২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভার অনুমোদনক্রমে এই প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়
এপ্রজন্ম জানে না ‘কবির লড়াই’ বা ‘কবিগান’ ঠিক কাকে বলে। হয়তো কেউ কেউ বলবে, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ বা ‘জাতিস্মর’ ছবির কথা। হ্যাঁ, কিছু কিছু বাংলা সিনেমার প্রেক্ষাপটে কবিগান দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে এবং এ কথা অস্বীকার করার জায়গা নেই যে, এই সিনেমাগুলির মাধ্যমে হয়তো আরও কিছুদিন বেঁচে থাকবে বাংলার একদা জনপ্রিয় মিশ্ররীতির নাটকীয় লোকসংগীত—কবিগান-এর নাম। বেঁচে থাকবে পশ্চিমবঙ্গের ‘কবিগান অকাদেমি’র জন্য।
চোখে না দেখলেও, আমরা কিন্তু ছোটোবেলায় ইতিহাস বইতে পড়েছিলাম চারণ কবিদের কথা, যাঁরা মূলত তাৎক্ষণিক ভাবে মুখে মুখে ছড়া কেটে বা পদ রচনা করে, তাতে সুর বসিয়ে গান বাঁধতেন। কবিগান এই ধারারই। আমরা জানতাম চারণ কবি মুকুন্দ দাস, বিজয় সরকারদের কথা। সেসব এখন ‘ব্যাকডেটেড’, সিলেবাস বহির্ভূত। গ্রামবাংলা থেকে উদ্ভূত কবিগান একসময় বিশেষ করে অষ্টাদশ উনিশ শতকে নগর কলকাতার জমিদার ও বণিকমহলের খুবই আদৃত ছিল। রাতের মেহফিলে ঢোল-কাঁসি নিনাদিত আদিরসাত্মক আর উত্তেজক এই গানের লড়াই দারুণ জমে উঠত। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের যুগ শুরু। কবিগান আবার যথারীতি গ্রামে ফিরে আসে। কবিগানের উৎস-উদ্ভবকাল নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। কেউ বলেছেন কবিগানের জন্ম হয়েছে প্রাচীন যাত্রা থেকে। কারো মতে প্রাচীন ঝুমুরগান। কেউ বা বলেছেন প্রাচীন পাঞ্চালিকাসাহিত্য থেকে এই লোক-আঙ্গিকের উদ্ভব। তবে, কবিগান মানেই দুটিপক্ষের ঠোকাঠুকি। ঢোল-কাঁসি দোহারের সঙ্গতে বাঁধা আসরে দুই ওস্তাদের ছড়াকাটাকাটি এবং চাপান উতোর অর্থাৎ প্রশ্ন ও জবাবি গানের লড়াই।
রবীন্দ্রনাথ কবিসঙ্গীত প্রবন্ধে জানিয়েছেন- প্রথমে নিয়ম ছিল দুই প্রতিপক্ষ দল পূর্ব থেকে পরস্পরকে জিজ্ঞাসা করে উত্তর-প্রত্যুত্তর লিখে আনতেন। পরবর্তীকালে আসর করে দুজন কবিয়াল পরস্পর বাগযুদ্ধে কবির লড়াই জমিয়ে দিতেন। তিনি লিখেছেন – “কথার কৌশল, অনুপ্রাসের ছটা, এবং উপস্থিত মতো জবাব ছিল কবিগানের মুখ্য আকর্ষণ।” হারজিত যতক্ষণ না নিষ্পন্ন হত ততক্ষণ চলত গানের লড়াই। এমনকি তিনরাত্রি পর্যন্ত গড়িয়ে যেত কবির লড়াই।

উনিশ শতকে কবিগানের বিষয়বস্তু বলতে বোঝাতো গুরুদেবের গান অর্থাৎ বন্দনাংশ, সখিসংবাদ ও বিরহমূলক গান। এছাড়া যুক্ত হয়েছিল ভবানীবিষয়ক লহর ও খেউড় গান। কবিগানে পড়েছিল ক্রমশ মার্গসঙ্গীতের প্রভাব। গবেষকদের মতে পূর্ণাঙ্গ কবিগানের পালায় দশটি বিভাগ ছিল যথা – চিতেন পরচিতেন ফুকা মেলতা মহড়া শওয়ারি খাদ দ্বিতীয়মহড়া দ্বিতীয়ফুকা ও অন্তরা। কবিগান সম্পর্কে শিক্ষিতজনের প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কবি ঈশ্বর গুপ্ত। ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দশজন কবিয়ালদের জীবনী ও ২৭০টি গান সংগ্রহ করেন। প্রথমযুগের কবিয়ালদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন গোঁজলা গুঁই হরু ঠাকুর রাসু নিত্যানন্দ দাস কেষ্টা মুচি এন্টনি ফিরিঙ্গি ভোলা ময়রা রাম বসু আকাবাঈ প্রমুখ।
তাহলে, এই বাংলা থেকে কি চিরতরে হারিয়েই গিয়েছে কবিগান? না, এখনও পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি এই লোকসংগীত। এখনও রাজ্যের নানা প্রান্তের গ্রামে কবিগানের আসর বসে। আজও রাঢ়-বাংলার গ্রামীণ মানুষের অন্যতম বিনোদন এই কবিগান। স্বাভাবিক ভাবেই তা পুরোনো আমেজ হারিয়েছে, আগের মতো অত বেশি সংখ্যায় আসর বসে না, দর্শকদের ভিড়ও উপচে পড়ে না আর।
মধ্যমগ্রাম-সোদপুর রোডে দক্ষিণ তালবান্দার বাসিন্দা, কবিয়াল মনোরঞ্জন সরকার ৩৫ বছরের বেশি সময় ধরে কবিগান গাইছেন। রীতিমতো নাড়া বেঁধে শিখেছেন কবিগান। তাঁর কথায়, “শহরাঞ্চলে আসরের জন্য মাঠ পাওয়া যায় না। আর শহরের ব্যস্ত মানুষ এ গান বেশিক্ষণ শুনতেও চান না। গ্রামের জনপ্রিয়তা থাকলেও, অনুষ্ঠানের সময় এখন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কবিগানের পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গীয় দুটি ধারা। পশ্চিমবঙ্গীয় ধারা কলকাতার বাবুদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিস্তার লাভ করে। সেই ধারায় কবিগানের আসরে ব্যক্তিকুৎসা, ব্যক্তিগত আক্রমণ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাশাপাশি পূর্ববঙ্গীয় ধারায় প্রধানত লোকসংস্কৃতি, লোকাচার, সামাজিকতা ও শিক্ষামূলক বিষয়ের উপরে গান বাঁধা হত। ফলে পূর্ববঙ্গীয় ধারার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কমেছে।”
পশ্চিমবঙ্গে কবিগানের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে কিন্তু বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্তের কথা এখানে উল্লেখ করতেই হয়। ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভার অনুমোদনক্রমে ‘কবিগান অকাদেমি’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। এরকম একটি প্রতিষ্ঠান যে পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে, তা অনেকেই জানেন না। তদানীন্তন অনগ্রসর শ্রেণী কল্যাণ মন্ত্রী ড. উপেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের এই প্রস্তাবটি সম্পর্কে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিশেষ উৎসাহ প্রকাশ করেন এবং বনগাঁ শহরে দীনবন্ধু মহাবিদ্যালয় (বনগাঁ কলেজ)-এর প্রশাসনিক ভবন, শিক্ষা ভবন এবং আবাসিকদের ভবন (হোস্টেল) নিয়ে গড়ে ওঠে কবিগান অকাদেমির ক্যাম্পাস। কবিগান নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি সেখানে বিভিন্ন শাস্ত্র ও ধর্মগ্রন্থ পড়ানো হয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনগ্রসর শ্রেণী কল্যাণ বিভাগের এই প্রকল্পটির দেখভালের দায়িত্ব বর্তমানে ন্যস্ত হয়েছে এই বিভাগের অধীনস্থ একটি নিগম ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ফিনান্স কর্পোরেশন’-এর উপর। ঘটনাচক্রে বর্তমানে এই নিগমের চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন ড. উপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস-ই। তাঁর নেতৃত্বে কবিগান অকাদেমির অধীনে বিভিন্ন গবেষণাধর্মী কাজ এবং প্রকাশনার কাজ অত্যন্ত গতিশীলতার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। ড. বিশ্বাসই কবিগান অকাদেমির স্লোগান বেঁধে দিয়েছেন : সৃজনশীলতার অগ্রগতি।

উপেনবাবু বলেন, “কবিগানকে সমৃদ্ধ করতে এবং ভারত-বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে একে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। শিক্ষিত কবিয়ালরা সঠিকভাবে বিষয়বস্তু নির্বাচন করে গান গাইলে শহরের মানুষও ফের কবিগান শুনবেন বলেই আমরা মনে করি।”
অকাদেমি কর্তৃপক্ষের কথায়, “কবিগানের বিস্তৃতি ও ব্যাপকতা—যে কোনও বিষয় নিয়েই কবিগানের চর্চা, তরজা বা বিতর্ক চলতে পারে। তাই কবিগান অকাদেমির কাজেরও কোনো সীমা-পরিসীমা নেই; সৃজনশীলতার অনন্ত দিগন্তের অভিমুখে এ এক নিত্য অভিযাত্রা।”

প্রসঙ্গত, বর্তমানে কবিগান পুরোপুরি মৌখিক। বিষয়বস্তুতে এসেছে পরিবর্তন। পুরাণ সাহিত্যের পাশাপাশি সামাজিক রাজনীতি ও ক্যারিকেচার পালার অন্যতম বিষয়বস্তু। কয়েকটি জনপ্রিয় পালা হল কৃষ্ণ-দুর্যোধন রাম-রাবণ কৃষ্ণ-গান্ধারী শাক্ত-বৈষ্ণব চাঁদ-মনসা বিবেকানন্দ-রামকৃষ্ণ সেকাল-একাল কংগ্রেস-সিপিএম হিন্দু-মুসলমান ধর্ম-অধর্ম ইত্যাদি। বর্তমানে আবার জনকল্যাণ মূলক সরকারি প্রকল্পের বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করে কবিগান হচ্ছে যেমন কন্যাশ্রী ডেঙ্গু প্রতিরোধ সাক্ষরতা ইত্যাদি। তবে গ্রাম-বাঙলায় পেশাদারি কবিগান মেলা উৎসবে পুজো-আর্চায় কর্তৃপক্ষের ইচ্ছানুসারে দিন বা রাতে মঞ্চস্থ হয়। গানের স্থায়িত্বকাল মোটামুটি পাঁচ থেকে ছয়ঘণ্টা। প্রতি দলে থাকেন একজন কবিয়াল ছাড়া দুজন দোহার ঢুলিদার। ইদানিং বাদ্যযন্ত্র হিসাবে হারমোনিয়াম ক্যাসিও ফুলোট বেহালাও ব্যবহৃত হচ্ছে। কবিয়ালের পোশাক সাদা ধুতি পাঞ্জাবি। গলায় উত্তরীয়। দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলার তুলনায় বর্ধমান বীরভূম নদিয়া বাঁকুড়া আর মুর্শিদাবাদ জেলার হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে প্রিয় বিনোদন এই কবিগান।
মুর্শিদাবাদ জেলার জনপ্রিয় কবিয়ালরা হলেন গুমানি লম্বোদর জানকি রায় কিশোরী কোঁড়া কাঞ্চন মণ্ডল প্রমুখ। বীরভূম জেলার অন্যতম কবিয়াল হলেন কেনারাম মোদক শিবশংকর পাল জ্ঞান সাহা। নদিয়া জেলার অন্যতম কবিয়াল হলেন নৈরুদ্দিউন গৌতম হাজরা হারাধন দে মুকুল ভট্টাচার্যরা। বর্ধমান জেলার কবিয়ালরা হলেন সাহেবজান চাঁদ মুহম্মদ মধুসূদন ঘোষাল সনৎ বিশ্বাস দিলীপ চ্যাটার্জি সুবিকাশ ব্যানার্জি সুভাষ মণ্ডল শুভাশিস ব্যানার্জি প্রমুখরা। বাঁকুড়ার জনপ্রিয় কবিয়াল গণেশ ভট্টাচার্য। দেশ বিদেশে সমানভাবে তিনি আদৃত। পূর্ববঙ্গের ঘরানার অন্যতম লব্ধ-প্রতিষ্ঠ কবিয়াল অসীম সরকার প্রভাত সরকার সজল সরকার আদিত্য সিংহরা।
__________________
তথ্যঋণঃ
কবিগান অকাদেমি
রাঢ়-বাংলার কবিগান, স্বপনকুমার ঠাকুর
সীমান্ত মৈত্র (আনন্দবাজার পত্রিকা)