ভদ্রেশ্বর থেকে দিনেমারডাঙা : নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে রহস্য

একটা সময় কালনা থেকে কলকাতা পর্যন্ত এলাকায় ভদ্রেশ্বরের মতো বড়ো গঞ্জ আর ছিল না…

হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন যখন মেন লাইন দিয়ে বর্ধমানের পথে এগোয়, গঙ্গার ঠিক সমান্তরালে হুগলি জেলায় একের পর এক শহর পেরোতে থাকে, ঔপনিবেশিক শাসনের নানারঙা মোজাইক ফুটে উঠতে থাকে চোখের সামনে। ব্রিটিশ ছাড়াও বণিকের বেশে আরো কত সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপিয়ান পা রেখেছিলেন এই বাংলায়, তার নমুনা ছড়িয়ে আছে এই সব শহরগুলোতে। ভদ্রেশ্বরে একসময় ছিল ড্যানিশ  অর্থাৎ ডেনমার্কের অধিবাসীদের কুঠি। যে কারণে ভদ্রেশ্বরের ডাকনাম হচ্ছে দিনেমারডাঙা, ঠিক যেমন চন্দননগরের আরেক নাম ফরাসডাঙা। পরে দিনেমারডাঙার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে জার্মান এবং অস্ট্রিয়ান বণিকদেরও কুঠিও তৈরি হয়েছিল। ইংরেজ এবং ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বাণিজ্য আর অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে আস্তে আস্তে বাকি সব ইউরোপিয় কোম্পানিই বাধ্য হয়েছিল বাংলা থেকে চলে যেতে।

ভদ্রেশ্বরের উত্তরে যে এলাকায় ফরাসি শাসনের ইতিহাস রয়েছে, সেটা এক সময় ইংরেজদের ছিল। আবার তেলেনিপাড়া অঞ্চল ইংরেজদের আগে ছিল ফরাসিদের দখলে। ইংরেজ এবং ফরাসি ভূখণ্ডের সীমানা এতটাই বাঁকা ছিল যে তাতে দু’পক্ষেরই অসুবিধে হচ্ছিল যথেষ্ট। তাই দু’তরফে আলোচনা করে সীমানা নতুন করে বানানো হয়, তাতে ফরাসিদের কিছু জায়গা চলে আসে ইংরেজদের কাছে, ইংরেজদের কিছু অঞ্চল চলে যায় ফরাসিদের দখলে। আগে তেলেনিপাড়ার নাম ছিল কৃষ্ণপটি। সেখানে ফরাসিদের তেলেঙ্গি সৈন্যরা থাকতেন বলে জায়গাটার নাম হয়ে যায় তেলেঙ্গিপাড়া, তারপর সাধারণ মানুষের উচ্চারণে সেটা পালটে হয় তেলেনিপাড়া।

তাহলে ‘ভদ্রেশ্বর’ নামের উৎস কোনটা? এর ইতিহাস সম্পূর্ণ আলাদা। মনসামঙ্গলের সবচেয়ে পুরোনো পাঁচালিকার ১৫ শতকের কবি বিপ্রদাস পিপলাইয়ের লেখায় ‘ভদ্রেশ্বর’ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই নামটা এসেছে ভদ্রেশ্বর শিবমন্দির থেকে। গঙ্গার তীরে এই মন্দিরটি মোটামুটি পাঁচশো বছরের পুরোনো। জনশ্রুতি আছে, ত্রেতাযুগে যখন বিষ্ণুর অবতার রামচন্দ্র আবির্ভূত হয়েছিলেন, এখানে মহাদেব লিঙ্গের রূপ নিয়ে মাটি থেকে উঠে আসেন। অনেক আগে বর্ধমানের  মহারাজার অর্থসাহায্যে তৈরি ছোটো একটা মন্দির এখানে ছিল। দেখাশোনার অভাবে সেই মন্দির ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে থাকে। পরবর্তীকালে সখীবালা দাস নামের এক ভক্ত নতুন করে এখানে মন্দির তৈরি করেন। নিঃসন্তান বিধবা সখীবালার বাবা ছিলেন ধনী ব্যবসায়ী শ্যামসুন্দর মণ্ডল।  বিপুল অর্থব্যয়ে তৈরি অপেক্ষাকৃত বড়ো সেই মন্দিরটিই এখন দেখা যায় এখন যেখানে শক্তিসংঘের বিখ্যাত দুর্গাপুজো হয়, তার ঠিক পাশে। তেলেনিপাড়ার অন্নপূর্ণা মন্দিরটিও এখানে খুব বিখ্যাত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলা ১২০৮ সনের ফাল্গুনী পূর্ণিমায় এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় জমিদার বৈদ্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।

ভদ্রেশ্বরের আরেকটা নাম ছিল বুদেসি। একটা সময় কালনা থেকে কলকাতা পর্যন্ত এলাকায় ভদ্রেশ্বরের মতো বড়ো গঞ্জ আর ছিল না। আশেপাশের ত্রিশ-চল্লিশ মাইলের ধান এবং চাল এখান থেকেই সরবরাহ করা হত। এর পাশাপাশি সংস্কৃত পড়াশোনার কেন্দ্র হিসেবেও এই জায়গার বেশ সুনাম ছিল। ১৮৩৫-৩৬ সালে উইলিয়াম অ্যাডাম  বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা সংক্রান্ত যে রিপোর্ট ইংরেজ সরকারের কাছে পেশ করেন, সেখানে তিনি জানিয়েছেন যে এই জায়গায় দশটি চতুষ্পাঠী ছিল। উনিশ শতকের শুরুতে শ্রীরামপুরের পাদরি উইলিয়াম ওয়ার্ড তাঁর ‘A view of the History, Literature and Mythologies of the Hindoos’ বইতে ভদ্রেশ্বরের আটটি চতুষ্পাঠীর উল্লেখ করেছেন, যেখানে ন্যায়শাস্ত্র পড়ানো হত। এরপর ধীরে ধীরে দেশীয় সংস্কৃত শিক্ষার বদলে এখানে পাশ্চাত্য শিক্ষা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তেলেনিপাড়ার বন্দ্যোপাধ্যায় বংশের জমিদাররা এখানে ইংরেজি স্কুল তৈরি করার ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

এখানে দুর্গাপুজোও বেশ জমজমাটভাবেই হয়ে আসছে, পাশাপাশি চন্দননগর আর মানকুন্ডুর সঙ্গে ভদ্রেশ্বরের জগদ্ধাত্রীপুজোও  খুব বিখ্যাত। এবার জগদ্ধাত্রীপুজোয় ঘুরেও আসতে পারেন ভদ্রেশ্বর। হাওড়া থেকে ট্রেনে গেলে বৈদ্যবাটির পরের স্টেশন, আর ব্যান্ডেল থেকে গেলে মানকুন্ডুর পরের স্টেশন ভদ্রেশ্বর। ডানলপ মোড় থেকে বাস বা অটোয় বালি স্টেশন নেমেও ট্রেনে  ভদ্রেশ্বর যাওয়া যায়। উত্তর ২৪ পরগনা থেকে চাইলে শ্যামনগর দিয়ে গঙ্গা পেরিয়েও আপনি ভদ্রেশ্বর যেতে পারেন।

Developed by DXDasia