উদ্বাস্তু কলোনিতে বারভূতের পুজো : শক্তি ও প্রকৃতির মেলবন্ধনের উৎসব

লোকবিশ্বাসের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই বারভূতের মেলা

দক্ষিণ কলকাতার বিজয়গড় কলোনির অন্তর্গত বারভূত দ্বাদশ অবতার মন্দির তথা বুড়িমা-র থানটি ওপার বাংলার উদ্বাস্তু বা বাস্তহারা মানুষের কাছে একটি আবেগ ও বিশ্বাসের জায়গা। ভারত বিভাজনের টালমাটাল সময়ে লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুহারা হয়ে এপার বাংলায় চলে আসেন। তাদের পুনর্বাসনের জন্য ক্রমে গড়ে ওঠে উদ্বাস্তু কলোনি ও বাস্তহারা মানুষের স্থায়ী আস্তানা।

ধারণা করা হয় এ হল, শক্তি ও প্রকৃতির মেলবন্ধনের উৎসব। বৃক্ষরূপী বনদুর্গাকে উর্বরতার শক্তি রূপে ও প্রজননশীলতার প্রতীক রূপে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আরাধনা করা হয়ে আসছে। সেই উপলক্ষ্যে সাতদিন ব্যাপী বিরাট মেলা আয়োজন করা হয়।

এই ছিন্নমূল মানুষ, যাদের আমরা বাঙাল নামেই জানি। দেশভাগের সময়ে তারা হারিয়েছিল বাস্তু জমি, হারিয়েছিল পরিবার-পরিজনকে। কিন্তু সংস্কৃতিকে তারা হারায়নি। বলা ভালো হারিয়ে যেতে দেয়নি! তেমনই একটি বড়ো উদাহরণ হল বিজয়গড় কলোনির অন্তর্ভুক্ত বারভূত দ্বাদশ অবতার মন্দির ও বুড়িমা-র থানটি।

এই থানের জন্মলগ্নের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি কিংবদন্তি। তা জানতে গেলে ফিরে যেতে হবে অষ্টাদশ শতকের প্রারম্ভে। অধুনা বাংলাদেশের ঢাকা জেলার রোহিতপুর গ্রামে বাস করতেন চৈতন্য ঘোষ নামে এক দরিদ্র ও নিঃসন্তান দুগ্ধ ব্যবসায়ী। তিনি ছিলেন পরমনিষ্ঠাবান বিষ্ণুর উপাসক। ছায়া শীতল এক বট-পাঁকুড় বৃক্ষতলে বিষ্ণুর পূজার্চ্চনা করতেন তিনি। একদিন এক শুভ্রকেশী অশীতিপর প্রৌঢ়া দুই নাতি ও এক নাতনিকে নিয়ে প্রবল শীতের সময়ে, এই দুগ্ধ ব্যবসায়ীর ঘরে আশ্রয়ের জন্য উপস্থিত হন। বৃদ্ধাও ছিলেন ক্ষুধার্ত। তিনি দরিদ্র গোয়ালার কাছে তাঁর ক্ষুধানিবারণের অনুরোধ করেন। ব্যবসায়ীও তাকে পরমযত্নে তাঁর বাড়িতে আশ্রয় ও আহারাদির ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য তৎপর হলেন।

এমতাবস্থায় চৈতন্য ঘোষ তাঁর স্ত্রী-র কথানুসারে পুকুরে জালনিক্ষেপ করেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত জাল ছিন্ন থাকার দরুণ একটি মাছও ধরা পড়েনি! অবশেষে দরিদ্র গোয়ালা হতাশ মনে ঘরে ফিরে আসেন। এখন তিনি কীভাবে অতিথি সেবা করবেন, তা নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বৃদ্ধা বলেন, 'বাবা তোদের উঠোন জুড়ে কত হাঁস চড়ে বেড়াচ্ছে! আমাকে না হয় জোড়াহাঁসের ডিমই খেতে দে!' তারপর বৃদ্ধা দুই নাতি ও এক নাতনিকে নিয়ে ভোজন সারলেন। কিন্তু রাত্রে শয়নকালে দরিদ্র দুধওয়ালা ভাবতে থাকেন আগামীদিনে বৃদ্ধাকে কী খেতে দেবেন! এ নিয়ে তিনি পুনরায় দুশ্চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লেন। শেষরাতে গোয়ালা স্বপ্নে দেখতে পেলেন সেই শুভ্রকেশী বৃদ্ধাকে। তিনি বলছেন, “ওরে আমি বনদুর্গা! আমি তোদের অতিথি পরায়ণতায় মুগ্ধ হয়েছি।‌ তোদের অভাব অনটন সব কেটে যাবে। ঘর আলো করে সন্তানাদি হবে। মকর সংক্রান্তির দিনে আমাকে বট-পাঁকুড়ের তলায় নিষ্ঠা ভরে পুজো কর।” (জনশ্রুতি)

সেই থেকে আজও মকর সংক্রান্তির সূর্যায়নের পূণ্যতিথিতে তাঁর নির্দেশ মতো দেবীর পুজো আজও পালিত হয়ে আসছে। হাজার হাজার বিবাহিত মহিলারা সন্তান কামনার আশায় ও সন্তানের আরোগ্য কামনার্থে জোড়া হাঁসের ডিম দিয়ে বনদুর্গা তথা বুড়িমা-র পুজো দিয়ে থাকেন। ধারণা করা হয় এ হল, শক্তি ও প্রকৃতির মেলবন্ধনের উৎসব। বৃক্ষরূপী বনদুর্গাকে উর্বরতার শক্তি রূপে ও প্রজননশীলতার প্রতীক রূপে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আরাধনা করা হয়ে আসছে। সেই উপলক্ষ্যে সাতদিন ব্যাপী বিরাট মেলা আয়োজন করা হয়। মেলা উপলক্ষ্যে সাধু-সন্তগন উপস্থিত হন ও বাউল গানের পালা আয়োজিত হয়। লোকবিশ্বাসের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই বুড়িমা তথা বারভূতের মেলা।

______ 
তথ্যসূত্র : বারভূত মেলা কমিটি

 

Developed by DXDasia