বাঙালির পুজো-ভ্রমণ
বছরের অন্যান্য ছুটি তো আছেই, তবে সব থেকে বেশি সংখ্যক বাঙালি পুজোর অবকাশেই ঘুরতে পছন্দ করেন। মহালয়া যেরকম দুর্গোৎসব শুরু হওয়ার ইঙ্গিত দেয়, তেমনি যাঁরা পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়ানোর পরিকল্পনা করেন, এই সময় থেকেই তাঁদের ব্যাগপত্র গোছানোর প্রস্তুতি চালু হয়ে যায়। তবে, সবসময় বিদেশ বিভুঁইয়ে যাওয়ার দরকার নেই, কাছেপিঠেই বেরিয়ে পড়তে পারেন। বাড়িতে বসে না থেকে আমাদের রাজ্যকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে মন্দ লাগবে না। খুব বেশি বাজেট না হলেও চলবে। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন সড়কপথে। আমাদের বাংলাতেই রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কিংবা ঐতিহাসিক নিদর্শনে ভরপুর কত জায়গা। এবারের পুজোয় চলুন সেসব গন্তব্যে ঘুরে আসা যাক:
কংসাবতী নদীর ধারে লুকিয়ে রয়েছে অমূল্য এক রত্ন – দেউলঘাটা
পুরুলিয়া জেলায় কংসাবতী নদীর ধারে লুকিয়ে রয়েছে অমূল্য এক রত্ন। মন্দিরের দেশ দেউলঘাটা। জয়পুর অরণ্য থেকে ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পুরুলিয়া শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে তার অবস্থান। পুরুলিয়ায় এক সময় জৈন ধর্মের বিস্তার ঘটেছিল। কয়েকজন ইতিহাসবিদ মনে করেন, জৈনদের ২৪তম অর্থাৎ শেষ তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীর এখানে ছিলেন বেশ কিছু দিন। আচারাঙ্গ সূত্র এবং ভগবতী সূত্রের মতো জৈন শাস্ত্রে মহাবীরের রাঢ়দেশ (পুরুলিয়া এবং সংলগ্ন এলাকা) ভ্রমণের উল্লেখ পাওয়া যায়। আজও প্রায় ১৫টি প্রাচীন মন্দির এবং ছোটো ছোটো কয়েকটি ধর্মীয় সৌধের ধ্বংসস্তূপ দাঁড়িয়ে আছে বাংলার জৈন ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে। এগুলি গড়ে উঠেছিল ১০-১০ শতাব্দী নাগাদ।
হাওড়া স্টেশন থেকে পুরুলিয়া যাওয়ার পর্যাপ্ত ট্রেন রয়েছে। সড়কপথে পুরুলিয়া শহর পৌঁছোতে মোটামুটি ৬ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। পুরুলিয়া শহর থেকে দেউলঘাটা প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে।
বাঁকিপুট সৈকতে নিস্তব্ধতার জাদু
পুজোর ছুটিতে শহুরে কোলাহলে যদি ক্লান্ত হয়ে যান, নির্জনে ছুটি কাটানোর ইচ্ছে হয়, বাঁকিপুট তাহলে আদর্শ গন্তব্য। আমরা অনেকেই না বুঝে ‘ভার্জিন বিচ’ কথাটি ব্যবহার করি। তা যে আসলে কী, জানা যায় পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বাঁকিপুট সৈকতে গেলে। হতে পারে আপনি কখনও এই জায়গার নাম শোনেননি। বাঁকিপুট সৈকত জুনপুটের কাছেই, যার গল্প কয়েকদিন আগেই বলেছি আমরা।
যেহেতু পর্যটকদের কাছে খুব একটা পরিচিত নয়, তাই বাঁকিপুট সৈকত এখনও নির্জন। ঝাউগাছের ঘন অরণ্যে ঘেরা বেলাভূমি। কলকাতা থেকে সহজেই চলে যেতে পাড়েন সড়কপথে। জাতীয় সড়ক ৪ ধরে মেচেদা, দিঘা এবং কাঁথি পেরিয়ে বাঁকিপুট পৌঁছবেন। কাঁথি থেকে দূরত্ব ১৬ কিলোমিটারের মতো।
গড়চুমুক (হাওড়া)
হাওড়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হুগলি ও দামোদরের সংযোগ স্থলে দাঁড়িয়ে রয়েছে গড়চুমুক নামের এই ছোট্ট শহর। উঁচুনিচু পাহাড়ি অঞ্চলের বুকের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা নদীগুলি যেন কোনো শিল্পীর হাতে আঁকা ছবি। নদীর দুই পাড় ছেয়ে রয়েছে পান্নারঙা সবুজ ঘাসে। তারই মাঝে রয়েছে কিছু লম্বা গাছ। চাইলে আপনি নৌকা নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য বেরিয়ে পড়তে পারেন নদীতে। তবে এই মনোরম পরিবেশে, চুপচাপ নদীর পাড়ে বসে থাকলেও কোথা দিয়ে যে সময় পেরিয়ে যাবে, বুঝতেই পারবেন না। ভাগ্য সহায় থাকলে, নদীর পাড়ে বসেই আপনি দেখতে পাবেন বক কিংবা মাছরাঙা পাখির দল কীভাবে তৎপরতার সঙ্গে জলে নেমে, ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে আসে মাছ। দেখতে পাবেন আটান্ন গেট, গড়চুমুক ডিয়ার পার্ক, গড়চুমুক চিড়িয়াখানা, চিলড্রেন্স পার্ক প্রভৃতি নানাবিধ আকর্ষণ।
হাওড়া থেকে গড়চুমুকের দূরত্ব ৫২ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে আড়াই ঘণ্টার কাছাকাছি সময় লাগে গড়চুমুক পৌঁছাতে।
রায়চক (দক্ষিণ ২৪ পরগনা)
হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত রায়চকে রয়েছে ১৮ শতকে নির্মিত ডাচদের তৈরি একটি প্রাচীন কেল্লা। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আপনি সহজেই সাক্ষী হতে পারেন একটা অসাধারণ সূর্যাস্তের। অথবা রায়চক বা নূরপুর জেটি থেকে নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন গাদিয়াড়ার উদ্দেশে। রায়চক থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটারের দূরত্বে রয়েছে ডায়মন্ড হারবার। এখানে এসে সারাদিনের জন্য একটা ক্রুইজশিপ-ও ভাড়া করতে পারেন চাইলে। দেখতে পাবেন চিংড়িখালি নামের এক সুপ্রাচীন কেল্লা, একসময় যার অধিকার ছিল পর্তুগিজদের হাতে। হাতে সময় থাকলে রায়চক ভ্রমণ সেরে ডায়মন্ড হারবার হয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন গঙ্গাসাগর, কাকদ্বীপ, নামখানা এবং বকখালির পথে।
কলকাতা থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটারের দূরত্বে অবস্থিত রায়চক। কলকাতা থেকে গাড়ি ভাড়া করে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই রায়চক পৌঁছে যাওয়া যায়।
জয়পুর জঙ্গল (বাঁকুড়া)
কলকাতার কাছে বসেই যদি জঙ্গলের স্বাদ পেতে চান, তাহলে সপ্তাহান্তে ঘুরে আসতে পারেন বাঁকুড়ার জয়পুর জঙ্গল থেকে। শাল, পলাশ, মহুয়া, নিম গাছে ভর্তি এই জঙ্গলে একটু কান পাতলেই শুনতে পাবেন নাম না জানা পাখিদের কিচিরমিচির। জঙ্গলের পথে চলতে চলতে প্রায়ই চোখে পড়ে যাবে হাতি, শিয়াল কিংবা হরিণের দল। এখানেই দেখতে পাবেন সমুদ্র বাঁধ নামের একটি জলাশয়; যার গা লাগোয়া ওয়াচটাওয়ারে উঠলে পেয়ে যাবেন সমস্ত জঙ্গলটার একটা প্যানোরামিক ভিউ। এছাড়াও নিকটবর্তী জয়পুর গ্রামে গেলে আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবে ১৯ শতকের কিছু ঐতিহাসিক মন্দির।
বিষ্ণুপুর অবধি ট্রেনে গিয়ে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরের জয়পুর জঙ্গলের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারেন। অথবা কলকাতা থেকে আরামবাগের পথ হয়ে, গাড়িতে এসে পৌঁছাতে পারেন এই জঙ্গলে। কলকাতা থেকে গাড়িতে মাত্র চার ঘণ্টা লাগবে বাঁকুড়া পৌঁছতে। যদি প্রত্নতত্ব ও ইতিহাসের প্রতি গভীর ঝোঁক থাকে, তাহলে আসার পথে খানিকটা সময় কাটিয়ে আসতে পারেন কোতুলপুরে। বাংলার হারিয়ে যাওয়া জমিদারির বেশ কিছুটা অংশ আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে কোতুলপুরের মাটিতে।
ছুটি কাটান বাংলার ঐতিহ্যবাহী সব রাজবাড়িতে
সারা বাংলায় ছড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক প্রাসাদগুলো ভুললে চলবে না। পশ্চিমবঙ্গকেই বলা যেতে পারে ‘প্রাসাদের রাজ্য’। জেলায় জেলায় বেশ কিছু পুরোনো অট্টালিকায় এখন চালু হয়েছে হেরিটেজ হোটেল এবং রিসর্ট। উইকএন্ডে গিয়ে চুটিয়ে ছুটি উপভোগ করা যায়। পশ্চিমবঙ্গে ‘রাজবাড়ি হোটেল’-এর আকর্ষণ ক্রমেই বাড়ছে পর্যটকদের কাছে। এই তালিকায় পড়বে ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি, পূর্ব বর্ধমানের আমাদপুর রাজবাড়ি, মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জের বড়ি কোঠি হেরিটেজ হোটেল, মহিষাদল রাজবাড়ি, বাওয়ালি রাজবাড়ি, ইটাচুনা রাজবাড়ি।
পছন্দ মতো যেকোনও একটিতে বা একাধিক জায়গায় পুজোর আনন্দ ভাগ করে নিতে পৌঁছে যেতে পারেন সবান্ধব, সপরিবারে অথবা একদম একা।