
বেরঙিন হচ্ছে শৈশব?
তালপাতার পাখার হাওয়া, ঠাকুমা-দিদিমার মুখে রূপকথার গপ্পো, ভরা বর্ষায় ফুটবল, মোজা ভর্তি চোরকাঁটা, গরমের ছুটিতে মামাবাড়ি যাওয়া, কারেন্ট নুন, পুজোর জামা গোনা, ফুটকড়াই, ঝাল লজেন্স, আমসত্ত্ব, মোম রঙে আঁকা বাদামি পাহাড়-লাল সূর্য-নীল নদীতে মিশে থাকা শৈশব আস্তে আস্তে হারিয়ে গিয়েছে। আমের আঁটি আছে বটে কিন্তু তা দিয়ে ভেঁপু বানানো ও বাজানো, দুয়ের আনন্দই উধাও। হাতের ব্যাট, পায়ের বলটা কেড়ে নিয়ে পিঠে পেল্লায় ব্যাগ আর মগজে প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন বাবা-মায়েরা। শিশু মনে কেবলই ইচ্ছেপূরণের চাপ। রোদ পড়ে আসা বিকেলে যে মাঠ ভর্তি থাকত কচিকাঁচাদের ভিড়ে, সেই মাঠ এখন বার্ধক্যের বারাণসীতে পরিণত হয়েছে। লেখাপড়া, আঁকা, ক্যারাটে, যোগা ক্লাসের ফাঁসে বন্দি ছেলেবেলা। এই বন্দিদশার ফাঁস গত এক দশকে আরও চেপে বসেছে। রথযাত্রা (Rath Yatra 2025), নিছক ঈশ্বর ও ভক্তির এক উৎসব জুড়ে ছিল ছেলেবেলা। সেখানেও একই প্রবণতা। শিশু-কিশোরেরা দূরে চলে যাচ্ছে রথ থেকে…।

দুর্গাপুজো ছাড়া যদি কোনও পার্বণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে বাঙালির ছোটোবেলা জড়িয়ে থাকে, তা হলে সেটি হল রথ। ছোটো ছোটো দোতলা, তিনতলা রথে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার পুতুল চাপিয়ে, গুজিয়ার থালা রেখে রথ টেনে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে ছিল অনাবিল আনন্দ।
আট-নয়ের দশক, নিদেন পক্ষে শূন্য দশকের ছেলেমেয়েরা আজও রথের উন্মাদনা মনে করতে পারেন নিশ্চয়ই। বর্ষার সবচেয়ে বড়ো উৎসব রথের স্মৃতি সকলের মনেই কমবেশি উজ্জ্বল। কথায় বলে, রথ টানলে দুগ্গা আসে। দুর্গাপুজো ছাড়া যদি কোনও পার্বণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে বাঙালির ছোটোবেলা জড়িয়ে থাকে, তা হলে সেটি হল রথ। ছোটো ছোটো দোতলা, তিনতলা রথে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার পুতুল চাপিয়ে, গুজিয়ার থালা রেখে রথ টেনে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে ছিল অনাবিল আনন্দ। একা একা সদা-গাড়ি ছুটে চলা ব্যস্ত রাস্তায় যাওয়ার লাইসেন্স মিলত এই একটিমাত্র দিনে।
প্রসাদ খেয়ে বড়োরা দিতেন টাকা। কিছুক্ষণের জন্যে হলেও নিজেদের রাজা মনে হত। গরমের ছুটি মিটিয়ে স্কুল খুললেই শুরু হত রথের দিন গোনা। কেমন করে সাজানো হবে রথ, পরিকল্পনা চলত। তারপর এক রবিবার রথ নামিয়ে ধুলো ঝেরে পরিষ্কার করা হত। রঙিন কাগজ, অভ্র, চুমকি, শোলার বল, পাতাবাহার গাছের পাতা, হরেক রঙের ফুলে সেজে উঠত রথ। এ যেন চোখের সামনে স্বপ্নপূরণ!
ধূপ-ধুনোর গন্ধ, কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজ আর রঙিন রঙিন রথের দড়ি ধরা ছোটো ছোটো হাত, রথের দিনের দৃশ্যকল্প আঁকত। এ ছবি আজ অনেকটাই ম্লান। রথ টেনে ছোটোবেলা কাটানো খুদেরা আজ বা-মা হওয়ার পর নিজেদের সন্তানকে আর রথ টেনে সময় নষ্ট করতে দিতে চান না। ছুটে চলাই জীবনের মন্ত্র। তাই রথের বিকেলে আর রশি নয়, সঙ্গী হয়েছে চার দেওয়াল-বইপত্র-পড়ার টেবিল-কম্পিউটার। এই নয়া প্রবণতার জেরে ধাক্কা খাচ্ছে রথের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা অর্থনীতি। রথের রশিতে টান পড়লে যাঁদের পেটে টান পড়ে না, তাঁরা কী বলছেন?

পেশায় রথ বিক্রেতা রাজু চ্যাটার্জী বুধবার থেকে রথ সাজিয়ে বসেছেন একটি দশকর্মার দোকানের সামনে। প্লাইউড দিয়ে তৈরি রথ পাইকারি কিনে এনে তিনি বিক্রি করছেন। ফি বছর রথযাত্রার আগে তিনি রথ বিক্রি করে উপার্জন করেন। আকার অনুযায়ী আলাদা আলাদা, তিনশো থেকে পাঁচশো টাকা দরের রথ বিক্রি করছেন রাজু। বিক্রির অবস্থা সম্পর্কে তিনি বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন, ‘‘বাজার একেবারে খারাপ। এই বছর এত খারাপ যে বলে বোঝাতে পারবো না। একেবারেই বিক্রি নেই। করোনার পর থেকে সব ব্যবসাই কমেছে। রথ বিক্রিও কমেছে। কিন্তু এবারের মতো হাল! ভাবা যায় না।’’
আর এক বিক্রেতা গৌতম দত্ত। কয়েক দশক ধরে তিনি রথ বিক্রি করছেন। তাঁর কথায়, ‘‘রথের ব্যবসার এমন খারাপ অবস্থা এইবারেই প্রথম। লাভ নেই। ধরুন একশো টাকায় রথ কিনলে, একশো, একশো পাঁচ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। বুঝে দেখুন কী দশা ব্যবসার! বিক্রি না হলে লাভ করব কী করে।’’ গৌতমবাবু জানালেন, এখন দোতলা রথের বিক্রিই বেশি। নানান আকৃতির রথ বিক্রি হয়। একতলা, দোতলা, তিন-চারতলা। এর মধ্যে দোতলা রথের দাম মাঝামাঝি হওয়ায় মধ্যবিত্ত এটিই বেশি কিনছেন। গৌতমবাবু আর এক তাৎপর্যপূর্ণ দিকের কথা জানালেন। আগে রথ কিনতে মা-বাবার হাত ধরে বাড়ির খুদে সদস্যটিও আসত। এখন বেশিরভাগ সময় বাড়ির বড়োরাই রথ কিনে নিয়ে যান। ছোটোরা আসে না। ফলে পছন্দের চেয়ে পকেট বেশি অগ্রাধিকার পায়।
আগে রথ কিনতে মা-বাবার হাত ধরে বাড়ির খুদে সদস্যটিও আসত। এখন বেশিরভাগ সময় বাড়ির বড়োরাই রথ কিনে নিয়ে যান। ছোটোরা আসে না। ফলে পছন্দের চেয়ে পকেট বেশি অগ্রাধিকার পায়।

মানুষের প্রয়োজনেই উৎসবের আয়োজন। যেকোনও উৎসব-পালা-পার্বণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থনীতি। উৎসবে সাধারণ মানুষ আনন্দ করলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে সমৃদ্ধ হয় ব্যবসা-বাণিজ্য। রথ ও রথের মেলার উপর বিপুল সংখ্যক মানুষের রুজি-রুটি নির্ভর করে। রথকে ঘিরে বিক্রি জমে উঠলে সরাসরি পুষ্ট হয় আঞ্চলিক তথা গ্রামীণ অর্থনীতি। পাঁপড়ভাজা, জিলিপি খেয়ে, কোনও বড়ো প্রতিষ্ঠানের রথের দড়ি টেনে, সোশ্যাল দেওয়ালে ডিসপ্লে পিকচার বদলে দিলে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটে বটে, কিন্তু রথযাত্রা উৎসবের আদত উদ্দেশ্য মাটি হয়। শৈশবের সুখস্মৃতি থেকে বঞ্চিত হয় কচিকাঁচার দল। মাটির পুতুল, রথ বিক্রি করা মানুষগুলো চলে যান আঁধারে। ছোটো ছোটো হাতগুলোকে বাবা-মায়েরা যত রথের দড়ি টানতে এগিয়ে দেবেন, রথ বিক্রি করা সহ নাগরিকদের পেটের টান তত কমবে।
_________________________
ছবি সৌজন্যে: টুম্পা মণ্ডল, দীপঙ্কর রাম, শৌভিক রায়
