বিপ্লবের ইতিহাস এবং এই ইতিহাসের মধ্যে থেকে উঠে আসছে সাধারণ একটি ছেলে, একজন মা, অথবা তার দুটি মেয়ে বা দুটি বোনের গল্প, নষ্ট হয়ে যাওয়া শৈশব কৈশোর এবং যৌবনের গল্প – প্রৌঢ়ত্বের অসম্মানের গল্প এবং আপোশের গল্প।

মৃণাল সেনের সিনেমায় তাকালে দেখি, নিত্যদিনের কথোপকথন থেকে শুরু করে রাজপথের এক দীর্ঘ মিছিল এসে মিলেছে এক বিন্দুতে। সেই অর্থে যতটাই সমকালীন, ততটাই ইতিহাসমুখী তাঁর সিনেমা।

সমাজতত্ত্বে ডেল্যুজের থিওরি অভিজ্ঞতার ‘মাল্টিপ্লিসিটিতে’ জোর দিয়েছে। খোঁজ করেছে আমরা কীভাবে সামাজিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঞ্জাত হই। কীভাবে আমরা শৃঙ্খলা এবং একরৈখিক কার্য-কারণ সম্পর্ক খোঁজার ইচ্ছাকে অতিক্রম করে সামাজিক ঘটনাকে বুঝতে চেষ্টা করতে পারি, তেমনই কলকাতা ৭১ ছবিটিও এগোয় এইভাবেই। আধুনিক কাল থেকে সময়ের পিছন দিকে হাঁটে, অধ্যায় থেকে অধ্যায়ে যায়। একই দশক এবং একই ঘটনা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিশেষে আলাদা অভিজ্ঞতা তৈরি করে। সেই দিকে দৃষ্টি রাখতে রাখতে দেখি ’৭১, ’৩৩, ’৪৩, ’৫৩, ’৭১ – দশক পিছোয় অথবা এগোয়, সময় পিছোয় এবং এগোয় – হাইপারলিংক ধরে রাখে পর্বে পর্বে। ইতিহাসের এই পর্যায়ক্রমিক ধারার কথায় গোদার তাঁর আশির দশকের একটি সিনেমায়, নায়িকার ডিসল্ভ করে আসা মুখের পাশে কথা বসাচ্ছেন, “It is not about the time or era, it is about the tempo”। কাজেই একের পর এক দশক পেরিয়ে আসা মৃণাল সেনের কলকাতা ৭১ সিনেমাটিকে মূলগতভাবে সময়ের ধারা-বিবরণীর এবং টাইমট্রাভেলের নজরে দেখলেও, আমরা বুঝতে চাই কিন্তু কলকাতা ৭১ আদতে ধরে রাখে ঘটনাপ্রবাহের সেই ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা যা স্বভাবগতভাবে জটিল এবং কখনই একরৈখিক নয়।

’৭১

কলকাতা, একটা শহর। রঞ্জিত মল্লিক, যাঁর নাম তিনি জানান রঞ্জিত মল্লিক। তার ছদ্মবেশে আদালতে দাঁড়িয়ে আছে সময়। ধোপদুরস্ত জামাকাপড়ের অভাবে আর খাস শহরের বুকে বাঙালির মতন পোশাক-আশাক পরার দোষে এই দশক অভিযুক্ত। আমরা লক্ষ্য করবো, বাঙালি পোশাক পরা বিশ্বজনীনতার পরিবর্তে বিদেশি পোশাক পরা কূপমণ্ডুক বাঙালিয়ানার এই সূচনা। এই ‘আপডেটেড’ বাঙালিয়ানার শুরুতেই শিক্ষিত বেকার বাড়তে থাকার সমসাময়িক দশকটাকে পরিচালক দাঁড় করিয়েছেন আদালতে আমাদের মুখোমুখি। হালকা প্রহসনের মধ্যে আমরা শুনতে পাই বাঙালির নয়, বরং বাঙালিয়ানার পায়ের তলা থেকে জমি সরে যাওয়ার শব্দ। দেখি, অশ্লীল আদালত কক্ষ এবং উকিলের অশ্লীলতর হেসে ওঠা। আর ভরা সভায় দেখি কাঠগড়ায় রঞ্জিতের এক সাররিয়েল ড্রিম। চালচিত্রের কথা আবার মনে পড়বে কারণ আবারও স্বপ্নদৃশ্যে শাসকশ্রেণির উদ্বেগ! ঠিক যেভাবে রাজনীতিতে চিরকাল সংখ্যাগরিষ্ঠের বিপন্নতাকে চাষ করা হয় তেমনই এই শাসকের একজোট হওয়া, শাসকের ক্লাস-সলিডারিটি। ম্যানিফেস্টোর হাস্যকর বিদ্রূপাত্মক বদল। হাস্যকর আদালতে এক পোশাকহীন পুতুল – ‘আবার বিবস্ত্র নয় তো?’ প্রশ্নের ভেতরে রাখা এক ‘বিবস্ত্র সমস্যা’।

এরপর থেকেই আমরা স্বভাবতই ধরে নিতে পারি যে প্রতিটি পূর্ববর্তী দশকে জীবনের গতি ছিল শ্লথতর। বিশেষত তিনটি দশকে উঠে আসা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী বনাম পরবর্তী পৃথিবীর সামাজিক গতির আপেক্ষিকতা জটিল হলেও স্পষ্ট।

’৩৩

আচমকা ধীর হয়ে আসা জীবন, “Language is the house that Man lives in…” – প্রায় ভেঙে পড়ে আসা বাড়ি, ভেঙে আসা কথা, মায়ামমতার ছিঁটে-ফোঁটা নেই। আশ্চর্য এক ‘ভেঞ্জফুল ফ্যামিলি ডায়নামিক্স’, যা ধরে রাখছে চারজনের পরিবারে ‘দুই ছেলে-মেয়ের বাপের’ কষ্টের রোজগার ও একাধিপত্য। বৃষ্টিতে ভিজে ভেসে-যাওয়া এক রাত্রে, যখন আরো একটু বেঁধে-বেঁধে থাকতে ইচ্ছে হয়, তখন আমরা শুনছি ভাষার মমত্বহীন এক উপস্থিতি। একটা ভেজা কুকুরের ডাক, মার-খাওয়া, তাও করুণ। এক মেয়ে, তার নিষ্করুণ স্নেহহীন বড়ো হয়ে ওঠা – যে অনায়াসে সমান্তরাল আরেকটি পরিবারে (পথের পাঁচালী’র) দুর্গার মতন মারা যেতে পারে অথবা বেঁচে যেতে পারে দুই দশক পরের মিনুর মতন।

’৪৩

মেয়েদের সংসার। এককালীন সম্মান ধুলোয় মিশেছে। পরিবার শুধু ভাঙছেই না, পুরুষবিহীন এক পরিবার এবার দেখছি আমরা। এখানে মেয়েরা রোজগার করে। না, সম্মানে নয়, বাধ্য হয়ে, প্রায় সম্মান হারিয়ে। মিনুর শরীর নরম পণ্য হয়ে ওঠে কৈশোর পেরোতেই। মাছ আসে হিসেব করে, তবু আসে। আপেক্ষিক আব্রুটুকু আর পেটের ভাতটুকুই বজায় থাকে।

এই দশকের ভাঁজগুলির মধ্যেই দেখতে পাই মেয়েদের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার ধাপগুলো। ’৩৩-এর সংসার আগলে রাখা বর্ষায় ছাদ ভেঙে পড়া রাত্রির সম্পূর্ণ অসহায় মা – ’৪৩-এ এক অন্য মাতৃরূপে, যে মাকে মেয়েদের শরীর বেচতে পাঠাতে হয়। প্রথমে গ্রাম্য পথ, কৃষি, ক্ষেতে-খামার – সহজাত। তারপর নাগরিক জীবনের অন্য দারিদ্র – বাধ্যবাধকতা, ঝুঁকি, অসম্মান ও রূপোপজীবিকা। এই দশকগুলির পরে ধীরে ধীরে সম্মানে, শিক্ষায়, ‘সত্যিকারের চাকরি’র দিকে মেয়েরা স্থান পাবে আমরা জানি।

’৫৩

চরম দুর্দশা থেকে সরে এসে ধীরে ধীরে ভাষা আর গতি পাচ্ছে দারিদ্র্য। নিজেরাই আইনি-‘বেআইনি’ পথে চাল বেচে দু’মুঠো জুটিয়ে নিচ্ছে বাপহারা মা-ছেলের সংসার। ’৩৩, ’৪৩-এর এক ছাদের তলায় থাকতে থাকতে ’৫৩-তে দেখি সন্তানকে প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও কাজে পাঠিয়ে ভেতরে-ভেতরে ভয় জড়িয়ে বাঁচছে গৌরাঙ্গর মা। পরিবারতন্ত্র বদলাচ্ছে। বেশিরভাগ পরিবার এখন ছেঁড়া কাপড়ের মতন এদিক-ওদিক থেকে ঝুলে আছে – যেমন ঝুলে আছে ট্রেনের হাতল ধরে ওই ছেলের দল। একটা পিষে যাওয়া ক্লাস চেষ্টা করছে আধুনিক যানবাহনকে ব্যবহার করে জীবিকা অর্জন করতে। জীবনে ঢুকে পড়ছে গতি। শান্ত জলায় সাপ, মেয়েকে জড়িয়ে ধরা মা। গ্রাম থেকে শহরের দিকে সরে যাওয়ার গতি। ট্রেন ট্রেন ট্রেন… আর চাল-বেচা ছেলেটা। এই গতি থেকে ট্রেন থেকে হাত ছেড়ে যায় আচমকা। জীবন থেকে খসে পড়া আর জীবনে থেকে যাওয়ার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। মায়ের চিৎকার ‘গৌরাঙ্গ রে’ – পাশে অন্য বাচ্চাটা ঘুমন্ত। একটা ট্রেনের অথবা আলোর চাকা জ্বলছে আর অন্যটা নিভছে পর্যায় ক্রমে, এসে যাচ্ছে পরের দশক…

আবার ফিরে আসে ’৭১

দীর্ঘ প্রায় দু’দশকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পালাবদল। পার্টি, আনন্দসন্ধ্যা। তার মধ্যেই অসম্ভব বিতৃষ্ণ মুখের এক বয়স্ক মহিলা। অভিজ্ঞতার তারতম্য। ‘মুড অফ দ্য নাইট’ হাতে ধরে রয়েছেন জনদরদের ছদ্মবেশ পরা বড়োলোক সমাজের প্রতিভূ। যুদ্ধের বাজারে কেউ কেউ যারা অতি-দরিদ্র থেকে অতি-ধনী হয়ে উঠছেন। প্রভাবশালী মিথ্যেবাদীর পাশে চুপটি করে আছে সত্যি জেনে ফেলা নিরীহ মধ্যবিত্ত।

আবর্তনে সময়ের গতিতে ফিরে আসছে আবার সেই মুখোশ, পোশাক আর বাহ্যিক পালিশ। যেটুকু যা থেকে যায়, তা “স্পর্শ থেকে স'রে গেলে / শুধু রক্তে পাওয়া/ নয়তো আগুনের চরাচরে।” 

মনে পড়ে, বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধ-পরবর্তী সত্তর দশকের আমেরিকায় দেখা গেছিল কিছু বহুজাতিক সংস্থা তাদের কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে দেয়। ফলে একটা শ্রেণির দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ আরো একটু ক্রয়ক্ষমতা অনুভব করতে পারে। অর্থাৎ চুষে-খাওয়া মালিকপক্ষের বদলে আসছে এমন এক মালিক পক্ষ যারা অর্থনৈতিক অধীনতা তৈরি করতে পারে কনজিউমার তৈরি করার মধ্যে দিয়ে। অর্থনীতিবিদরা একই ধারার আরেকটি সমকালীন বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে আধুনিক যুগের বাণিজ্যিক দৈত্য অ্যামাজন যদি তার লক্ষাধিক কর্মচারীকে দারিদ্র্যের বদলে সামান্য বেশি ক্রয়ক্ষমতা দিতে পারে, তাহলে তারাও একার্থে লক্ষাধিক ক্রেতা পেয়ে যায় । এই হত-দারিদ্র্য থেকে ক্রয়ক্ষমতার দিকে ঘুরে যাওয়ার দশকগুলোই আসলে আশ্চর্যভাবে উঠে এসেছে মৃণাল সেনের সিনেমায়।

এই চলন আপেক্ষিকভাবে সময়ের হাত ধরে পিছিয়ে গেলেও, তা ‘সাময়িক’ নয়। এই সিনেমা জুড়ে দর্শকাসনে বসে আমাদের যাত্রা চলে একটা ভাষাগোষ্ঠীর, একটি জনজাতির, একটি রাজ্য বা একটি শহরের স্নায়ু ধরে। কাজেই একটি বিশেষ শহরে মাইক্রোস্কোপ ফেললেও এই স্পেস আসলে আন্তর্জাতিক। এক্ষেত্রে মৃণাল সেনের সামগ্রিক চলচ্চিত্রভাবনা এবং কলকাতা ৭১ ছবিটির মধ্যে এক সমান্তরাল রেখা টানা যায় সহজেই। আমরা দেখি এই দশকগুলোর ভেতরের অপেক্ষিক গতি নির্ধারণ করে চলচ্চিত্রের নিজের গতিকেও। আমরা টের পাই যে সিনেমাতে এবং সিনেমার ভেতরের বিষয়বস্তুতে কিছু বিশেষ গতিচিহ্ন আছে, ‘পেস’ এবং ‘পালসের’ মতন। অর্থাৎ আমরা অনুভব করি ‘পেস অফ দ্য সিনেমা’ এবং বুঝতে পারি আরেকটি ‘পেস, উইদিন দ্য কনটেন্ট অফ দ্য সিনেমা’।

গোদারের কথাটা আবারও মনে পড়ে, ‘ইট ইজ নট আবাউট দ্য টাইম অর এরা, ইট ইজ অল আবাউট দ্য টেম্পো’। আলাদা দশক শতক এবং যুগ আমাদের আলাদা সময়চিহ্ন দিয়ে যায়। কিন্তু সময়ের ছন্দ ও গতি বদলে যায় আমূল। সত্যি হয়ে ওঠে বিলাসবিহীন শান্ত জীবন থেকে আড়ম্বরের দিকে যাওয়া; ভাষা ও পোশাকে পোস্ট-কলোনিয়াল দাসত্ব এবং প্রতিটি দশকের তার আগের দশকের মানুষগুলোর স্রেফ বাতিল হয়ে যাওয়ার গল্প। ‘লক্ষফুলের ফুটে ওঠা আর আমাদের কথা’ থেকে শুরু করে শেষের খোঁজ করতে করতে হারিয়ে যাওয়ার এই গল্পগুলো মৃণাল সেনের শতবর্ষ পেরিয়েও সমকালীন এবং চিরকালীন হয়ে থাকুক।

___
কবিতার উদ্ধৃতি: ‘আমাদের কথা’, অরুণ মিত্র; কাব্যগ্রন্থ: খুঁজতে খুঁজতে এত দূর

Developed by DXDasia