শহরের কাছাকাছি ছড়িয়ে পড়ছে সীড বল
পিনাকীবাবুর সঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র রাজু ওরফে দেবেন্দ্র মন্ডল
ঘোরাঘুরি করতে করতে রাস্তা-ঘাটের আশেপাশে ওরা ছোটো ছোটো চকলেট বোমার মতো কী যেন ছুঁড়ে ফেলছে অথচ, কই কিছু ফাটছে না তো, কোনও শব্দই তো হচ্ছে না! হ্যাঁ, দূর থেকে দেখলে পিনাকীবাবুদের এহেন কর্মকান্ড দেখলে এমনটাই মনে হতে পারে প্রাথমিক ভাবে। বোমার মতো জিনিসগুলো আসলে সীড বল (Seed ball)। কোনও রকম দূষণ ছড়ানো নয়, এই সীড বল হল নতুন প্রাণের উৎস, প্রকৃতির দান।
সীড বল সম্পর্কে এখন আমরা অনেকেই জানি। সীড বল হল মাটির গোলার ভেতর বীজ পুরে বানানো এমন একটা বল, যেগুলোকে আমরা যেকোনও জায়গায় ফেললে, তা বৃষ্টির সংস্পর্শে এসে সেখান থেকে বীজের অঙ্কুরোদগম হয়ে নতুন গাছের জন্ম হয়। বিশেষত আজকের বিশ্বে সীড বলের গুরুত্ব অপরিসীম। আপনি কোথাও ঘুরতে যাচ্ছেন, ব্যাগে নিয়ে নিলেন কিছু সীড বল, সেগুলোকে রাস্তার দু’ধারে ফেলে দিলেন, কিছুদিন পর সেখানেই জন্ম নেবে নতুন গাছ। বাড়ির শিশুদের সাহায্যে খুব সহজেই সীড বল বানিয়ে ছড়িয়ে দিতে পারেন প্রকৃতিতে। এতে ওরা উৎসাহ পাবে তো বটেই, মাটির সঙ্গে সোজাসুজি যোগাযোগ তৈরি হবে।

“রমজানে তথা বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ জুড়ে যে ফল খেতাম তারই বীজ ধুয়ে শুকিয়ে রেখেছিলাম বর্ষার অপেক্ষায়। বীজ বপন বেড়া দেওয়ার মত মানুষের যত্নের অপেক্ষায় থাকে না। তাই বর্ষা সমাগত যখন, আমরা ছড়িয়ে দিলাম প্রকৃতির দান প্রকৃতির মধ্যেই। বর্ষার জল বাকি কাজটা নিজেই করে নেবে।” বলছিলেন পিরনগর হাইস্কুলের শিক্ষক পিনাকী গুহ।
“আমরা” মানে পিনাকীবাবু বলতে চেয়েছেন, তিনি এবং তাঁর ছাত্ররা। আর যে পদ্ধতির কথা তিনি বলছেন, তার নাম ‘গেরিলা গার্ডেনিং’। এই পদ্ধতি তিনি শিখেছিলেন, দেশের প্রথম ‘ফড়িং পুকুর’ তৈরি করে প্রকৃতি পাঠের অভিনব ব্যবস্থা করেছেন যিনি, সেই মন্টু হাইতের কাছে। পেশায় আইনজীবী হলেও, কলকাতার চেতলাবাসী মন্টু হাইত (Mantu Hait) একজন নিবেদিতপ্রাণ প্রকৃতিপ্রেমী, আরও ভালো করে বললে প্রকৃতি-সংস্কারক। বিগত কয়েক বছরে এই মন্টুবাবুই পরিচিতি পেয়েছেন ‘শহরের অরণ্যদেব’, ‘কলকাতার গ্রিন ম্যান’ বা ‘ট্রিম্যান’ হিসেবে। মন্টুবাবু ঠিক করেছিলেন গাছ লাগাবেন কলকাতার মাঝেরহাট আর নিউ আলিপুর স্টেশনের মধ্যবর্তী ফাঁকা জমিতে, যা দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত হয়ে বর্জ্য ফেলার আস্তাকুঁড় হয়ে উঠেছিল। জমিটি আইনত কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের। সেখানে অন্য কেউ গাছ লাগালে সেও এক অর্থে আইন ভাঙা। মন্টু হাইত তাই ঠিক করলেন গাছ লাগাবেন গেরিলা কায়দায়। নিজের সংগ্রহ থেকে এছাড়াও নানা জায়গা থেকে জোগাড় হল বীজ। আলিপুর কোর্ট থেকে সংগ্রহ করা জাম, বাক্সবাদাম এছাড়া অশোক, কাঁঠাল, আম, তেঁতুল, পেয়ারা ও আরো কত কী। বর্ষায় সেইসবই তিনি ছড়িয়ে দিলেন শুকনো জমিতে। প্রয়োজনে বুনতে লাগলেন চারাও। ধীরে ধীরে সবুজে ভরে উঠল গোটা অঞ্চল। এক কিমি জুড়ে প্রায় ২০,০০০ গাছে এ যেন এক নতুন অরণ্য – কলকাতার হৃদয়। সেই গাছ-গাছালিতে বাসা বাঁধল ৬০-এরও বেশি প্রজাতির পাখি ও অন্যান্য প্রাণী। শহরের বুকে একটুকরো মরূদ্যান হয়ে উঠল এই অঞ্চল। এই হল গেরিলা গার্ডেনিং।
ফলের গাছ যত থাকবে লোকালয়ে তত পাখি মৌমাছি কাঠবিড়ালির মত প্রাণীদের বাসস্থান-খাদ্যসংকট মিটবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য ঠিক থাকবে। আলাদা করে মানুষের দান তাদের আর প্রয়োজন হবে না। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে গাছেদের, পাখিদের, পিঁপড়ে বা মৌমাছিদের, সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে উঠবে প্রকৃতির ভান্ডার। মন্টুবাবুর গেরিলা গার্ডেনিং পিনাকীবাবুর মতো আরও অনেককেই উৎসাহিত করেছে। যেমন মধুবন স্বনির্ভর মৌপালক গোষ্ঠীর মধুকর্মী আরিফুল ইসলাম, যিনি মধুর সঙ্গে বীজ বিতরণ করছেন।
মধুবন-এর উদ্যোগ
এই বছর রথের দিন কচিকাঁচাদের নিয়ে গেরিলা গার্ডেনিং করে এসেছেন দিগনগর হাইস্কুলের দিদিমণি তনুশ্রী। এইভাবে পিনাকীবাবুর সঙ্গে এবছর গেরিলা গার্ডেনিং-উদ্যোগে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত হয়েছেন এঁরা এমনকী বাংলাদেশের পরিচিত কয়েকজন। পিনাকীবাবু বলছিলেন, “এবছর আমি আর রাজু গেছিলাম চড়িয়াল খালের পাশ দিয়ে বজবজগামী গ্রামীণ রাস্তায়। রাস্তার পাশে ফাঁকা মাটিতে সীড বল ছড়িয়ে এলাম। ব্রতচারীর মাঠের ধারে ধারেও ছড়িয়েছি। সিডবল তৈরিতেও রাজু প্রচুর সাহায্য করেছে। ব্রতচারী বিদ্যাশ্রমে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র রাজু ওরফে দেবেন্দ্র মন্ডল।”
ফলের গাছ যত থাকবে লোকালয়ে তত পাখি মৌমাছি কাঠবিড়ালির মত প্রাণীদের বাসস্থান-খাদ্যসংকট মিটবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য ঠিক থাকবে। আলাদা করে মানুষের দান তাদের আর প্রয়োজন হবে না। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে গাছেদের, পাখিদের, পিঁপড়ে বা মৌমাছিদের, সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে উঠবে প্রকৃতির ভান্ডার। মন্টুবাবুর গেরিলা গার্ডেনিং পিনাকীবাবুর মতো আরও অনেককেই উৎসাহিত করেছে।
বাংলাদেশে চলছে গেরিলা গার্ডেনিং
এখনো মেঘ আসে প্রাগৈতিহাসিক পথ চিনে, এখনো শস্য ফলে এখনো নতুন আশার বীজ অঙ্কুরিত হয় এখানে..
এইভাবে বড়োদের সঙ্গে সঙ্গে ছোটোদের মধ্যে, এক থেকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে চলেছে সবুজের অভিযান, পরিবেশ সচেতনতার পাঠ। আজকের দিনে এর থেকে ভালো আর কীই বা হতে পারে!
_________________________
বিশেষ সহায়তাঃ পিনাকী গুহ