হেরিটেজ মর্যাদার দাবিদার বিষ্ণুপুর

ইউনেস্কোর সম্ভাব্য বিশ্ব ঐতিহ্যস্থান তালিকায় রয়েছে এই শহর

টেরাকোটার শহর বিষ্ণুপুর। চারদিকে এত স্থাপত্য, যার ঐতিহাসিক এবং নান্দনিক গুরুত্ব এই শহরকে বাংলার মধ্যে অনন্য করে রেখেছে। শুধুই বা স্থাপত্য কেন, বিষ্ণুপুর ঘরানার ধ্রুপদী সংগীত, বালুচরী-স্বর্ণচরী এবং বাঙালি সংস্কৃতির আরও অনেক আশ্চর্য সম্পদ এই বিষ্ণুপুরই উপহার দিয়েছে আমাদের। ঐতিহ্যময় এই জায়গাটির ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। মল্ল রাজাদের হাত ধরে উদ্ভব হয়েছিল বিষ্ণুপুরের। তাই এক সময়ে বিষ্ণুপুর আর তার চারদিকের জায়গাকে মল্লভূম নামে ডাকা হত।  

আদিমল্ল ছিলেন মল্ল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। পদমপুরের রাজার থেকে তিনি লাউগ্রাম এবং তার চারপাশের কয়েকটি গ্রাম দখল করে নিয়েছিলেন। আদিমল্লের ছেলে জয়মল্ল পদমপুর আক্রমণ করে সেখানকার দুর্গ নিজের কবজায় এনেছিলেন। রাজ্যের সীমানা বাড়ানোর কাজ তিনি শুরু করেছিলেন এবং বিষ্ণুপুরে তিনিই রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। মল্লরাজ্যকে আরও বিস্তৃত করেছিলেন তাঁর পরবর্তী বংশধররা। তবে এই রাজবংশের সবথেকে বিখ্যাত শাসক ছিলেন হাম্বীর মল্লদেব বা বীর হাম্বীর। তাঁর ছেলে রঘুনাথ প্রথম ‘সিংহ’ উপাধি ব্যবহার করা শুরু করেছিলেন। মল্ল বংশের শেষ রাজা ছিলেন চৈতন্য সিংহ। বর্গি আক্রমণে পতন ঘটেছিল মল্ল রাজবংশের।

বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলি দেখতে পর্যটকরা হানা দেন লালমাটির এই শহরে। বীর হাম্বীরের তৈরি রাসমঞ্চ এমন এক স্থাপত্য, যার নির্মাণশৈলী সারা ভারতে অদ্বিতীয়। জোড়বাংলা মন্দিরও খুব জনপ্রিয় এখানে। ইটের তৈরি শ্যামরায়, মুরলীমোহন, জোড়বাংলা, মদনমোহন, মল্লেশ্বর মন্দির, ল্যাটেরাইট পাথরে বানানো রাধাশ্যাম, নন্দলাল, কালাচাঁদ, লালজি, মদনগোপাল, রাধামাধব, রাধাগোবিন্দ মন্দিরেও পর্যটকরা ভিড় জমান। ছিন্নমস্তার মন্দিরও ঘুরে দেখেন। প্রচুর মানুষ যান বিখ্যাত দলমাদল কামান দেখতে। 

রাষ্ট্রসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক দপ্তর ইউনেস্কো বিষ্ণুপুরকে সম্ভাব্য ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায় জায়গা দিয়েছিল। পাকাপাকিভাবে বিষ্ণুপুরকে হেরিটেজ তকমা দেওয়ার জন্য ইউনেস্কোর তরফ থেকে ১৯৯৮ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি দপ্তরকে বলা হয়েছিল পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দিতে। রিপোর্ট তৈরি করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি দপ্তর দিয়েছিল ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগকে। কিন্তু পুরাতত্ত্ব বিভাগ এখনও রিপোর্ট তৈরি করে উঠতে পারেনি। লালমাটির এই শহরের বাসিন্দারা ইউনেস্কোর বিশ্ব হেরিটেজ তালিকায় বিষ্ণুপুরের নাম পাকাপাকিভাবে তোলার জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে বারবার সওয়াল করেছেন। এবারের লোকসভা ভোটে বিষ্ণুপুরের হেরিটেজ মর্যাদা পাওয়ার দাবি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এবছরের বিশ্ব হেরিটেজ দিবসে অর্থাৎ ১৮ এপ্রিল বিষ্ণুপুরের ট্যুরিস্ট গাইডদের পক্ষ থেকে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে বক্তারা জোরদারভাবে সরব হন বিষ্ণুপুরকে হেরিটেজ তকমা দেওয়ার দাবিতে।
 

Developed by DXDasia