বিয়ন্ড দ্য ক্লাউডস : চলচ্চিত্র উৎসবে মাজিদি আঁকলেন অপেক্ষার ছবি

ভারতীয় প্রেক্ষিতে নির্মিত মাজিদ মাজিদির একমাত্র ছবি দেখানো হল কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে

এবারের কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অফিসিয়াল সিলেকশন বিভাগে ইরানি পরিচালক মাজিদ মাজিদির চারটি ছবি রয়েছে। এর মধ্যে ‘বিয়ন্ড দ্য ক্লাউডস’ মাজিদির একমাত্র ভারতীয় প্রেক্ষাপটে নির্মিত সিনেমা। গোটা ছবিটি আসলে একটা যুদ্ধের গল্প। না, রাজায় রাজায় যুদ্ধ নয়, শ্রেণিসংগ্রাম নয়, শাসকের বিরুদ্ধেও লড়াইও নয়। এমনকি ন্যায় আর অন্যায়ের যে চিরায়ত যুদ্ধে মানুষ বিশ্বাস করে, তাও নয়। এই যুদ্ধ অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। কার অস্তিত্ব? কোনো ব্যক্তি, কোনো জাতিগোষ্ঠী বা কোনো মতাদর্শ? এই যুদ্ধ মানবতার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য। হাজার রকম শোষণ অত্যাচারে হয়তো নৈতিকতার মেরুদণ্ড ভেঙে যেতে পারে, মানুষ বাঁচার তাগিদে এমন কিছু পেশা বেছে নিতে পারে, সমাজের চোখে সেটা খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়। তারপরেও কিন্তু মানবতার একটা লেশ থেকে যায় মনের গভীরতম প্রদেশে। সংকটের মুহূর্তে সে জেগে ওঠে, মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়, বিশ্বাস করতে শেখায়, জীবনকে আঁকড়ে ধরে ভালোবাসতে শেখায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ"। এই পাপ কোনো ধর্মীয় আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে না, বরং ধর্ম-রাজনীতি সবকিছুকে অতিক্রম করে পথ দেখায় বেঁচে থাকার। মাজিদির গোটা ছবিটির সারাৎসার এখানেই। এখানে মানবতার সাথে জীবন একাত্ম হয়ে গেছে।

ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের সমাজব্যবস্থা খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে এই ছবিতে।  সিনেমার শুরুই হয় একটা বৈপরীত্যের দৃশ্যকে ফোকাস করে। মুম্বাই শহরের ঝাঁ-চকচকে আবাসনের ঠিক পাশেই ব্রিজের তলায় গৃহহীন গরিব মানুষদের বাস। ছবির প্রধান চরিত্র আমির, যে বেআইনি ড্রাগের চোরাকারবারি করে। পরিস্থিতির চাপে এমন একটা অপরাধ করেই তাকে বেঁচে থাকতে হয় বটে, সেসবের মধ্যেই কখনও কখনও মানবতা ঝিলিক দিয়ে যায় তার মনে। তাই যার অধীনে সে কাজ করে, তাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করে সে।  

এই সিনেমা দেখতে দেখতে আমার বারবার মনে পড়ছিল ভিক্তর উগোর লেখা 'লা মিজারেবল' উপন্যাস এবং বিশেষ করে তার জাঁ ভালজা চরিত্রের কথা। তবে জাঁ ভালজার ক্ষেত্রে যেমন ঘটেছিল দাগি অমানবিক নিষ্ঠুর অপরাধী থেকে হঠাৎ একজন সন্তপ্রতীম দয়ালু মানুষে রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনা, এই ছবি কিন্তু সেরকম নয়। এখানে কোনো রূপান্তর নেই, আছে দ্বন্দ্ব, যা গোটা ছবিকে টেনে নিয়ে চলেছে। এই দ্বন্দ্বই আমিরকে বাধ্য করে মুমূর্ষু আকশির মুখ থেকে অক্সিজেনের পাইপ খুলে নিয়ে আবার আটকে দিতে, আকশির মেয়েকে যৌনকর্মীর দালাল রাহুলের কাছে বিক্রি করতে গিয়ে আবার মতামত পালটে ফিরিয়ে আনতে কিংবা আকশির পরিবারকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েও আবার বাড়িতে নিয়ে আসতে।  

এরকম দ্বন্দ্ব যে শুধু আমিরের মনে আছে তা নয়, আমিরের বন্ধু অনিলের মনেও রয়েছে। তাই আমিরকে টাকার বিনিময়ে রাহুলের লোকজনের কাছে তুলে দিয়েও আবার বাঁচাতে চেষ্টা করেছিল সে, নিজে মার খেয়েও। কিংবা জেলের মহিলা অফিসারের সেই আংটি ফিরিয়ে দেওয়ার কথাও এখানে বলা যায়। ছবির শেষটা আশাবাদের না নৈরাশ্যের তা বলা কঠিন। আকশির মৃত্যু হয় হাসপাতালে, আমিরের দিদি তারা শেষপর্যন্ত জেলখানাতেই থেকে যায়, আবার অন্যদিকে আমির এবং তার দিদি দুজনেই পেয়ে যায় নতুন পরিবার।  

ছবিতে ক্যামেরার কাজ দুর্দান্ত। প্রত্যেক অভিনেতারই অসাধারণ কাজের সঙ্গে সঙ্গে গৌতম ঘোষের নির্বাক অভিনয় আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। বিশাল ভরদ্বাজের সংলাপ মুম্বাইয়ের সাবলটার্ন সমাজকে খুব তুলে ধরেছে নিঁখুতভাবে। মেঘের পেছনে যে চাঁদ লুকিয়ে থাকে, তাকে দেখার অপেক্ষা নিয়েই ছবিটি শেষ হয়, ছবির মূল সুরটি তাই শেষ পর্যন্ত অসমাপ্তই থাকে।

ছবি – বিয়ন্ড দ্য ক্লাউড
পরিচালক – মাজিদ মাজিদি
সংগীত – এ আর রহমান

Developed by DXDasia